ছয় দশকের দীর্ঘ অভিনয়জীবনে মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদান রাখা ব্রিটিশ অভিনয়শিল্পী স্যার প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট ৮৬ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজ বাড়িতে মারা গেছেন। আলঝেইমারস রোগ ও লুই বডি ডিমেনশিয়ার সঙ্গে লড়াই করছিলেন তিনি।
তার মুখপাত্র কেলি বুশ নোভাক জানিয়েছেন, স্ত্রী সানি ওজেল, পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের মাঝে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন স্টুয়ার্ট।
১৯৪০ সালের ১৩ জুলাই ইংল্যান্ডের ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ারের মিরফিল্ডে জন্ম তার। তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট প্যাট্রিকের বাবা আলফ্রেড স্টুয়ার্ট ছিলেন সাবেক সেনাসদস্য ও দক্ষ শ্রমিক। মা গ্ল্যাডিস স্টুয়ার্ট কাজ করতেন বস্ত্রশিল্পে। সাধারণ শ্রমজীবী পরিবারে বেড়ে ওঠা প্যাট্রিকের শৈশব খুব একটা স্বচ্ছন্দ ছিল না।
মাত্র ১২ বছর বয়সে এক ইংরেজি শিক্ষক তাকে শেক্সপিয়রের দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিস নাটকে শাইলকের চরিত্রে অভিনয়ের দায়িত্ব দেন। সেই অভিজ্ঞতাই অভিনয়ের প্রতি তার ভালোবাসার সূচনা করে। পারিবারিক অস্থিরতার মধ্যে নাটক হয়ে ওঠে তার আশ্রয়।
১৯ বছর বয়সে অ্যালোপেশিয়া রোগের কারণে চুল হারান স্টুয়ার্ট। এরপর ১৯৫৭ সালে ব্রিস্টল ওল্ড ভিক থিয়েটার স্কুলে অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৬৬ সালে যোগ দেন রয়্যাল শেক্সপিয়র কোম্পানিতে। সেখানে টানা ১৬ বছর অ্যান্টনি অ্যান্ড ক্লিওপেট্রা ও হ্যামলেটসহ বিভিন্ন নাটকে অভিনয় করেন।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনটি লরেন্স অলিভিয়ের পুরস্কার, পিটার অ্যান্ড দ্য উলফ বর্ণনার জন্য গ্র্যামি পুরস্কার এবং ম্যাকবেথ নাটকে অভিনয়ের জন্য টনি পুরস্কারের মনোনয়ন পান তিনি। ২০১০ সালে ব্রিটিশ রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করেন।
১৯৮৭ সালে ৪৭ বছর বয়সে ‘স্টার ট্রেক: দ্য নেক্সট জেনারেশন’ সিরিজে ক্যাপ্টেন জ্যঁ-লুক পিকার্ডের চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব পান স্টুয়ার্ট। শুরুতে তিনি নিজেও ভাবেননি, এই চরিত্র তার জীবনের অন্যতম পরিচয় হয়ে উঠবে। স্টুয়ার্টের অভিনয়দক্ষতা ও চরিত্র নির্মাণের স্বতন্ত্র পদ্ধতি পিকার্ডকে অন্য মাত্রা দেয়।
সিরিজটির ১৭৮টি পর্ব, চারটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং ‘স্টার ট্রেক: পিকার্ড’-এর তিন মৌসুমে অভিনয় করেন তিনি। ‘মেক ইট সো’ ও ‘এনগেজ!’ তার মুখে বলা এই সংলাপগুলো জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। চরিত্রটির আর্ল গ্রে চায়ের প্রতি ভালোবাসাও দর্শকদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে।
২০০০ সালে ‘এক্স-মেন’ চলচ্চিত্রে প্রফেসর চার্লস জেভিয়ারের চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন স্টুয়ার্ট। টেলিপ্যাথিক ক্ষমতাসম্পন্ন মিউট্যান্টদের এই নেতার চরিত্রে ২০১৭ সালের লোগান পর্যন্ত সাতটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। পরে ডক্টর স্ট্রেঞ্জ ইন দ্য মাল্টিভার্স অব ম্যাডনেস চলচ্চিত্রেও চরিত্রটিতে ফিরে আসেন। তার শেষ চলচ্চিত্র ছিল অ্যাভেঞ্জার্স: ডুমসডে।
বিজ্ঞান কল্পকাহিনির বাইরেও অভিনয়ের বৈচিত্র্য দেখিয়েছেন তিনি। সেথ ম্যাকফারলেনের কমেডি সিরিজ ব্লান্ট টক, রিকি জারভেইসের এক্সট্রাস এবং টেড, আমেরিকান ড্যাড ও দ্য সিম্পসনস-এর মতো প্রযোজনায় কণ্ঠ দিয়ে নিজের কৌতুকপ্রতিভার পরিচয় দেন।
স্টুয়ার্টের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অভিনয়জগতের সহকর্মী ও ভক্তদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। অভিনেতা হিউ জ্যাকম্যান তাকে মঞ্চ ও পর্দার অন্যতম সেরা শিল্পী হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার সুযোগ হয়েছে।
ইয়ান ম্যাককেলেন স্মরণ করেন, স্টুয়ার্টের ব্যক্তিত্বে তার ইয়র্কশায়ারের শিকড় গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল। তিনি নিজের আবেগ অকপটে প্রকাশ করতেন।
‘স্টার ট্রেক’-এর আরেক তারকা উইলিয়াম শ্যাটনার বলেন, স্টুয়ার্ট তার প্রতিটি কাজেই বুদ্ধিমত্তা, সৌজন্য ও গভীর মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন। জর্জ টেকেইও তাকে স্মরণ করে বলেন, মানবতার আরও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা এক প্রজন্মের দর্শককে অনুপ্রাণিত করেছিলেন এই অভিনেতা।
সেথ ম্যাকফারলেন তাঁকে বিনয়ী কিংবদন্তি হিসেবে অভিহিত করে বলেন, স্টুয়ার্ট যেকোনো সংলাপকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারতেন। অন্যদিকে রিকি জারভেইস তাদের একসঙ্গে কাজ করার পেছনের কিছু দৃশ্য প্রকাশ করে বন্ধুকে স্মরণ করেন।


