বিআরটিএ-পিডিবির ‘আইন দেখানো’ দ্বন্দ্বে ভোগান্তিতে গ্রাহক

১ নভেম্বর লিখিত অভিযোগ দেবে বিআরটিএ

বিআরটিএ-পিডিবির ‘আইন দেখানো’ দ্বন্দ্বে ভোগান্তিতে গ্রাহক
ছবি কোলাজ: টাইমস
Advertisement
Advertisement

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চট্টগ্রাম কার্যালয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনায় দুই সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের ঘটনা ঘটেছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বলছে বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। অন্যদিকে বিআরটিএর অভিযোগ, গাড়ির কাগজপত্র হালনাগাদ নিয়ে মতবিরোধের জেরে তাদের কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।

এ ঘটনায় ভোগান্তিতে পড়েছেন শত শত সেবাগ্রহীতা।

দুই সরকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রকৃত কারণ এবং এ ঘটনায় কার দায় কতটুকু, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিআরটিএ জানিয়েছে, আগামী ১ নভেম্বর পিডিবির কাছে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হবে।

গত বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নগরের বালুচড়া এলাকায় বিআরটিএ চট্টগ্রাম বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকার পর দুপুর ২টার দিকে সংযোগ পুনরায় চালু হয়। ওই দিন ছিল জরিমানা ছাড়া গাড়ির কাগজপত্র হালনাগাদের শেষ দিন। ফলে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক সেবা নিতে এসে বিপাকে পড়েন।

বিদ্যুৎ না থাকায় বিআরটিএ কার্যালয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বিশেষ করে ব্যাংকে ফি জমা দেওয়ার নির্ধারিত সময় বিকেল ৩টার আগে অনেক গ্রাহক প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করতে পারেননি। ফলে জরিমানা ছাড়া গাড়ির কাগজপত্র হালনাগাদের সুযোগ হারান অনেক গ্রাহক।

বকেয়া বিল, নাকি অন্য বিরোধ?

বিআরটিএ চট্টগ্রাম মেট্রো সার্কেল-২-এর উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) মো. সানাউল হক টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর প্রথমে তারা বিষয়টিকে লোডশেডিং মনে করেছিলেন। পরে আশপাশের এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় পিডিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন তাদের জানানো হয়, ৮৩ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।

তবে সানাউল হকের দাবি, তাদের কার্যালয়ে মাসে গড়ে প্রায় এক লাখ টাকার বিদ্যুৎ বিল আসে। ফলে বকেয়া হিসেবে উল্লেখ করা অর্থের প্রকৃত হিসাব ও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার আগে যথাযথভাবে জানানো হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, এর আগে পিডিবির একটি গাড়ির কাগজপত্র হালনাগাদ নিয়ে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মতবিরোধ হয়েছিল। গাড়িটি পিডিবির নিজস্ব যানবাহন না হয়ে একটি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের ব্যবহৃত গাড়ি হওয়ায় সরকারি বিধিবিধান অনুসারে সেটির কাগজপত্র হালনাগাদে জটিলতা দেখা দেয়।

সানাউল হকের ভাষ্য, প্রকল্পের গাড়ি ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধানের বিষয়টি ব্যাখ্যা করার পর পিডিবির কর্মকর্তারা অসন্তুষ্ট হন। এর পরিপ্রেক্ষিতেই পিডিবির ষোলশহর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সানাউল্লাহ আমাকে বলেন, ‘আপনারা আমাদের আইন দেখিয়েছেন, আমরাও আপনাদের আইন দেখাচ্ছি’—এমন মনোভাব থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়ে থাকতে পারে।

আরও পড়ুন

বিআরটিএ কর্মকর্তা সানাউল হক জানিয়েছেন, বিষয়টি মৌখিক সমঝোতায় সীমাবদ্ধ না রেখে আগামী ১ নভেম্বর পিডিবির প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হবে। অভিযোগের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছেও পাঠানো হবে।

সানাউল হক জানান, সংযোগ চালুর পর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাত ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত কাজ করে ৫০০-এর বেশি গ্রাহককে ফিটনেস সনদসহ বিভিন্ন সেবা দিয়েছেন। তবে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার সময় ব্যাংকে টাকা জমা দিতে না পারা গ্রাহকদের ভোগান্তি পুরোপুরি এড়ানো যায়নি।

পিডিবির দাবি নিয়ম মেনেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন

পিডিবির ষোলশহর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সানাউল্লাহ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, বিআরটিএ কার্যালয়ের একটি প্রিপেইড মিটার দীর্ঘদিন ধরে নন-ভেন্ডিং অবস্থায় রয়েছে। ওই মিটারের বিপরীতে প্রায় ৮৩ হাজার ২০০ টাকা বকেয়া রয়েছে। বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও বিল পরিশোধ কিংবা মিটার সমর্পণের উদ্যোগ না নেওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে নিয়ম অনুযায়ী সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ বিলের মাধ্যমে নিয়মিত বকেয়া পরিশোধের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। এ ছাড়া চিঠি ও মৌখিকভাবেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার আগের দিনও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

গাড়ির কাগজপত্র নিয়ে বিরোধের কারণে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ নাকচ করে সানাউল্লাহ বলেন, বিআরটিএ কার্যালয়ে তার কোনো ব্যক্তিগত গাড়ি যায়নি। সেখানে তার ব্যক্তিগত স্বার্থ বা রেষারেষিরও কোনো কারণ নেই। সরকারি প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব আদায়ের স্বার্থেই নিয়ম মেনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সানাউল্লাহ জানান, বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ বকেয়া বিল পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর পুনরায় বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করা হয়।

বকেয়া বিদ্যুৎ বিল নিয়ে পিডিবির দুই রকম বক্তব্য

পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সানাউল্লাহ বিআরটিএর কাছে বকেয়া বিদ্যুৎ বিল প্রায় ৮৩ হাজার ২০০ টাকা বকেয়ার তথ্য জানালেও বিপিডিবি’র পরিচালনা ও সংরক্ষণ সার্কেল পূর্ব চট্টগ্রামের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ কে এম জসিম উদ্দিন বলেন বিআরটিএ’র দুটি মিটারে প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত বিল বকেয়া রয়েছে।

তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ কে এম জসিম উদ্দিন টাইমসকে বলেন, ‘বিআরটিএকে বকেয়া বিল পরিশোধে বারবার চিঠি দেওয়ার পরেও পাত্তাই দিচ্ছেন না। অফিসে বারবার যোগাযোগ করা হলেও হাই লেভেলের সাথে ওনারা কোনো যোগাযোগ করেন না। সরকারের রেভিনিউ আদায়ের জন্য যেখানে সবাই ব্যস্ত, সেখানে তারা কোনো তোয়াক্কা করছেন না। তবে নির্বাহী প্রকৌশলী যে ৮০ হাজার টাকার কথা বলেছেন, সেটি হয়তো আরেকটি প্রিপেইড বা বড় মিটারের আংশিক বকেয়া হতে পারে। মূলত ৩-৪ মাসের বিল বকেয়া রয়েছে। মাঠে যারা কাজ করেন এবং স্থানীয় ব্রাঞ্চের অফিস ম্যানেজমেন্টের ব্যর্থতার কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দুই সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এমন সমন্বয়হীনতা কাম্য নয়।’

এদিকে, বিআরটিএর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে একটি গাড়ির কাগজপত্রের জটিলতা এবং অন্য বিষয় সময়মতো সমাধান না হওয়ার কারণে এই জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে এই বিষয়ে বিপিডিবির এই কর্মকর্তা জানান, এ বিষয়ে তাদের কোনো পূর্বের বা পরিষ্কার ধারণা ছিল না।

এদিকে এ ঘটনায় দুই সরকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং গ্রাহকসেবার প্রতি দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন উঠেছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজির হোসাইন বলেন, দুটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের বিরোধ বা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

‘একটি সংস্থার সঙ্গে আরেকটি সংস্থার এমন বিরোধের কারণে সাধারণ গ্রাহকদের যে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে, তা অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত। এর দায় সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থাগুলোকেই নিতে হবে’, যোগ করেন তিনি।

নাজির হোসাইনের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে গ্রাহকেরা যেন সেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সে জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad