বাংলাদেশ থেকে একাধিক যুবক বিদেশে গিয়ে জঙ্গি কার্যক্রমে জড়ালেও দৃশ্যত দেশে জঙ্গি দমন কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়েছে। এর মধ্যে পাকিস্তানে অভিযানে নিহত তালেবান জঙ্গিদের মধ্যে কয়েকজন বাংলাদেশি রয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মালয়েশিয়ায় জঙ্গি সন্দেহে আটক ৩৬ বাংলাদেশির বিচার চলছে। পাকিস্তানের কয়েকটি জঙ্গি সংগঠনে দেশে সদস্য সংগ্রহ কাজ চালাচ্ছে। এমন ৫ জঙ্গির শুধু নাম জানলেও বিস্তারিত তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে নেই।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গোয়েন্দা কার্যক্রমে বড় ধরনের দুর্বলতার সুযোগে জঙ্গিরা গোপনে সক্রিয় হচ্ছে।
দেশে কারাগার থেকে পালানো ৫৩ জঙ্গি এখনো ধরা পড়েনি। জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে, কারাবন্দি থেকে জামিনে মুক্ত তিন শতাধিক ও নিষিদ্ধ ৯ সংগঠনের কার্যক্রমে নেই নজরদারি।
বিশাল জনবল ও প্রযুক্তি সমৃদ্ধ এই দুই ইউনিটের কাছে দেশ-বিদেশে জঙ্গি কার্যক্রম নিয়ে হালনাগাদ কোনো তথ্য নেই।
জঙ্গি দমনে গঠিত পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ) ও কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) সদস্যরা এখন কিশোর গ্যাং ও অন্যান্য অপরাধী ধরতে অভিযান চালাচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক, এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘পাকিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপির নিহত সদস্যদের মধ্যে চারজন বাংলাদেশি রয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, দেশে জঙ্গি মতাদর্শ সক্রিয় রয়েছে। চারজন নিহত হলেও এদেশ থেকে কতোজন কোনপথে সেদেশে গেছে তা-ও জানা দরকার।’
‘জেল পলাতক ও জামিনে ছাড়া পাওয়াদের ব্যাপারেও পদক্ষেপ জরুরি। গোয়েন্দা কার্যক্রম আরো জোরদার করা দরকার। জঙ্গিবাদ দমনে বিশেষায়িত এই ইউনিটের প্রয়োজন রয়েছে,’ বলেন তিনি।
দেশে-বিদেশে জঙ্গি তৎপরতা
৫ জুলাই অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ)-এর দায়ের করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আল ইমরান ওরফে ইঞ্জিনিয়ার ইমরান হায়দার নামে এক বাংলাদেশি পাকিস্তানে নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন টিটিপি’র হয়ে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করেন। মূলত তিনি ওই সংগঠনের হয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করেন ও সদস্যদের সংঘবদ্ধ করার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করেন।
অভিযোগ রয়েছে, ইমরান বাংলাদেশে টিটিপির সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির কার্যক্রম, সদস্যদের ‘ইসলামী খিলাফতের’ দাওয়াত পৌঁছানোর কার্যক্রম পরিচালনা এবং ধর্মীয় উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদে উদ্বুদ্ধ করছেন।
তার সঙ্গে রেজাঊল করিম আবরার, আসিফ আদনান, জাকারিয়া মাসুদ ও মো. সানাফ হাসান নামে চার যুবক রয়েছেন। তবে তাদের পরিচয় এখনো অজানা। তারা অনলাইনে সদস্য সংগ্রহ ও দাওয়াতি কার্যক্রম চালাচ্ছেন বলেও পুলিশের অভিযোগ।
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে নিহত ১৭ টিটিপি সদস্যদের মধ্যে বাংলাদেশি ফয়সালের বাড়ি মাদারীপুরে। এর আগে গত এপ্রিলে দেশটির উত্তর ওয়াজিরিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে আহমেদ জুবায়ের নামে আরেক বাংলাদেশি নিহত হন। তার বাড়ি সাভার বাড্ডা ভাটপাড়া মহল্লায়।

পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া তথ্যে টিটিপি’র সঙ্গে সম্পৃক্ত সন্দেহে গত ২ জুলাই ঢাকার পাশে সাভার থানার পাশে মমতাজ ম্যানশন থেকে ভাগলপুরের বাসিন্দা ফয়সাল (৩৩) এবং ১৪ জুলাই নারায়ণগঞ্জ থেকে শামিন মাহফুজকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সাভার থানায় এটিইউর পরিদর্শক আব্দুল মান্নানের করা মামলার তথ্য মতে, আটক দুইজন ২০২৪ সালের ১৮ অক্টোবর ঢাকা ছেড়েছিলেন। কিন্তু ওমরাহ না করে তারা পরদিন সৌদি আরব থেকে পাকিস্তানে যান। সেখান থেকে ৬ নভেম্বর তুরখান সীমান্ত দিয়ে আফগানিস্তানে যান। একদিন পর ওই একই সীমান্ত দিয়ে দলছুট ফয়সাল যান পাকিস্তানে । এরপর করাচী থেকে দুবাই হয়ে ১৬ নভেম্বর তিনি দেশে ফেরেন। তার সহযোগী অপর বাংলাদেশি আহমেদ জুবায়ের ওরফে যুবরাজ পরে উত্তর ওয়াজিরিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে নিহত হন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এটিইউর অপারশেনাল উইং এর পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তারের পর ফয়সালের দেওয়া তথ্যে পাওয়া অজ্ঞাতনামা পাঁচজনের কাউকে সনাক্ত করা যায়নি।
তিনি বলেন, ‘অবশ্য গ্রেপ্তার করা ওই ব্যক্তির দাবি, তিনি ওমরাহ পালন শেষে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। সেখানে তার এক বন্ধু তাকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে বলেন। তিনি তা না করে দেশে ফিরে এসেছেন।’
পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম জানান, পাকিস্তান টিটিপি-এ যোগ দেওয়ার চেষ্টা করা বাংলাদেশিদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নজরদারি করছে।
তিনি বলেন, ‘তিন মাস আগে সাভার থেকে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যিনি টিটিপির মাধ্যমে যুদ্ধে অংশ নিতে গিয়েছিলেন। ওই ব্যক্তির সঙ্গে আর কেউ জড়িত আছেন কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’
আইজিপি জানান, তারা গণমাধ্যমে অভিযুক্ত বাংলাদেশি জঙ্গি ফয়সাল পাকিস্তানে নিহতর খবর জেনেছেন। এছাড়া টিটিপির হয়ে ড্রোন পরিচালনাকারী আরেক বাংলাদেশির কথাও তাদের জানা রয়েছে। তবে তার পরিচয় এখনো নিশ্চিত নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কারা মহাপরিদর্শক (আইজি, প্রিজন) ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের (জুলাই গণঅভ্যুত্থান) পর তিনশ’র বেশি বন্দি মুক্তি পেয়েছেন। যাদের অনেকে বিভিন্ন জঙ্গি সংক্রান্ত অপরাধের সাথে অভিযুক্ত ছিলেন।’
আইজি (প্রিজন) আরো বলেন, ‘জেল থেকে পালানো বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডপ্রাপ্ত ৯৯ জঙ্গির মধ্যে ৪৬ জন আটক হয়েছে। বাকী ৫৩ জন এখনও পলাতক রয়েছেন।’
খবরে প্রকাশ, মালয়েশিয়ায় গত ২৪ এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত অভিযান জঙ্গি নেটওয়ার্কে জড়ানোর অভিযোগে ৩৬ জন প্রবাসী বাংলাদেশি গ্রেপ্তার হয়েছেন। মালয়েশিয়া সরকার জানিয়েছে, এই ব্যক্তিরা মালয়েশিয়ায় ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর মতাদর্শ প্রচার করছিলেন। তারা কমিউনিটির ভেতরে সদস্য সংগ্রহের সেল গঠন করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা বলেন, ‘দেশে জঙ্গিবাদের সমস্যা ছিল; তা নির্মূল হয়েছে বলা যাবে না, আত্মতৃপ্তির কোনো সুযোগ নেই। তারা যে কোনো সময় মাথাচাড়া দিতে না পারে। বৈশ্বিক অবস্থাও তেমন ইংগিত দিচ্ছে।’
‘অতীতে কিছু অতিরঞ্জিত ঘটনা থাকলেও জঙ্গিবাদ অস্বীকার করার উপায় নেই। ২১ আগস্ট, রমনা বটমূল, উদীচীসহ দেশে যতো জঙ্গি হামলা হয়েছে এজন্য গোয়েন্দা ব্যর্থতা দায়ী’, বলেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, ‘গোয়েন্দাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণে ঘাটতি রয়েছে। প্রয়োজন সবকটি গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়।

সিটিটিসির কাজ নিয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে ইউনিট প্রধান, উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. মাসুদ করিম মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলী বলেন, ‘জেল থেকে পালিয়ে গেলে তাদেরকে ধরা খুব কঠিন, আর দুর্ধর্ষরা জামিনে ছাড়া পেলে তারা আদালতে হাজিরা দেয় না। সিটিটিসি চেষ্টা করছে তাদেরকে ধরার জন্য। এই ইউনিট পুলিশের অন্যান্য কাজেও সহযোগিতা করছে।’
অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম বলেছেন, ‘এখন জঙ্গি তৎপরতা নেই বলে আগামীতে তারা সক্রিয় হবে না এর নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারি না। আমাদের থেমে থাকার কোনো সুযোগ নেই, আরো সচেতনভাবে কাজ করতে হবে।’
‘একটা ঘটনা কিন্তু বড় ধরনের ভাবমূর্তির সংকট তৈরি করে দেশে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে। এ জন্য এটিইউ আরো শক্তিশালী হওয়া দরকার। ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম, সাইবার ক্রাইম ও হ্যাকিং-এর মত ঘটনা আছে। সে ক্ষেত্রে আরো ইউনিটগুলো আরো শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।’
জঙ্গি দমনে পুলিশের যত টিম
সংশ্লিষ্ট সূ্ত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালে আগস্ট মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ পুলিশকে নিয়ে ‘কাউন্টার সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশ ব্যুরো’ নামে বিশেষ ইউনিট গঠনের সুপারিশ করে। ২০১৩ সালে সেপ্টেম্বরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটি অনুমোদনের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। ২০১৫ সালে সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা বাড়লে এ ইউনিটের চাহিদা বাড়ে।
২০১৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ৬০০ জনবল নিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের সিটিটিসি ইউনিট প্রতিষ্ঠা হয়। মিন্টোরোডে এর প্রধান কার্যালয়। এর রয়েছে চারটি গ্রুপ– বিশেষ অ্যাকশন গ্রুপ, কাউন্টার সন্ত্রাস তদন্ত বিভাগ, সাইবার নিরাপত্তা ও অপরাধ বিভাগ এবং ট্রান্সন্যাশনাল অপরাধ বিভাগ।
প্রতিষ্ঠার পর সিটিটিসি ঢাকার কল্যাণপুরে জাহাজবাড়ি, গুলশানে হলি আর্টিজান, সিলেটে সূর্যদিখল বাড়িসহ জঙ্গিবিরোধী অনেক অভিযান চালায়। বিগত সরকারের সময়ে নানা অভিযানে এই ইউনিট ছিল আলোচিত-সমালোচিত।
এদিকে, দেশের বিভিন্নস্থানে জঙ্গি হামলা বেড়ে যাওয়ায় ২০১৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর গঠন করা হয় এটিইউ। একজন অ্যাডিশনাল আইজি, একজন ডিআইজি, দুইজন অতিরিক্ত ডিআইজি, পাঁচজন এসপি, ১০ জন অ্যাডিশনাল এসপি, ১২ জন সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি), ৭৫ জন ইন্সপেক্টর, ১২৫ জন সাব ইন্সপেক্টরসহ বাকি পদগুলো কনস্টেবল। এর চারটি শাাখা হচ্ছে-সোয়াত টিম, ক্রাইম সিন ইনভেস্টিগেশন টিম, বোম্ব বিস্ফোরণ ইনভেস্টিগেশন টিম, ক্রাইসিস ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম, এক্সপ্লোসিভ ডিসপোজাল টিম ও কেনাইন স্কোয়াড (ডগ স্কোয়াড)। বারিধারা ‘কে’ ব্লকে এর প্রধান কার্যালয়।
প্রতিষ্ঠার পর এটিইউ বেশকিছু জঙ্গিবিরোধী অভিযান চালালে অনেক অভিযান নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। অনেকর দাবি, অনেক অভিযান ছিল ‘সাজানো নাটক’।


