চট্টগ্রাম নগরীর নিউ মনছুরাবাদ এলাকায় ঢাকা চট্টগ্রাম সমাসড়কে একটি ফুট ওভারব্রিজের নির্মাণ কাজ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, অবৈধ দোকান রক্ষা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের চাপের মুখে প্রকল্পের মূল নকশা পরিবর্তন করতে হচ্ছে। নতুন করে এই ব্রিজের ডিজাইন ও ড্রয়িং করার কাজ চলছে।
গত ১২ এপ্রিল ১ কোটি ৫৬ লাখ ৩৬ হাজার ২৬৪ টাকা ব্যয়ে একটি ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করেছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন। ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপনের পর এই ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণে কাজও শুরু করছিলো ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড। কিন্তু স্থানীয়দের বাধার মুখে বন্ধ রয়েছে ফুট ওভারব্রিজের কাজ।
ব্রিজের নির্মাণ কাজ শুরু করে বন্ধ করে রাখায় বিপাকে পড়েছেন ওই এলাকার বাসিন্দারা। ফুটপাতের ওপর খোঁড়া বড় গর্তে পড়ে গিয়ে পথচারী আহত হওয়ার ঘটছে বলে জানান ওই এলাকার দোকান মালিকরা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ব্রিজের আগের নকশায় যেখানে মূল ফাউন্ডেশন হওয়ার কথা ছিল, সেখান থেকে সিঁড়ি সরিয়ে উত্তর দিকে প্রায় ১২ মিটার দূরে একটি কদম গাছের সামনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
অভিযোগ উঠেছে যে, আগের নকশায় যেখানে ব্রিজ হওয়ার কথা ছিল সেখানে কিছু অবৈধ বাঁশের দোকান আছে। ওই দোকানগুলো রক্ষার জন্য এলাকার কিছু নেতা সিটি কর্পোরেশনকে দিয়ে প্ল্যান পরিবর্তন করাচ্ছে । এ বিষয়ে বিষয়ে ভুক্তভোগী স্থানীয়রা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে লিখিত অভিযোগও।
ফুট ওভারব্রিজের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড এর প্রজেন্ট ইঞ্জিনিয়ার শাহিনুর রহমান সেলিম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, বর্তমান প্ল্যান অনুযায়ী ব্রিজটি নির্মাণ না করতে এলাকার কিছু প্রভাবশালী চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছেন। বর্তমানে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে ব্রিজ আগের জায়গায় থাকলেও সিঁড়িটি অন্য পাশে যাবে।
তিনি বলেন, ‘প্রায় এক বছর আগে এই ব্রিজটির টেন্ডার হয়। কাজ শুরু হতে বিলম্বও হয়। আমরা দ্রুত কাজ শেষ করতে চাই কারণ বর্ষাকাল শুরু হয়ে গেলে নিচের কাজ করা কঠিন হয়ে যাবে। বর্তমানে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে কাজের সময় নষ্ট হচ্ছে।’
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের এই কর্মকর্তা টাইমস অব বাংলাদেশকে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী বিদ্যমান প্ল্যান অনুযায়ী কাজের বিরোধিতা করছেন বলে স্বীকার করেন। তবে তিনি এসব প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
এদিকে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ব্রিজ নির্মানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের কাছে একটি লিখিত চিঠি দিয়েছে মঞ্জুরুল আলম নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা। গত ১৬ এপ্রিল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়রকে দেওয়া চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, তার বৈধ মালিকানাধীন সম্পত্তির সামনে ফুট ওভারব্রিজ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা তার ব্যবসা ও যাতায়াতে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।
তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেন, গত ১২ এপ্রিল খাস জমির সম্মুখে ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। তবে বর্তমানে সেটি আবেদনকারীর ব্যক্তিগত সম্পত্তির সামনে স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
মঞ্জুরুল আলম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, সরকারি জায়গায় গড়ে উঠা কিছু দোকান রক্ষা করতে একটি চক্র ব্রিজের নকশা পরিবর্তন করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ব্রিজটিতার মলিকানাধীন জায়গার সামনে ফুট ওভারব্রিজ স্থাপন করার জন্য প্রভাব বিস্তার করছে।
এদিকে ঢাকা চট্টগ্রাম মাহসড়কের পাশ্ববর্তী সরকারী জায়গা দখল করে গড়ে তোলা বাঁশের দোকান মালিক মেসার্স শফি এন্টারপ্রাইজ এর স্বত্ত্বাধিকারী মো আরিফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সরকারি জায়গা থেকে তার দোকান উঠে যাবে এজন্য ব্রিজ নির্মাণে বিরোধীতার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, সরকার চাইলে আমি সরকারি জায়গা থেকে আমার দোকান উঠিয়ে নেব।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সুপারভাইজিং ইঞ্জিনিয়ার আবু সাদাত মোহাম্মদ তায়েব টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ফুট ওভারব্রিজটির ডিজাইন কারেকশন করতে হচ্ছে।
নির্মাণ কাজ উদ্বোধন এবং কাজ শুরুর পর কেন ডিজাইন পরিবর্তন করতে হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সবার জন্য যেটা ভালো হয় সেই অনুযায়ী ডিজাইন কারেকশন করতে হচ্ছে। আরেকটি সিঁড়ি দিতে হবে। এতে খরচও বাড়বে।
সরেজমিন প্লকল্প এলাকায় দেখা যায় প্রকল্প এলাকায় ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের পূর্বপার্শ্বে ফুটপাতের উপর একটি গভীর গর্ত করা হয়েছে। এতে পথচারীরা ফুটপাতের পরিবর্তে মহাসড়ক দিয়ে চলাচল করছে।
পাশ্ববর্তী ওয়ার্কশপ এর মালিক নাম প্রকাশ না করে বলেন, এভাবে খোলা গর্তের কারণে সম্প্রতি একজন পথচারী গর্তে পড়ে গিয়ে আহত হয়। কাজ বন্ধ থাকলে কর্তৃপক্ষের উচিত এটি ভরাট করে দেওয়া।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর ১০ নং উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ডের নিউ মনসুরাবাদ এলাকায় এই ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ করছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। এতে ব্যয় হবে ১ কোটি ৫৬ লাখ ৩৬ হাজার ২৬৪ টাকা। ব্রিজটির দৈর্ঘ্য ৩১ দশমিক ৫ মিটার এবং এবং প্রস্থ ৩ মিটার। প্রকল্পের পূর্বের ডিজাইন অনুযায়ী ব্রিজটিতে দুই পাশে একটি করে মোট দুটি সিঁড়ি থাকার কথা।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, চসিকের বিমানবন্দর সড়ক সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় নগরজুড়ে ৩৮টি ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ৪টি ফুট ওভারব্রিজের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে, ১৫টির কাজ চলমান রয়েছে এবং ১৭টির টেন্ডার প্রক্রিয়া চলমান।


