কক্সবাজারের হিমছড়ি সমুদ্রসৈকতে গোসলে নেমে ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে তিন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার বিকালে এ ঘটনায় আরও দুই পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন।
কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের হিমছড়ি পয়েন্টে বুধবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত ও নিখোঁজ পাঁচ পর্যটকের বয়স ২৬ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। তারা সবাই পুরুষ।
রামু থানাধীন হিমছড়ি পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (আইসি) সুমনাথ বসু দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, নিহত ও নিখোঁজ পর্যটকদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। তবে তারা ঢাকা থেকে কক্সবাজার বেড়াতে এসেছিলেন।
পুলিশ কর্মকর্তা সুমনাথ বসু জানান, বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে পর্যটকেরা হিমছড়ি পয়েন্টে গোসলে নামেন। কিছুক্ষণ পর তারা সমুদ্রের ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে যান। সন্ধ্যা ৬টার দিকে তাদের মধ্যে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বাকি দুইজনের খোঁজ পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও জানান, নিহতদের মরদেহ সমুদ্র থেকে উপকূলে নিয়ে আসা হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেননি তিনি।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে গোসলে নেমে প্রতিবছরই পর্যটকদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। বিশ্বের দীর্ঘতম বালুকাময় এই সমুদ্রসৈকতে গুপ্তখাল ও তীব্র স্রোতের টানে ভেসে গিয়ে প্রতিবছর গড়ে ছয় থেকে ১৬ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েছে। বর্তমানে বছরে এ সংখ্যা ১২ থেকে ১৬ জনে দাঁড়িয়েছে।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে দায়িত্বরত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সিআইপিআরবি পরিচালিত সি-সেইফ লাইফগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সৈকতে পানিতে ডুবে ছয় পর্যটকের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ১২ জনে দাঁড়ায়। ২০২৫ সালে তা বেড়ে অন্তত ১৬ জনে পৌঁছায়।
সামগ্রিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১২ বছরে সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে গোসলে নেমে অন্তত ৭৬ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে লাইফগার্ড কর্মীরা মুমূর্ষু বা বিপদাপন্ন অবস্থায় থাকা ১ হাজার ৪৩ জন পর্যটককে উদ্ধার করে জীবন বাঁচিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরেও সৈকতে পানিতে ডুবে পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। বুধবার হিমছড়ি পয়েন্টে তিনজনের মৃত্যুর আগে গত ১৮ সেপ্টেম্বর সুগন্ধা-কলাতলী পয়েন্টে একজন এবং ২৬ আগস্ট লাবণী-সুগন্ধা পয়েন্টে একজন পর্যটকের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় আরও একজন নিখোঁজ ছিলেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের মৃত্যুর ঘটনা বাড়ার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে। এগুলো হলো গুপ্তখাল ও রিপ কারেন্ট, সৈকতের বিশাল অংশ অরক্ষিত থাকা এবং পর্যটকদের সতর্কতা না মানা।
সমুদ্রের তলদেশে তৈরি হওয়া অদৃশ্য গর্ত বা গুপ্তখাল এবং ভাটার সময় সৃষ্টি হওয়া তীব্র উল্টো স্রোক সম্পর্কে পর্যটকদের ধারণা থাকে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এসব স্রোত মুহূর্তের মধ্যে মানুষকে গভীর সমুদ্রে টেনে নিয়ে যেতে পারে।
এ ছাড়া ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতের মধ্যে লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টের মাত্র তিন কিলোমিটার এলাকায় লাইফগার্ড সেবা রয়েছে। সেখানে দুই শিফটে মাত্র ২৭ জন কর্মী দায়িত্ব পালন করেন।
অন্যদিকে, হিমছড়ি, ইনানী, পাটুয়ারটেক ও দরিয়ানগরের মতো জনপ্রিয় পয়েন্টগুলোতে প্রতিদিন হাজারো পর্যটকের সমাগম হলেও সেখানে লাইফগার্ডের কার্যক্রম নেই। ফলে এসব এলাকায় কেউ স্রোতে ভেসে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হয় না।
বিপজ্জনক স্থান চিহ্নিত করে বালুচরে লাল পতাকা টানানো থাকলেও অনেক পর্যটক তা উপেক্ষা করে পানিতে নামেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এ ছাড়া লাইফগার্ড কর্মীদের দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর, অর্থাৎ সূর্যাস্তের পরে বা অন্ধকারে সমুদ্রে নামার কারণেও অনেক দুর্ঘটনা ঘটে।
পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু তিন কিলোমিটার এলাকায় সীমাবদ্ধ না রেখে হিমছড়ি ও ইনানীসহ পুরো পর্যটন এলাকায় দ্রুত লাইফগার্ডের সংখ্যা ও কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে পর্যটকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে প্রশাসনের আরও কঠোর নজরদারি দরকার।


