দুই গোলে এগিয়ে যাওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে হার–ফুটবলের এমন নির্মম থ্রিলার হজম করা যেকোনো দলের জন্ই অসম্ভব এক পাথর। মিসরের কোচ হোসাম হাসানের বুকেও এখন সেই পাথরসম কষ্ট। তবে আটলান্টার এই মহানাটকীয় হারের পেছনে ভাগ্যের চেয়েও মাঠের রেফারি ও ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা ফিফাকে পরোক্ষে দায়ী করছেন তিনি।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে কোনো রাখঢাক না রেখেই হাসান অভিযোগ তুলেছেন–মিসরের সঙ্গে ঘোর অন্যায় করা হয়েছে এবং লিওনেল মেসি ও বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে টুর্নামেন্টে টিকিয়ে রাখতেই মাঠের ভেতরে ও বাইরে কলকাঠি নাড়ানো হয়েছে।
আটলান্টায় শেষ ষোলোর এই ম্যাচে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, লিওনেল মেসি এবং এনজো ফার্নান্দেজের গোলে জয় নিশ্চিত করে আলবিসেলেস্তেরা। কিন্তু মিসর কোচের দাবি, মাঠের ফুটবলীয় লড়াইয়ে নয়, তারা হেরেছেন মাঠের বাইরের অদৃশ্য শক্তির কাছে।
বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে নিজের তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে হোসাম হাসান বলেন, ‘বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের চেয়ে আমরা ভালো খেলেছি। প্রায় সব দিকে এগিয়ে ছিলাম। কিন্তু মাঠের ভেতরের কিছু সিদ্ধান্ত এবং মাঠের বাইরের কিছু বিষয় ম্যাচের ফলকে প্রভাবিত করেছে। হয়তো তারা চেয়েছিল বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা টুর্নামেন্টে টিকে থাকুক। হয়তো তারা চেয়েছিল মেসি প্রতিযোগিতায় থাকুক।’
হাসানের অভিযোগ, ফুটবলে কখনো কখনো খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের চেয়ে বাইরের প্রভাব বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে, আর এই ম্যাচে আর্জেন্টিনা সেই সুবিধা পেয়েছে।
ম্যাচটিতে প্রধান রেফারির দায়িত্বে ছিলেন ফ্রান্সের ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে। ম্যাচ শুরুর আগে এই রেফারি নিয়োগ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল মিসর। সেই প্রসঙ্গ টেনে হাসান বলেন, ‘ফ্রান্স-আর্জেন্টিনার অতীতের বৈরিতার কারণে আমরা রেফারি নির্বাচনের বিরোধিতা করেছিলাম। কিন্তু আমাদের কথা শোনা হয়নি, শেষ পর্যন্ত ভুগতে হয়েছে আমাদেরই। আমরা সম্মান বা ফেয়ার প্লে–কিছুই পাইনি।’
মিসর কোচের দাবি, ম্যাচে তাদের দলের সবচেয়ে বড় তারকা মোহাম্মদ সালাহর ওপর স্পষ্ট ফাউল হওয়া সত্ত্বেও সম্ভাব্য পেনাল্টি দেওয়া হয়নি, এমনকি ভিএআর দেখার প্রয়োজনও বোধ করেননি রেফারি। এর ওপর ভিএআরের ‘মাইক্রোস্কোপিক’ চুলচেরা বিশ্লেষণে তাদের দ্বিতীয় গোলটি অদ্ভুতভাবে বাতিল করা হয়।
সবচেয়ে বড় বিতর্কটি তৈরি হয়েছে আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজের জয়সূচক গোলটিকে কেন্দ্র করে। হাসানের অভিযোগ, সেই গোলের ঠিক আগে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টার মিসরীয় খেলোয়াড়ের জার্সি টেনে ধরে ফাউল করেছিলেন।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সবাই দেখেছে আমাদের খেলোয়াড়ের জার্সি টেনে ধরা হয়েছিল। অথচ সেটিও ভিএআরে দেখা হয়নি। বাস্তব জীবন অন্যায্য হতে পারে, কিন্তু খেলাধুলায়ও কেন ন্যায্যতা থাকবে না? বলতে চাই ‘দুর্ভাগ্য’, কিন্তু বাস্তবে আমাদের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে।’
ম্যাচ শেষে মাঠে রেফারি লেতেক্সিয়েরের সঙ্গে তীব্র কথা কাটাকাটিতে জড়াতে দেখা গিয়েছিল মিসরীয় কোচকে। সেই উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় প্রসঙ্গে হাসান বলেন, ‘আমি রেফারিকে সরাসরি বলেছি, “এটা অন্যায়”। আমি বলেছি, হয়তো তার লুকানোর কিছু আছে। কেউ যদি কিছু লুকানোর চেষ্টা করে, অনেক সময় সেটি লুকিয়ে রাখতে পারে না।’
সংবাদ সম্মেলনের শেষ টানতে গিয়ে অভিমানে ও ক্ষোভে বিশ্বকাপ বর্জনের এক নজিরবিহীন ঘোষণা দেন এই মিসরীয় মাস্টারমাইন্ড। হাসান সাফ জানিয়ে দেন, ‘যাইহোক, আমার কাজ শেষ। এই টুর্নামেন্টের আর কোনো ম্যাচ আমি দেখব না।’
আটলান্টার রাতটি আর্জেন্টিনার জন্য রূপকথার প্রত্যাবর্তনের হলেও হোসাম হাসানের এই বিস্ফোরক বয়ান ফুটবল বিশ্বে রেফারিংয়ের ন্যায্যতা এবং ভিএআরের দ্বিমুখী নীতিকে আরও একবার বড়সড় কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিল।


