‘জিয়া স্যার’ গুলি করতেন, মরদেহ ফেলা হতো নদীতে

‘জিয়া স্যার’ গুলি করতেন, মরদেহ ফেলা হতো নদীতে
বহিষ্কৃত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান | ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম ও হত্যার অভিযোগে করা মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ বুধবার সাক্ষ্য দিয়েছেন মো. আব্বাস মল্লিক।

ষাট বছর বয়সী এই সাক্ষী দাবি করেন, ২০১০ সালে র‍্যাবের অভিযানের সময় ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ধরে আনা বন্দীদের নৌকায় করে গভীর নদীতে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হতো এবং পরে তাদের মরদেহ পানিতে ফেলে দেওয়া হতো।

আব্বাস মল্লিকের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব হত্যাকাণ্ডে জিয়াউল আহসান সরাসরি অংশ নিতেন। তিনি আরও বলেন, আর ছোট ভাই আলকাছ মল্লিক, যিনি র‍্যাবের সঙ্গে নৌযান চালানোর কাজে যুক্ত ছিলেন; ২০১১ সালে র‍্যাবের পরিচয়ে ফোন পাওয়ার পর নিখোঁজ হন। তিনি এ নিখোঁজের ঘটনায় জিয়াউল আহসানের বিচার দাবি করেন।

ট্রাইব্যুনাল তার সাক্ষ্য গ্রহণ করে। জবানবন্দি শেষে জিয়াউল আহসানের আইনজীবী সৈয়দ মিজানুর রহমান ও সাহিদুর রহমান সাক্ষী আব্বাস মল্লিককে জেরা করেন। প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও তাসমিরুল ইসলাম।

আব্বাস মল্লিক জবানবন্দিতে বলেন, ‘আমার বাড়ি বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার দক্ষিণ চর দুয়ানী গ্রামে। তিনি জেলের কাজ করেন এবং হাল চাষ করেন। তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি মেজো। তার বড় ভাই সোহরাব মল্লিক এবং ছোট ভাই আলকাছ মল্লিক।’

তার ভাষ্য, আলকাছ কিছুটা লেখাপড়া জানতেন। প্রায় ২৫-২৬ বছর আগে তিনি সৌদি আরবে যান এবং সেখানে ছয়-সাত বছর কাজ করার পর চর দুয়ানীতে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে তিনি দুটি মাছ ধরার ট্রলার বা বোট তৈরি করেন। একটি আব্বাসের দায়িত্বে এবং অন্যটি জলিল মাঝির দায়িত্বে দেন। আলকাছও মাঝে মাঝে তাদের সঙ্গে নদীতে মাছ ধরতে যেতেন।

আব্বাস বলেন, ২০১০ সালে র‍্যাব সদস্যদের চর দুয়ানী ও কাঠালতলী এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল। তারা বোট মালিকদের ডেকে অভিযানের জন্য ট্রলার বা বোট দিতে বলতেন। যেদিন র‍্যাব এলাকায় আসত, সেদিন বিকালে সাদা পোশাকে দুজন র‍্যাব সদস্য এলাকায় আসতেন এবং দোকান মালিকদের সন্ধ্যার পর দোকান বন্ধ ও বাতি নিভিয়ে রাখতে বলতেন।

তার বর্ণনা অনুযায়ী, রাত ১১টা বা ১২টার দিকে চার-পাঁচটি মাইক্রোবাস এসে বরফ মিলের সামনে থামত। সেখান থেকে হাত ও চোখ বাঁধা বন্দীদের নৌকায় তোলা হতো। আব্বাস দাবি করেন, এসব বন্দীকে ঢাকা থেকে আনা হতো।

বন্দীদের সঙ্গে সিমেন্টের বস্তা, রশি ও হোগলা নেওয়া হতো রিয়াজের দোকান থেকে। এরপর মাঝিদের নৌকা চালিয়ে চর দুয়ানী হয়ে বলেশ্বর নদীতে যেতে বলা হতো। সেখান থেকে আরও গভীর পানিতে যেতে বলা হতো এবং প্রায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা নৌকা চালিয়ে তারা গভীর পানিতে পৌঁছাতেন।

আব্বাসের ভাষ্য, গভীর পানিতে পৌঁছানোর পর বন্দীদের নৌকার নিচের অংশ, যাকে তারা ‘খোন্দা’ বলেন, এবং ওপরের ছাউনিযুক্ত ঘর বা ‘ব্রিজ’ থেকে বের করে আনা হতো। নৌকার দুই পাশে থাকা ‘সাপোর্ট’ অংশের ওপর একজন বন্দীকে বসানো হতো এবং দুই র‍্যাব সদস্য তাকে চেপে ধরে রাখতেন।

এরপর, সাক্ষীর দাবি অনুযায়ী, ‘জিয়া স্যার’ ওই বন্দীর মাথা, কান অথবা বুকে গুলি করতেন। কোনো বন্দীকে একবার এবং কাউকে দুবার গুলি করা হতো বলে তিনি বলেন।

আব্বাস আরও বলেন, গুলিতে নিহত ব্যক্তির গলায় অথবা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বাঁধা হতো এবং মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। এভাবে একের পর এক বন্দীকে হত্যার পর তারা সুন্দরবনের দিকে যেতেন।

আরও পড়ুন

সুন্দরবনে গিয়ে অন্য বন্দীদের নৌকা থেকে নামিয়ে নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হতো বলে দাবি করেন আব্বাস। এরপর র‍্যাব সাংবাদিকদের ফোন করে ডেকে আনত এবং মরদেহগুলো বিভিন্ন থানায় জমা দেওয়া হতো বলে তিনি সাক্ষ্য দেন।

আব্বাস বলেন, এরপর বোট ধুয়ে তারা চর দুয়ানীর বরফ মিলে ফিরে আসতেন। তার ভাষ্য, বন্দীদের পেট কেটে দেওয়ার কারণে নাড়িভুঁড়ি ও মস্তিষ্ক বেরিয়ে আসত এবং শরীর থেকে রক্ত পড়ত। এ কারণেই বোট ধোয়ার প্রয়োজন হতো।

সাক্ষী বলেন, ফিরে আসার পর মেজর সাব্বির মাঝিদের বলতেন, ‘তোমাদের জিয়া স্যার ডাকে’। এরপর মাঝিরা জিয়াউল আহসানের কাছে গেলে তিনি প্রত্যেককে কখনো দুই হাজার, কখনো পাঁচ হাজার টাকা দিতেন। আব্বাসের দাবি, টাকা খামে করে দেওয়া হতো।

আলকাছ মল্লিকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি বর্ণনা করতে গিয়ে আব্বাস বলেন, আমার ছোট ভাই র‍্যাবের সঙ্গে কাজ করত। ২০১১ সালের মাঝামাঝি কোনো একদিন র‍্যাব থেকে আলকাছ মাঝিকে ফোন করে বলা হয়, ‘জিয়া স্যার তোমাকে বটতলা মানিকখালী আসতে বলেছে।’

আব্বাস বলেন, র‍্যাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে আলকাছ বাজারে আলোচনা করতেন। এ কারণে অন্য বোট মালিকেরা তাকে বলতেন, ‘র‍্যাব তোমার ওপর খুব ক্ষ্যাপা।’

সাক্ষীর ভাষ্য, ২০১১ সালের মাঝামাঝি কোনো একদিন র‍্যাবের পরিচয়ে আলকাছকে ফোন করা হয়। সেদিন দুপুরে ভাত খেয়ে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। সন্ধ্যা ৭টা বা ৮টার দিকে আলকাছের স্ত্রী আব্বাসকে ফোন করে জানান, মাইজা ভাই, আলকাছ র‍্যাবের ফোন পেয়ে জিয়া স্যারের সঙ্গে দেখা করতে বটতলা মানিকখালী গেছে, এখন তার ফোন বন্ধ পাচ্ছি।

এরপর পরিবারের সদস্যরা আলকাছকে খুঁজতে শুরু করেন এবং থানায় যান। আব্বাস বলেন, থানার লোকজন তাদের নিজেদের খুঁজে দেখতে বলেন। পরে তারা খুলনা, পটুয়াখালী, বরিশাল ও ঢাকা র‍্যাব অফিসে গিয়ে আলকাছের সন্ধান করেন। কিন্তু কোথাও তাকে পাওয়া যায়নি।

পরে পাথরঘাটা থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয় বলে সাক্ষী জানান। তার দাবি, জিডিতে জিয়াউল আহসান ও র‍্যাবের নাম অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ করা হলেও পুলিশ তা করেনি।

আমার ভাইকে আর কোথাও খুঁজে পাইনি, বলেন আব্বাস। তিনি আরও বলেন, আমি আমার ছোট ভাই আলকাছ মল্লিকের নিখোঁজের জন্য জিয়া স্যারের বিচার চাই।

হাতকড়া, হেলমেট ও ভেস্ট নিয়ে জিয়াউলের অভিযোগ

সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কথা বলার অনুমতি চান জিয়াউল আহসান। ট্রাইব্যুনালের অনুমতি পেয়ে তিনি বলেন, সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকার সময় প্রশিক্ষণের সময় আমার কোমর ও ঘাড়ে ব্যথা হয়েছিল। কিন্তু কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে আনার সময় হাতে হাতকড়া, মাথায় হেলমেট এবং বুকে ভেস্ট বা জ্যাকেট পরানো হয়।

এসব থেকে অব্যাহতি চেয়ে জিয়াউল বলেন, ‘মনে হয় আমি সবার টার্গেট। আমি সুবিচার চাই।’

ট্রাইব্যুনাল এ বিষয়ে প্রসিকিউশনের মতামত জানতে চাইলে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি পুরোপুরি কারা কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার। তবে তার প্রতি আচরণে কোনো ব্যত্যয় হলে অথবা ট্রাইব্যুনালে হাজির করার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেআইনি কিছু করলে আদালত ব্যবস্থা নিতে পারে বলে জানান তিনি।

মিজানুল ইসলাম আরও বলেন, তার ধারণা, নিরাপত্তাজনিত কারণেই জিয়াউল আহসানকে এভাবে ট্রাইব্যুনালে আনা হচ্ছে।

এরপর ট্রাইব্যুনাল জিয়াউলকে বলে, প্রসিকিউশন জানিয়েছে, নিরাপত্তা দেওয়ার স্বার্থেই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

জবাবে জিয়াউল বলেন, প্রিজনভ্যান থেকে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানার দূরত্ব মাত্র পাঁচ গজ এবং গাড়ি থেকে নামানোর সময় প্রায় ২০ জন পুলিশ সদস্য উপস্থিত থাকেন।

তখন ট্রাইব্যুনাল মন্তব্য করে, পাঁচ গজ নয়, এক গজ থেকেও কেউ চাইলে স্নাইপারে টার্গেট করতে পারে।

জিয়াউল এর জবাবে বলেন, এখানে কাউকে টার্গেট করার কোনো দিক নেই এবং ট্রাইব্যুনালে নিরাপত্তা অনেক বেশি। তাই চাইলেই কেউ তাকে টার্গেট করতে পারবে না। তিনি আবারও হাতকড়া, হেলমেট ও ভেস্ট পরানো থেকে অব্যাহতি চান।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর