বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ২০১৮ সালের ২১ জুন থেকে নতুন ফিলিং স্টেশন স্থাপনের অনুমতি কার্যত বন্ধ রাখলেও সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে প্রশাসনের নাকের ডগায় বছরের পর বছর ধরে চলছে কথিত ‘মিনি পেট্রল পাম্পের’ রমরমা ব্যবসা। দোকানের আড়ালে বসানো হয়েছে পাম্পের আদলে ডিসপেনসার ইউনিট। প্রকাশ্যেই এসব স্থাপনা থেকে ট্রাক, বাস, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনে নজেল দিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে ডিজেল, পেট্রল ও অকটেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো দৃশ্যমান অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। খোলা পরিবেশে ট্যাংকে বিপুল পরিমাণ দাহ্য জ্বালানি মজুত রেখে চলছে বিক্রি। ফলে যেকোনো সময় অগ্নিকাণ্ড বা বিস্ফোরণের মতো বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার হাটপাঙ্গাসী ইউনিয়নের চকনুর এলাকায় মেসার্স তালুকদার ফিলিং স্টেশন এবং বাসাইল গ্রামে মেসার্স সালেহা এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স সোহেল ট্রেডার্সে পাম্পের আদলে ডিসপেনসার বসিয়ে জ্বালানি বিক্রি করা হচ্ছে। দূর থেকে দেখলে এগুলোকে অনুমোদিত ফিলিং স্টেশন বলেই মনে হবে। অথচ প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপিসির অনুমোদন নেই।
রায়গঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. জহুরুল ইসলাম জানান, মেসার্স তালুকদার ফিলিং স্টেশন, মেসার্স সালেহা এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স সোহেল ট্রেডার্স কোনোটিরই বিপিসির অনুমতি নেই।
তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
প্রশ্ন উঠেছে-যদি অনুমোদনই না থাকে, তাহলে প্রশাসনের নজরের মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানে দিনের পর দিন কীভাবে জ্বালানি বিক্রি চলছে? কার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে এমন ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা চালু রয়েছে-এ নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।
অবৈধভাবে জ্বালানি বিক্রির অভিযোগে ২০২৪ সালের ২৮ এপ্রিল তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) তানজিল পারভেজ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। ওই সময় লাইসেন্স ছাড়া ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন বিক্রির দায়ে সংশ্লিষ্ট পাম্প মালিকদের ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
পেট্রোলিয়াম আইন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার পরও বন্ধ হয়নি ব্যবসা। কিছুদিন পর আবারও শুরু হয় জ্বালানি বিক্রি।
এতে স্থানীয়দের প্রশ্ন—জরিমানা দিয়ে যদি অবৈধ ব্যবসা আবার চালু করা যায়, তাহলে অভিযান কি শুধুই লোক দেখানো?
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, এসব কথিত মিনি পাম্পে বিক্রি হওয়া জ্বালানির একটি বড় অংশ সংগ্রহ করা হয় সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল এলাকায় ট্রাক ও বাস থেকে চোরাইভাবে সংগ্রহ করা জ্বালানি থেকে। পরে ওই জ্বালানিতে ভেজাল মেশানোরও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের বা ভেজাল জ্বালানি ব্যবহারে যানবাহনের ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি অবৈধভাবে জ্বালানি কেনাবেচার কারণে সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। তবে চোরাই জ্বালানি ও ভেজালের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
মেসার্স সালেহা এন্টারপ্রাইজের মালিক কে এম রফিকুল ইসলামের কাছে বৈধ কাগজপত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি নিজেকে ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি পরিচয় দিয়ে দাবি করেন, জেলা প্রশাসকের অনুমোদন রয়েছে।
তবে উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির বিপিসির অনুমোদন নেই। ফলে মালিকের দাবি ও প্রশাসনের বক্তব্যের মধ্যে তৈরি হয়েছে স্পষ্ট অসঙ্গতি।
অন্যদিকে তালুকদার ফিলিং স্টেশনের কর্মচারী ওমর ফারুক বলেন, পাম্পটির অনুমোদন আছে কি না, তা তিনি জানেন না। এ বিষয়ে মালিক পক্ষই ভালো বলতে পারবেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আব্দুল হান্নান বলেন, এভাবে খোলা পরিবেশে অবৈধভাবে জ্বালানি বিক্রি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো সময় বড় ধরনের বিস্ফোরণ বা অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে। প্রশাসনের উচিত দ্রুত এসব পাম্প উচ্ছেদ করা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আবু সাঈদ বলেন, বারবার জরিমানা হয়, আবার ব্যবসাও শুরু হয়। এতে মনে হয়, কেউ না কেউ তাদের সহযোগিতা করছে। সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অথচ অবৈধ ব্যবসা থামছে না।
সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, অবৈধ ফিলিং স্টেশনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রায়গঞ্জে যেসব পাম্প অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে লোক পাঠিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এবিষয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট (সাধারণ শাখা, এসডিজি ও এনজিও সংক্রান্ত সেল এবং জিপিএমএস সংক্রান্ত সেল) এহসান আহমেদ খান বলেন, আমরা ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শন করেছি এবং তাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করেছি। প্রাথমিকভাবে কাগজপত্র যাচাই করে দেখা হচ্ছে। কাগজপত্রে কোনো ঘাটতি বা অসংগতি পাওয়া গেছে বিধি অনুযায়ী দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সচেতন মহলের দাবি, শুধু জরিমানা করে এই অবৈধ ব্যবসা বন্ধ করা সম্ভব নয়। অবৈধ পাম্প উচ্ছেদের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহের উৎস, মালিকানা, অর্থের লেনদেন এবং সংশ্লিষ্টদের পেছনে থাকা প্রভাবশালী মহলকে চিহ্নিত করে তদন্ত করতে হবে।
নইলে প্রশাসনের চোখের সামনে এভাবে দাহ্য জ্বালানির অবৈধ বাণিজ্য চলতে থাকলে একদিকে যেমন সরকার হারাবে রাজস্ব, অন্যদিকে তেমনি একটি বড় অগ্নিদুর্ঘটনার জন্যও তৈরি হতে পারে ভয়াবহ ঝুঁকি।


