ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে নির্বাচনে অনিয়ম ও ভোট চুরির অভিযোগে রাজধানী নয়াদিল্লিতে বড় বিক্ষোভ শুরু করেছে বিরোধী দলগুলোর ইন্ডিয়া জোট।
রোববার ‘চলো দিল্লি’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে কংগ্রেসের সংসদ সদস্য রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধী নেতারা মিছিল নিয়ে রামলীলা ময়দানের দিকে যাত্রা করেছেন। সেখানে ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে বলা হয়, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব এবং পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতারা মিছিলে অংশ নিয়েছেন। তারা মিন্টো রোড ও কনট প্লেসের সংযোগস্থল থেকে রামলীলা ময়দানের উদ্দেশে যাত্রা করেন।
সমাবেশকে কেন্দ্র করে রোববার সকাল থেকেই রামলীলা ময়দানে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হতে থাকেন। বিরোধী জোটের দাবি, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ১০ লাখ মানুষ এই সমাবেশে অংশ নেবেন।
এর আগের দিন শনিবার কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের বাসভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে প্রতীকী অভিশংসন কর্মসূচি পালন করেন বিরোধী নেতারা। এর পরদিনই তারা রাজপথে বিক্ষোভের কর্মসূচি শুরু করেন।
এদিকে বিরোধীদের বিক্ষোভের দিনে পাল্টা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গার প্রতিবাদে রোববার দিল্লির হরি নগর এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করার কথা জানিয়েছে দলটি।
বার্তা সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার (পিটিআই) খবরে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরির নেতৃত্বে এই মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। এতে বিভিন্ন শিখ সংগঠনের সদস্যরাও অংশ নেবেন। বিরোধীদের বিক্ষোভের জন্য বেছে নেওয়া দিনটিকে কেন্দ্র করেই এই পাল্টা কর্মসূচির আয়োজন করেছে বিজেপি।
বিরোধীদের সমাবেশ ঘিরে দিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় ১০ হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য।
দিল্লি পুলিশের কেন্দ্রীয় বিভাগের উপকমিশনার রোহিত রাজবীর জানিয়েছেন, সমাবেশস্থল ও আশপাশের এলাকায় দুই শতাধিক নজরদারি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। পুরো এলাকায় পুলিশ সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি সমাবেশস্থলের নির্ধারিত ঘেরাও দেওয়া অংশগুলোতেও নিরাপত্তাকর্মী রাখা হয়েছে।
পুলিশ আগেই জানিয়েছিল, বিরোধী জোটের মিছিল আয়োজনে তারা পূর্ণ সহযোগিতা করবে।
তবে সমাবেশে জনসমাগম নিয়ে আয়োজক ও পুলিশের হিসাবে বড় পার্থক্য রয়েছে। বিরোধী জোট প্রায় ১০ লাখ মানুষের উপস্থিতি আশা করলেও পুলিশ রামলীলা ময়দানের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী ৫০ হাজার মানুষের জন্য নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়েছে।
দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, সমাবেশস্থলে জায়গা না হলে অতিরিক্ত লোকজনকে আশপাশের সড়কে আটকে রাখা হবে।
বিক্ষোভ ও মিছিলের কারণে দিল্লির বিভিন্ন সড়কে যান চলাচলেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। দিল্লি ট্রাফিক পুলিশ কেন্দ্রীয় দিল্লির কয়েকটি এলাকায় যানবাহন চলাচলের পথ পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা দিয়েছে। রোববার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এসব বিধিনিষেধ কার্যকর থাকবে।
এদিকে বিক্ষোভে অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দিল্লিতে আসা মানুষকে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। তিনি বিক্ষোভের পাশাপাশি উৎসবের মৌসুম উপলক্ষে কেনাকাটা করারও পরামর্শ দিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রাহুল বলেন, ‘দিল্লির বাইরে থেকে যে লাখ লাখ মানুষ এখানে আসছেন, আমি চাই তারা এখানকার ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করুন। প্রতিবাদ করুন, মিছিল করুন, সমাবেশ করুন। পাশাপাশি কিছু কেনাকাটাও করুন। এতে ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন।’
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের ক্ষোভ অবশ্য নতুন নয়। এর আগেও বিরোধী দলগুলো একাধিকবার ‘ভোট চুরির’ অভিযোগ তুলেছে। বিভিন্ন রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন কার্যক্রমেরও বিরোধিতা করেছে তারা।
তবে গত মাসে ভারতীয় সংবাদপত্র দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ১০ মাসে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অন্য নির্বাচন কমিশনাররা ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন।
অথচ নির্বাচন কমিশন বরাবরই দাবি করে এসেছে, তাদের সব সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবে নেওয়া হয়েছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন, ইন্ডিয়া জোটের শরিক দল এবং ককরোচ জনতা পার্টি বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেয়।
বিরোধীদের অভিযোগ, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এসব অভিযোগের প্রতিবাদেই প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার করেছে তারা।


