ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চুরির শিকার হয়েছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্স। গত বৃহস্পতিবার এক সাইবার হামলায় প্ল্যাটফর্মটি থেকে চুরি হয়ে গেছে ৬ দশমিক তিন বিলিয়ন বা ৬৩০ কোটি ডলার ক্রিপ্টোকারেন্সি, যা ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার মারাত্মক নিরাপত্তা দুর্বলতাগুলোকে সবার সামনে উন্মোচন করে দিয়েছে।
এই নজিরবিহীন ক্ষতির পরিমাণ আগের সব রেকর্ডকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। এর আগে সবচেয়ে বড় চুরির ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে, যখন উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হ্যাকাররা ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইবিট থেকে ১৫০ কোটি ডলার চুরি করেছিল।
‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও শিল্প বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ডিজিটাল সম্পদগুলো এখন চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে। কারণ অপরাধীরা সাইবার চুরি করতে এবং চুরি যাওয়া অর্থ পাচার করতে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও স্বয়ংক্রিয় টুলগুলোর ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ব্লকচেইন অ্যানালিটিক্স ফার্ম চেইনালাইসিসের শুক্রবার প্রকাশিত একটি ব্লগ পোস্ট অনুযায়ী, বাইন্যান্সে এই হামলা চালাতে আক্রমণকারীরা অভিনব সব অর্থ পাচার পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। খুব কম সময়ের মধ্যে হাজার হাজার লেনদেন সম্পন্ন করা হয়েছে, যা মূলত তহবিলের গতিবিধি লুকিয়ে রাখতে স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়।
যদিও হ্যাকাররা কীভাবে ভেতরে প্রবেশ করেছিল তা নিয়ে এখনও তদন্ত চলছে, বাইন্যান্স শুরুতে বলেছিল একজন প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক করা হয়েছিল। পরে তারা স্পষ্ট করে জানায়, তদন্তকারীরা হ্যাকিংয়ের আরও কিছু নতুন পয়েন্ট খুঁজে পেয়েছেন। চেইনালাইসিসের পাশাপাশি টিআরএম ল্যাবসও এই ঘটনার জন্য উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করেছে।
প্রতিদিন বিলিয়ন ডলারের লেনদেন পরিচালনা করা বাইন্যান্স জানিয়েছে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবহারকারীদের সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দেবে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তারা কর্পোরেট রিজার্ভে ৬৩০ কোটি ডলারেরও বেশি আলাদা করে রেখেছে।
উদ্ধার অভিযানের ফলে সার্কেল এবং টেথারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ৩০০ কোটি ডলার মূল্যের চুরি যাওয়া ডিজিটাল সম্পদ স্থগিত বা ফ্রিজ করতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা ওই ফান্ডগুলো আর ব্যবহার করতে পারছে না। বাইন্যান্স জানিয়েছে, তারা ফ্রিজ করা এই তহবিল পুনরুদ্ধারের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
তবে টিআরএম ল্যাবস জানিয়েছে, হ্যাকাররা ইতিমধ্যে ২৪০ কোটি ডলার মূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি এমন জায়গায় সরিয়ে ফেলেছে যা আর কারও নাগালের মধ্যে নেই।
উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার ইউনিট ‘ট্রেডারট্রেটর’-এর ওপর দায়
বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস হ্যাকারদের পরিচয় ‘ট্রেডারট্রেটর’ হিসেবে শনাক্ত করেছে, যা উত্তর কোরিয়ার একটি অভিজাত সাইবার ওয়ারফেয়ার ইউনিট।
চেইনালাইসিসের অনুসন্ধানেও একই তথ্য মিলেছে। তারা দেখেছে, বাইন্যান্স থেকে চুরি হওয়া তহবিলগুলো গত মাসে অন্য একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বিটগেটে হামলার সময় লুট করা ডিজিটাল সম্পদের সাথে মিশিয়ে ফেলা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা ব্লকচেইনে হঠাৎ করে টাকা তুলে নেওয়ার ঘটনাগুলো লক্ষ্য করার পর গত বৃহস্পতিবার বিকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই সাইবার হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ে। চেইনালাইসিসের তথ্য অনুযায়ী, একটি প্রোগ্রাম্যাটিক মানি লন্ডারিং প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার বিকাল ৪ টা ২০ মিনিটের দিকে চুরি যাওয়া তহবিলগুলো বাইন্যান্স থেকে সরতে শুরু করে।
ক্রিপ্টোবাজার পর্যবেক্ষণকারী কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইশ্বর প্রসাদ সাইবার অপরাধীদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে জানান, ক্রিপ্টো ইকোসিস্টেমের সূক্ষ্ম দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করতে এবং তা কাজে লাগাতে হ্যাকারদের দারুণভাবে সহায়তা করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এ ধরনের হামলার পরিধি আরও বাড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এআই সিকিউরিটি ফার্ম ‘অ্যাবান্ডন সিকিউরিটি’র চিফ টেকনোলজি অফিসার জোশুয়া স্যাক্স লক্ষ্য করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আসার আগেও উত্তর কোরিয়ার কাছে বড় ধরনের হামলা চালানোর মতো সক্ষমতা ছিল। তবে তিনি উল্লেখ করেন, এই প্রযুক্তি উন্নত হ্যাকিংকে সবার জন্য সহজলভ্য করে তুলেছে। এর ফলে এখন অনেকেই বড় পরিসরে চুরি করার চেষ্টা চালাতে পারছে।
পদ্ধতিগত ঝুঁকি এবং নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দেওয়ার বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
ক্রিপ্টোকারেন্সি অ্যানালিটিক্স ফার্ম ইলিপ্টিকের প্রধান বিজ্ঞানী এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতা টম রবিনসন বলেন, বাইন্যান্সের এই চুরি উত্তর কোরিয়ার মোট রেকর্ডকৃত ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির পরিমাণকে প্রায় দ্বিগুণ করে দেবে।
রবিনসন উল্লেখ করেন, সম্পদ ফ্রিজ হওয়া এড়াতে তহবিল স্থানান্তরের ক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়ার গোষ্ঠীগুলো সাধারণত অনেক দ্রুত ও দক্ষতার সাথে কাজ করে।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় সাইবার প্রতিরক্ষার সাবেক প্রধান সিয়ারান মার্টিন বলেন, রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হ্যাকাররা বুঝতে পেরেছে ঐতিহ্যবাহী ব্যাংকগুলোর তুলনায় ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রায়শই অনেক দুর্বল হয়।
মার্টিন বলেন, ‘তারা এগুলো খুব ভালো কাজে লাগাতে পারে। আজ তাদের সবচেয়ে ভালো দিন গেল।’
ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে, তারা বিষয়টি জানে এবং এর প্রভাব মূল্যায়ন করতে এবং উপযুক্ত তদন্ত করতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীদারদের সাথে কাজ করছে।
আগের রেকর্ড ভাঙা বাইবিট চুরি
বাইন্যান্সের এই হামলা একটি খারাপ ট্রেন্ডকে সামনে এনেছে, যা এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে রেকর্ড গড়েছিল।
সে সময় উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা বাইবিটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বেন ঝৌকে একটি সাধারণ লেনদেন হিসেবে অনুমোদন দিতে প্রতারিত করেছিল। পরবর্তীতে তারা গ্রাহকদের আমানত সুরক্ষায় ব্যবহৃত একটি ফ্রি সফটওয়্যারের ত্রুটির সুযোগ নিয়ে এক্সচেঞ্জের সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়।
যদিও একটি সিকিউরিটি ফার্ম বাইবিটের দেড় বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিকে ‘সহজেই এড়ানো যেত’ বলেছিল, তবুও এক্সচেঞ্জটি তাদের নিজস্ব কর্পোরেট রিজার্ভ থেকে অর্থ টেনে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির কাছ থেকে ঋণ নিয়ে সেই সংকট কাটিয়ে উঠেছিল।
২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বাইন্যান্স দ্রুত ডিজিটাল মুদ্রা খাতের একটি প্রভাবশালী প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে, যা বিশ্বব্যাপী ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পরিচালনা করে। বিটকয়েন ও ইথারের মতো ডিজিটাল মুদ্রা কেনা এবং ঐতিহ্যবাহী মুদ্রাকে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করার এটি একটি প্রধান বাজার।
বৃহস্পতিবারের এই ঘটনার পর, বাইন্যান্সের প্রতিষ্ঠাতা চাংপং ঝাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করে একটি পেশির ইমোজি দিয়ে লিখেছিলেন, ‘এটি কষ্ট দিচ্ছে, তবে আমরা টিকে থাকব।’
ঝাও এর আগেও আইনি জটিলতার মুখোমুখি হয়েছেন। বাইন্যান্স ২০২৩ সালে অর্থ পাচার সংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘনের কথা স্বীকার করে এবং মার্কিন সরকারের কাছে ৪৩০ কোটি ডলার জরিমানা দেয়।
চার মাসের জেল খাটার পর, ঝাও গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে ক্ষমা পান। বাইন্যান্স ট্রাম্প পরিবারের সাথে যুক্ত ক্রিপ্টোকারেন্সি কোম্পানি ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইনান্স’-এর সাথে একটি ব্যবসায়িক সম্পর্কও তৈরি করেছে।
এই হামলা ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারের দীর্ঘদিনের দুর্বলতাগুলোকে সামনে এনেছে, যা ২০০৮ সালে প্রথাগত ব্যাংকিংয়ের একটি অনিয়ন্ত্রিত বিকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর থেকেই বড় ধরনের চুরির শিকার হয়ে আসছে।
সেলফ-কাস্টডি ওয়ালেট ব্যবহারকারীরা পাসওয়ার্ড হারালে তহবিল চিরতরে হারানোর ঝুঁকিতে থাকেন। অন্যদিকে বাইন্যান্সের মতো সেন্ট্রালাইজড এক্সচেঞ্জগুলো ঐতিহ্যবাহী ব্যাংকগুলোর মতো কঠোর নিয়ন্ত্রক সুরক্ষার আওতাধীন না থেকেও গ্রাহকদের সম্পদ নিজেদের কাছে রাখে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই শিল্পকে মূলধারায় নিয়ে আসার চেষ্টা করা সত্ত্বেও, কিছু ক্রিপ্টোকারেন্সি কোম্পানি গ্রাহকদের তহবিল রক্ষা করতে এখনও হিমশিম খাচ্ছে।
পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, অবৈধ উপায়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি অর্জন করা হলো উত্তর কোরিয়ার আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর এবং তাদের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি চালানোর একটি প্রধান উপায়, যা পিয়ংইয়ং তাদের শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করে।


