রাশিয়ায় ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি তরুণদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পরে ফাঁদে ফেলে তাদের ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে অনেকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, অনেকে আহত হয়েছেন। অনেক পরিবার তাদের প্রিয়জন বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন–তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
পুলিশের গোয়েন্দা সূত্রের ধারণা, গত চার বছরে রুশ বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে ৫০ জনের বেশি বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। নিরাপদ অভিবাসন নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা আশঙ্কা করছেন, নিহতের সংখ্যা ৫০ থেকে ১০০ পর্যন্ত হতে পারে। তবে এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাশিয়ায় বেসামরিক কাজের কথা বলে নিয়ে যাওয়া ৩০ বাংলাদেশিকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছিল। তাদের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১৭ জনই একটি ড্রোন হামলায় প্রাণ হারান বলে জানা গেছে। দুজন পালিয়ে দেশে ফিরে চিকিৎসা নিয়েছেন, দুজন এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং ছয়জন এখনো যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থানায় ২১ বছর বয়সী রাজন হোসেনের করা অভিযোগের তদন্তে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। রাজন নিজেও নির্মাণশ্রমিকের কাজের প্রলোভনে রাশিয়ায় গিয়ে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছেছিলেন। পরে আহত অবস্থায় পালিয়ে দেশে ফেরেন।
চাকরির কথা বলে নিয়ে যাওয়া হয় যুদ্ধক্ষেত্রে
রাজন হোসেন জানান, রাশিয়ায় নির্মাণকাজের চাকরি পাওয়ার জন্য তিনি ৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। গত ৭ মে রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাকে টানা ২১ দিন সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এরপর অন্য বাংলাদেশিদের সঙ্গে তাকে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
পরে একটি ড্রোন হামলায় তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন–তার কোমর ভেঙে যায় এবং দুই পায়েই শক্তি হারিয়ে ফেলেন। চার দিন পর কোনো রকমে একটি হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসা নেন এবং আহত অবস্থাতেই সেখান থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। পরে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় গত ২৩ আগস্ট তিনি দেশে ফেরেন।
রাজন জানান, শত্রুর অবস্থান শনাক্ত করতে তাদের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। মূলত তাদের সামনে ঠেলে দিয়ে আক্রমণের মুখে ফেলা হতো, যাতে রুশ বাহিনী প্রতিপক্ষ সৈন্যদের অবস্থান চিহ্নিত করতে পারে।
এ বিষয়ে এসআরবি-১০-এর কমান্ডার মোহাম্মাদ আসাদুজ্জামান টাইমসকে জানান, ওই ৩০ জন ভুক্তভোগী আপাতদৃষ্টিতে বৈধ প্রক্রিয়ায় রাশিয়ায় গেলেও পরবর্তীতে তাদের জোরপূর্বক রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থানায় রাজনের করা মামলার ভিত্তিতে এই মানব পাচার চক্রের দুই সদস্য–মিজানুর রহমান ও মো. আবু তাহের লেন্টুকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
আসাদুজ্জামান জানান, ওই ৩০ জনের মধ্যে ২১ জনকে মিজান জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সির মাধ্যমে নিয়োগ করা হয়েছিল বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া মোস্তাফিজুর রহমান ও আলী নামের আরও দুজন এবং হারিস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। রাশিয়ায় থাকা আরও দুজনও এই প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আসাদুজ্জামানের ভাষ্য, পাসপোর্ট তৈরি থেকে শুরু করে কর্মীদের বিমানে তুলে দেওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যবস্থা করতেন মিজান। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছে তরুণরা বুঝতে পারেন, তাদের যে কাজের কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে তা নয়।
আসাদুজ্জামান বলেন, “তারা মিজানকে অনুরোধ করে বলেছিলেন, আপনি আমাদের ভুল জায়গায় পাঠিয়েছেন। আমাদের রক্ষা করুন, দেশে ফিরিয়ে নিন।”
রাজনের পরিবারের অভিযোগ, ক্ষতিপূরণ চাইতে গেলে মিজান তাদের হুমকি দেন এবং মারধরের চেষ্টা করেন। পরে রাজনের বাবা পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন।
তবে কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জুলফিকার আলী টাইমসকে বলেন, রাজন ছাড়া অন্য কোনো ভুক্তভোগীর বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য নেই।
নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে পরিবার
রাশিয়ায় যাওয়া অনেক বাংলাদেশির পরিণতি এখনো অজানা। পুলিশের একটি গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, কয়েকজনের পরিবার তাদের মৃত্যুর খবর পেয়েছে। কিন্তু মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। আবার কোনো কোনো পরিবারের সঙ্গে দালালদের যোগাযোগও বন্ধ হয়ে গেছে।
সূত্রটির তথ্য অনুযায়ী, মাদারীপুরের সুরজ কাজী, কিশোরগঞ্জের জাহাঙ্গীর হোসেন এবং কুমিল্লার ইউসুফ খানের পরিবার তাদের মৃত্যুর খবর পেয়েছে।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন জেলার তরুণেরা উচ্চ বেতনের চাকরির আশায় রাশিয়ায় গেছেন বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি বিগত বছরগুলোতে কতজন বাংলাদেশিকে রুশ ভিসার অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং যারা গেছেন তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে–তা স্পষ্টভাবে জানাতে রুশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবরের মধ্যে ৮ হাজার ৬১৮ জন বাংলাদেশি রাশিয়ায় ভ্রমণের অনুমতি পেয়েছেন–এমন পরিসংখ্যান অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয় এবং বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।
তবে এই অনুমতি পাওয়ার মানে এই নয় যে তারা সবাই আসলে সেখানে পৌঁছাতে পেরেছেন, চাকরি পেয়েছেন কিংবা নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছেছেন। শরিফুল হাসান প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘তাদের কে নিয়োগ দিয়েছিল? কোন কোন এজেন্সি কাগজপত্র প্রক্রিয়াজাত করেছিল? কী ধরনের চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল? আর বাংলাদেশ ছাড়ার পর তাদের কী হয়েছে?’
সরকারের কঠোর পদক্ষেপের দাবি
বিদেশে কর্মসংস্থান ও অভিবাসনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, শ্রমিকরা কীভাবে সরকারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে পৌঁছাল, সে বিষয়ে জনশক্তি রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত এজেন্সিগুলোকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, গত এপ্রিলে রাশিয়া সফর শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান যখন জানান যে মস্কো বাংলাদেশি কর্মী নিতে আগ্রহী, তখন থেকেই এই নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও উৎসাহ পায়। অথচ কর্মীদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে–এমন খবর আসার পরও কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থাপক আল-আমিন নয়ন চাকরির প্রলোভনে মানুষকে শোষণকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিখোঁজ কর্মীদের পরিণতি নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
রাশিয়ার বিভিন্ন নিয়োগসংক্রান্ত ওয়েবসাইটে বাংলাদেশিসহ বিদেশিদের আকৃষ্ট করতে লাখ টাকা বেতনের চাকরির বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কিছু নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি আয় এবং আহত বা নিহত হলে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা প্রচার করেছেন। তবে এ ধরনের ক্ষতিপূরণ নিয়মিত দেওয়া হয়, এমন কোনো প্রমাণ মেলেনি।
বিদেশগামী কর্মীদের প্রক্রিয়া তদারকির দায়িত্বে থাকা জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক জামিল আহমেদকে বুধবার রাতে মন্তব্য নেওয়ার জন্য ফোন করা হলে তিনি মন্ত্রীর সঙ্গে ব্যস্ত আছেন জানিয়ে লাইন কেটে দেন।
এদিকে এসআরবি-১০-এর মেজর ইয়াসির জানান, দালালদের মাধ্যমে যাওয়া কিছু বাংলাদেশি গত চার মাস ধরে পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেননি। তারা বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন–তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন স্বজনরা।
উন্নত জীবনের আশায় সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়েছিলেন অনেক পরিবার। কিন্তু চাকরির প্রতিশ্রুতির আড়ালে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগে সেই স্বপ্ন এখন পরিণত হয়েছে দুশ্চিন্তায়।
এই তদন্ত প্রমাণ করেছে যে, বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে কাউকে যেন জোর করে ভিনদেশের যুদ্ধে ঠেলে দেওয়া না হয়–সেজন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা এবং নিখোঁজ কর্মীদের খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি।


