রাতের রাজধানীর আলো ঝলমলে জীবনের আড়ালে প্রায় অর্ধশতাধিক তথাকথিত ‘বার’ পুরোপুরি নাইটক্লাবে পরিণত হয়। যেগুলো আদতে বারের আড়ালে অপরাধ, অনৈতিক কার্যকলাপ এবং অনাচারের কেন্দ্রবিন্দু।
একাধিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সূত্র বলছে, এসব বার কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অপরাধী ও কিশোর গ্যাংদের অভয়ারণ্য, যেখানে চলে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, সহিংসতাসহ নানা অপরাধ।
যদিও বার বন্ধের নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে। কিন্তু সেসব নিয়ম উপেক্ষা করে, বারগুলো ভোর পর্যন্ত খোলা থাকে। যেখানে রাতভর অবাধে চলে অ্যালকোহল পান, উদ্দাম নাচ আর বিপুল ব্যয়। অনেক গ্রাহককেই মাতাল ও বেপরোয়া অবস্থায় আশপাশের আবাসিক হোটেল বা অ্যাপার্টমেন্টে ব্যক্তিগত পার্টির জন্য ‘কল গার্লদের’ নিয়ে বার থেকে বের হতে দেখা যায়। কিছু বারে তো ‘যৌন পরিষেবা’ দেওয়ার জন্য বিশেষ ফ্লোরের ব্যবস্থাই রয়েছে।
অর্থের বিনিময়ে সঙ্গী করা এসব নারীদের নিয়ে মারামারি বারগুলোয় নিয়মিত ঘটনা। এমনকি কোনো কোনো সংঘর্ষ হত্যা পর্যন্তও গড়িয়েছে, এমন উদাহরণও আছে।
সম্প্রতি গুলশানের একটি বারের কর্মচারীদের মারধরে ব্যবসায়ী দাবিরুল ইসলামের মৃত্যুর পরও কোনো পরিবর্তন আসেনি। এমনকি কোনো কোনো বার নকল ও ভেজাল মদ বিক্রি করে, যা পান করে প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ার খবরও আসে। কিন্তু এ বিষয়ে নেই যথাযথ নজরদারি।
পারমিটে নেই নজরদারি, অপরাধও বাধাহীন
ঢাকার অনেকগুলো বার সরকার অনুমোদিত। তবে অনুমতির পরেও যে কিছু নজরদারি প্রয়োজন হয় সেটা এখানে অনুপস্থিত। মদ পানের জন্য গ্রাহকের বৈধ পারমিট বা লাইসেন্স প্রদর্শন করার কথা। কিন্তু সেই নিয়ম মেনে চলার প্রয়োজনীয়তা কেউই বোধ করে না।
এসব বারের জন্য লাইসেন্স পেতে বিপুল খরচ করতে হয়, সাধারণত এই খরচ কোটি টাকা ছাড়ায়। কিন্তু আদতে এসব লাইসেন্স কেবল অবাধে সবধরনের কাজ চালিয়ে যাওয়ার রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
গভীর রাতে বার থেকে বের হওয়া অনেক গ্রাহকই কাছাকাছি ওঁৎ পেতে থাকা ছিনতাইকারী বা স্থানীয় অপরাধী চক্রের শিকার হন। ভুক্তভোগীরা প্রায়ই সর্বস্বান্ত হয়ে, আতঙ্কিত ও খালি হাতে বাড়ি ফেরেন।
পুলিশ ও পরিদর্শকরা সন্দেহের আওতায়
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় পুলিশের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বার মালিকদের কাছ থেকে নিয়মিত ‘মাসোহারা’ নিয়ে চোখ বুজে থাকার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বারের মালিকানায় থাকারও অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘মারামারি ও হত্যাকাণ্ড ঘটলে সেগুলা পুলিশের বিষয়। তবে নিয়ম লঙ্ঘনকারী বারগুলোর বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। এসবের সঙ্গে কোনো কর্মকর্তার জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণ হলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ১৫৭টি সংস্থার অধীনে ২৩৭টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত বার চালু রয়েছে। এর মধ্যে ১২১টি হোটেল বার, ৬২টি রেস্তোরাঁ বার, ৪৮টি ক্লাব বার এবং চারটি রিসোর্ট বার রয়েছে। দেশে বিদেশি মদের ৩৯টি খুচরা ও পাইকারি (অফ-শপ) লাইসেন্স, ছয়টি ডিস্টিলারি (একটি বন্ধ), একটি ব্রিউয়ারি এবং ১৮টি শুল্কমুক্ত বন্ডেড ওয়্যারহাউস রয়েছে।
রাজনৈতিক প্রভাব ও দায়মুক্তি
পুলিশের একাধিক সূত্র অভিযোগ করেছে যে, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মেয়াদে তার ছেলে শাফি মুদ্দাসির খান জ্যোতি অনেক বারের ওপর অনানুষ্ঠানিকভাবে ছড়ি ঘোরাতেন। তার তত্ত্বাবধানেই এসব বারের মধ্যে কয়েকটি নাইটক্লাবে পরিণত হয়েছিল।
গত বছর জুলাই গণঅভ্যূত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর এসব বারের শুধু হাতবদল হয়েছে। নতুন পৃষ্ঠপোষকদের অধীনে সমস্ত কাজকর্ম আগের মতোই চলছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়া থাকায় স্থানীয় পুলিশও অভিযান চালাতে অনিচ্ছুক বা পুলিশের হাতে অভিযান চালানোর ক্ষমতাই নেই।
গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আসাদুজ্জামান খান কামাল দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও তার ছেলে জ্যোতি কারাগারে রয়েছেন।
‘নিয়ম কোনো বিষয় নয়’
বাংলাদেশ বার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত মেজর জাহাঙ্গীর আলম ব্যাপক অনিয়মের কথা স্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, ‘নিয়ম না মানলে কিছুই হয় না। তাই অনেক মালিকই নিয়মনীতিকে পাত্তা দেন না। আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে বেশ কয়েকবার জানিয়েছি। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’
বারবার নিয়মলঙ্ঘনের জন্য পরিচিত উত্তরার মার্গারিটা লাউঞ্জ ও ক্যাম্প ফায়ার বারকে অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বারে মারামারি একটি সাধারণ ঘটনা। নারীদের নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং যখন বাউন্সাররা বলপ্রয়োগ করে, তখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। তবে এই ধরনের ঘটনা সামলানোর জন্য আগ্রাসী আচরণ নয়, বরং কৌশল প্রয়োজন।’
অবৈধ মদের সরবরাহ শৃঙ্খল
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা স্বীকার করেন যে বন্ডেড ওয়্যারহাউসগুলো শুধুমাত্র কূটনীতিক এবং বিদেশিদের জন্য। সাধারণ বারগুলোকে পর্যটন করপোরেশনের মাধ্যমে মদ কেনার বা কঠোর শর্তে আমদানি করার অনুমতি দেওয়া হয়। যদিও বন্ডেড ওয়্যারহাউসের মদ প্রায়ই ঢাকার বার ও নাইটক্লাবগুলোতে বিক্রি হতে দেখা যায়। যেখানে ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে এসব মদ অত্যন্ত চড়া দামে বিক্রি করা হয়।
নিয়ম অনুযায়ী রাত সাড়ে ১০টার মধ্যে সব বার বন্ধ করার কথা। কিন্তু বেশিরভাগই খোলা থাকে ভোর পর্যন্ত। এমনকি যাদের ‘বিলম্বিত বন্ধের’ অনুমতি অর্থাৎ আনুষ্ঠানিকভাবেই রাত আড়াইটা বা ৩টা পর্যন্ত খোলা রাখার অনুমতি আছে তারাও সেই সীমা লঙ্ঘন করে ভোর পর্যন্তই খোলা রাখে।
আবার ‘লাইভ মিউজিক্যাল পারফরম্যান্স’-এর আড়ালে বারগুলোয় চলে এমন সব অনুষ্ঠান যা সাদাচোখে ‘অশালীন’। কিছু বার ‘অস্থায়ী পারমিট’-এর মাধ্যমে প্রকাশ্যেই গ্রাহকদের জন্য ‘কল গার্ল’ সরবরাহও করে।
রাতের ঢাকার হটস্পট
শুধু গুলশান গোলচত্বর এলাকায় ৪৩টি হোটেল, ক্লাব ও রেস্তোরাঁ রয়েছে যেখানে মদ পরিবেশন করা হয়। উত্তরায় মদ পরিবেশ করে এমন ২৩টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গুলশান সার্কেলের পরিদর্শক এস এম শামসুল কবির এবং উত্তরা সার্কেলের দেওয়ান মো. জিল্লুর রহমানের বিরুদ্ধে এসব এলাকার প্রতিটি বার থেকে মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অবশ্য দুজনই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
শামসুল কবিরের দাবি, তার এলাকায় কতগুলো বার আছে তা তিনি মনেই করতে পারছেন না। আর জিল্লুর রহমানবলেন, ‘একজন মানুষ এত জায়গায় কীভাবে যাবে? আমি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নই।’
দরজার বাইরে ওঁৎ পেতে থাকা অপরাধ
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায়ই দেখা যায় অপরাধীরা বারের বাইরে মাতাল গ্রাহকদের ছিনতাই করার জন্য অপেক্ষা করে। অন্যদিকে বারগুলোর ভেতরে বিভিন্ন অপরাধী চক্রগুলো অপরাধের পরিকল্পনা করে। যেখানে অ্যালকোহল পণ্য হিসেবেও বিক্রি হয় আবার অপরাধের আবরণ হিসেবেও।
বারকেন্দ্রিক বিভিন্ন ধরনের অপরাধের ভুক্তভোগীরা খুব কমই পুলিশের কাছে যান। যদিও গুলশান, উত্তরা, মিরপুর এবং বনানীর স্থানীয় ‘বিট পুলিশ এ ধরনের ঘটনার বিস্তারিত অনানুষ্ঠানিক তালিকা রাখে বলে জানা গেছে।
পুলিশের দেওয়া অনুযায়ী, বেশিরভাগ অপরাধীই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। যাদের মধ্যে কেউ কেউ কেবল স্কুল পার করেছে।
হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার বিচার নেই
গুলশান ও উত্তরা পশ্চিম থানার পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাড্ডা থানা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যবসায়ী দাবিরুল ইসলামকে (৫১) গত ১৪ অক্টোবর গুলশান-১ এর ব্লিস আর্ট লাউঞ্জ বারে পেটানো হয়। পরে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় সাত অভিযুক্তকে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। কিন্তু আরও বেশ কয়েকজন পলাতক। কিংফিশার বারেও নিয়মিত মারামারির খবর পাওয়া যায়, যার ফলে পুলিশকে প্রতি রাতে সেখানে যেতে হয়।
এর আগে, উত্তরার মার্গারিটা লাউঞ্জে একজন গ্রাহক মারধরের শিকার হয়ে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। তবে সে ঘটনায় পুলিশের তদন্ত থমকে আছে।
অভিযানের প্রতিশ্রুতি
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বারগুলোতে অবৈধ কার্যক্রম সম্পর্কে আমরা অসংখ্য অভিযোগ পাচ্ছি। জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানো হবে।’
আরেক অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস), বলেন ‘পুলিশ সবসময়ই অপরাধ দমন এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে কাজ করছে। নিয়মিত অভিযানও চলছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বার পরিচালনায় সহায়তার ক্ষেত্রে পুলিশের জড়িত থাকার কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই। যদি কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে অবশ্যই বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
দুর্নীতি ও আঁতাত
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর গুলশান সার্কেলের সহকারী পরিদর্শক হেলাল উদ্দিন, জাকির হোসেন, সুমনুর রহমান, এয়ারপোর্ট জোনের রফিকুল এবং সাবেক এডিজি আব্দুল আজিজসহ বেশ কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মদের অবৈধ বাণিজ্যে জড়িয়ে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ পেয়েছে।
যদিও অভিযুক্ত কর্মকর্তারা সবাই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তদন্তকারীরা মানিকগঞ্জের মাসুদ নামে একজন সরবরাহকারীর নামও উল্লেখ করেছেন, যাকে ঢাকার বারগুলোতে মদ সরবরাহকারী আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্কের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি হিসেবে ধারণা করা হয়।


