দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যৌন হয়রানির অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। দায়িত্ব পালনে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গাফিলতি প্রমাণ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ।
তিনি বলেন, শুধু যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করলেই হবে না, অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। নারী শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
বৃহস্পতিবার আগারগাঁওয়ে ইউজিসি ভবনে ইউজিসি ও ইউএন উইমেনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
কর্মক্ষেত্র, জনপরিসর ও উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্পের আওতায় এ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়।
ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে ইউজিসির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে এসব কমিটি প্রত্যাশা অনুযায়ী কার্যকর ভূমিকা পালন করছে না।
অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, ‘কমিটি শুধু গঠন করলেই হবে না, সেটিকে কার্যকরভাবে কাজ করতে হবে। কোনো নারী অভিযোগ করার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ যেন বলতে না পারে, এটা আমার কাজ নয়।’
প্রতিটি অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় প্রতিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে ইউজিসি ব্যবস্থা নেবে।
যৌন হয়রানি ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম সমন্বয় ও তদারকির জন্য জাতীয় পর্যায়েও একটি কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান ইউজিসি চেয়ারম্যান।
প্রস্তাবিত কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ইউজিসির প্রতিনিধিরা থাকবেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অভিযোগ গ্রহণ ও প্রতিকারব্যবস্থা এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সমন্বয় ও তদারকিতে এ কমিটি কাজ করবে।
অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, যৌন হয়রানি ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি শূন্য সহনশীলতার নীতি কার্যকর করতে হবে। ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমন্বিতভাবে কাজ করলে ক্যাম্পাসগুলোকে আরও নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও সহায়ক শিক্ষার পরিবেশে পরিণত করা সম্ভব।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের ডেপুটি হেড বেইবা জেরিনা বলেন, গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে এবং উচ্চশিক্ষাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে যৌন হয়রানি ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য নিরসন গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ইউজিসি ও ইউএন উইমেনের এই সমঝোতার মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রতিকারব্যবস্থা জোরদার এবং নিরাপদ ও বৈষম্যহীন শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়বে।
সমঝোতার আওতায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশে যৌন হয়রানি ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
অভিযোগ কমিটি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, অভিযোগ গ্রহণ ও রেফারেল ব্যবস্থা উন্নত করা এবং শিক্ষার্থী ও কর্মীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে ইউএন উইমেন ও আইন ও সালিশ কেন্দ্র যৌথভাবে কাজ করবে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের জাতীয় জরিপের তথ্য তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণীদের মধ্যে ১৬ শতাংশ প্রযুক্তির মাধ্যমে সংঘটিত লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
অনুষ্ঠানে ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক মো. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিভাগের পরিচালক সুলতান মাহমুদ ভূঁইয়া, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটির সদস্য, ইউজিসি ও ইউএন উইমেনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ইউজিসির পক্ষে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন কমিশনের সচিব মো. ফখরুল ইসলাম এবং ইউএন উইমেনের পক্ষে বাংলাদেশ প্রতিনিধি গীতাঞ্জলি সিং।


