কর্মজীবী নারীদের যৌনকর্মীর সঙ্গে তুলনা/ আমিরের অ্যাকাউন্ট হ্যাক মামলার তদন্তে জামায়াতের অসহযোগিতা

ডিবি ডিভাইস চেয়ে তিনবার চিঠি দিয়েছে। জামায়াতের প্রচার বিভাগের প্রধান বলছে, ডিভাইস দেওয়া সম্ভব নয়। মামলার আসামি অবসরের শেষ বছরে সাময়িক বরখাস্ত হয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

আমিরের অ্যাকাউন্ট হ্যাক মামলার তদন্তে জামায়াতের অসহযোগিতা
শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্টের স্ক্রিনশট।
Advertisement
Advertisement

জাতীয় নির্বাচনের আগে ঘর থেকে নারীদের বের হওয়াকে পতিতাবৃত্তির সঙ্গে তুলনা করে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের এক্স হ্যান্ডেল থেকে পোস্ট দেওয়ার পর অ্যাকাউন্ট হ্যাক দাবি করলেও তদন্তে সহযোগিতা পাচ্ছে না গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

জামায়াতের অভিযোগ, সে সময়ের তদন্ত সংস্থা গাফিলতি করেছে এবং ঢিমেতালে তদন্ত করেছে এবং এখন কোনো ডিভাইস দেওয়া হবে না।

ডিবি বলছে, জামায়াতের পক্ষ থেকে সে সময় যে মামলা করা হয়, তার তদন্তে জামায়াত আমিরের মোবাইল ফোনসহ এক্স হ্যান্ডেল যেসব ডিভাইস থেকে চালানো হয়, সেগুলো চেয়ে অন্তত তিনবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। ডিভাইস জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য আদালতের অনুমতিও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু জামায়াতের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।

এই পরিস্থিতিতে বিপাকে আছেন জামায়াতের করার মামলার আসামি বঙ্গভবনের সে সময়ের সহকারী প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ছরওয়ারে আলম।

মামলার পর থেকে তিনি সাময়িক বরখাস্ত আছেন। কেবল খোরপোশ ভাতা, যেটি মূল বেতনের অর্ধেক, এ দিয়ে সংসারের খরচ সামলানো যাচ্ছে না। ধার-দেনায় জর্জর হয়ে যাচ্ছেন তিনি।

তার দুশ্চিন্তা অন্য জায়গায়। এখন পর্যন্ত তিনি সরকারি কোয়ার্টারে আছেন। আগামী ডিসেম্বরে তিনি অবসরপূর্ব ছুটিতে (এলপিআর) যাচ্ছেন। এরপর আর এই বাসায় থাকতে পারবেন কি না, সেটি তিনি বুঝতে পারছেন না।

কেবল খোরপোশ ভাতায় বাড়ি ভাড়াও চলবে না, এটাই তার দুশ্চিন্তার কারণ।

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের প্রচার চলাকালে গত ৩১ জানুয়ারি বিকালে জামায়াতের আমিরের এক্স হ্যান্ডেল থেকে ইংরেজিতে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। পোস্টের একাংশে বলা হয়, ‘আমরা বিশ্বাস করি, যখন নারীদের আধুনিকতার নামে ঘর থেকে বের করা হয়, তখন তারা শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় ও নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হন। এটি অন্য কিছু নয়, বরং পতিতাবৃত্তির অন্য একটি রূপ।’

এ নিয়ে তুমুল সমালোচনা শুরু হয়। নারী বিষয়ক নানা সংগঠন রাজপথে বিক্ষোভ করে। বিএনপির পক্ষ থেকে জামায়াতকে আক্রমণ করা হয় যে, দলটি কর্মজীবী নারীদের চরম অবমাননা করেছে।

আরও পড়ুন

এই পরিস্থিতিতে জামায়াত দাবি করে তাদের আমিরের এক্স হ্যান্ডেল হ্যাকড হয়েছিল। ওই রাতেই রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় জামায়াতের পক্ষ থেকে সাধারণ ডায়েরি করা হয়। পরে হয় মামলা, যাতে ছরওয়ার ছাড়াও অজ্ঞাতনামা ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামি করা হয়।

যার বাদী মো. সিরাজুল ইসলাম, যিনি জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে ছিলেন।

৩ ফেব্রুয়ারি আটক হন বঙ্গভবনের সে সময়ের সহকারী প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ছরওয়ার। পরদিন তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে তোলা হয়। আদালতে তার জোরালো বক্তব্যের পর মেলে জামিন।

তবে মামলার আসামি হওয়ার পর কর্মজীবনের শেষ বছরে সাময়িক বরখাস্ত হন এই কর্মকর্তা। তদন্ত শেষ না হওয়ায় এখনো এভাবেই চলছে তার জীবন।

ছরওয়ার টাইমসকে বলেন, ‘আমাকে এক-দেড় মাস পরপর আদালতে হাজিরা দিতে হয়। আমি বহুবার বলেছি তদন্ত শেষ করতে। এও বলেছি, ওরা (জামায়াত) যেহেতু যাচাই করতে দিচ্ছে না, আমার যা যা নেওয়া দরকার নিয়ে যাচাই করুক, তাহলে আমি রেহাই পেতাম।’

অজ্ঞাত পরিচয় অন্য আসামি হিসেবে কাউকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা যায়নি।

ছরওয়ারের মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও ডেস্কটপের পাশাপাশি তার পরিবারের সদস্যদের ব্যবহৃত কিছু ডিভাইসও সে সময় জব্দ করা হয়েছিল। প্রায় এক মাস পর সেগুলো ফেরত দেওয়া হয়।

মামলাটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম-দক্ষিণ ইউনিট।

সংস্থাটির অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) হাফিজুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, ‘আদালতের অনুমতি নিয়ে বাদীপক্ষের কাছে ডিভাইস ও প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে তিন দফায় চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো সেগুলো পাওয়া যায়নি। ডিভাইস হাতে পাওয়ার পর ফরেনসিক পরীক্ষা শেষে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো সম্ভব হবে।’

কেন ডিভাইস দেওয়া হচ্ছে না, এই প্রশ্ন নিয়ে জামায়াতের মামলার বাদী সিরাজুল ইসলামকে কল দিলে তিনি সেটি কেটে দিয়ে মেসেজ পাঠাতে বলেন। পরে তাকে প্রশ্ন পাঠালে তিনি সেটি দেখেও জবাব দেননি।

পরে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘সে সময় তাৎক্ষণিকভাবে ডিভাইসের পাসওয়ার্ড চেঞ্জ করতে হয়েছে। প্রথমে তো তারা (পুলিশ) স্বীকার করে না। তাদের গাফিলতি ছিল, তারা ঢিমেতালে কাজ করেছে। এখন দেখছি তারা বলছে আমরা ডিভাইস দিচ্ছি না। কিন্তু এখন ডিভাইস দেওয়ার সুযোগ নেই।’

তাহলে মামলার ভবিষ্যৎ কী–এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আদালত এর ফয়সালা করবে। তারা যেটা ভালো মনে করবে সেটা করুক।’

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি ওমর ফারুক ফারুকী মনে করেন জামায়াতের এই অবস্থান সঠিক নয়। তিনি বলেন, ‘তদন্তের স্বার্থে তদন্ত কর্মকর্তাকে অবশ্যই সহযোগিতা করা উচিত। এটা বাদী-বিবাদী সবারই দায়িত্ব।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad