হেরেও কেপ ভার্দের ‘বিশ্বজয়’

হেরেও কেপ ভার্দের ‘বিশ্বজয়’
Advertisement
Advertisement

মায়ামির গ্যালারিতে তখন আকাশী-সাদার উৎসব। অথচ ফুটবল বিশ্বের স্পটলাইট কেড়ে নিয়েছেন নীল জার্সি পরা কয়েকজন ফুটবলার।

বিশ্বকাপ ফুটবলের রাউন্ড অব ৩২-এর মঞ্চে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে রূদ্ধশ্বাস নাটকীয় লড়াইয়ে ৩-২ গোলে হেরে মাঠ ছেড়েছে কেপ ভার্দে। কিন্তু স্কোরবোর্ড যা-ই বলুক না কেন, ইতিহাস বলবে—সেদিন মায়ামির মাঠে এক রূপকথার জন্ম দিয়েছিল আফ্রিকার এই ছোট্ট দ্বীপ রাষ্ট্র। তারা ম্যাচটি হেরেছে ঠিকই, তবে জয় করে নিয়েছে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়।

ফুটবলকে কেন ‘দ্য বিউটিফুল গেম’ বলা হয়, কেপ ভার্দে যেন আরও একবার তা মনে করিয়ে দিল। মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ জনসংখ্যার একটি দেশ, যাদের ফুটবল ইতিহাস পরাশক্তিদের তুলনায় নগণ্য, তারা যখন বিশ্বজয়ীদের মুখোমুখি হয়, তখন সমীকরণটা কাগজে-কলমে সহজই মনে হয়েছিল। কিন্তু কেপ ভার্দের ‘ব্লু শার্কস’রা যেন পণ করেই নেমেছিল, খেলার আগেই তারা হেরে বসে থাকবে না।

র‌্যাঙ্কিংয়ে আকাশ-পাতাল ব্যবধান, প্রতিপক্ষে লিওনেল মেসির মতো ‘ভিনগ্রহের’  ফুটবল মহাতারকার উপস্থিতি—কোনো কিছুই তাদের আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরাতে পারেনি। আন্তর্জাতিক ফুটবল বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ সমর্থক, সবাই এখন মন্ত্রমুগ্ধের মতো প্রশংসা করছেন এই দলটির মানসিক শক্তির।

আরও পড়ুন

ম্যাচের শুরু থেকেই কেপ ভার্দের খেলার ধরণ ছিল দেখার মতো। রক্ষণভাগে বাসের চাকা আটকে ডিফেন্সিভ ফুটবল খেলার কোনো মানসিকতাই তাদের ছিল না। বরং তারা খেলেছে ভয়ডরহীন, গতিশীল এবং দৃষ্টিনন্দন আক্রমণাত্মক ফুটবল। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের চোখে চোখ রেখে, নিখুঁত পাসের পসরা সাজিয়ে তারা বুঝিয়ে দিয়েছে—তারা এখানে কেবল অংশ নিতে আসেনি, বুক চিতিয়ে লড়তে এসেছে। লিওনেল মেসির জাদুকরী গোলে আর্জেন্টিনা যখন এগিয়ে যায়, তখনও কেপ ভার্দের ফুটবলারদের চোখে ভয় বা হতাশার কোনো ছাপ দেখা যায়নি। বরং তাদের শরীরী ভাষায় প্রকাশ পাচ্ছিল এক বুক জেদ। সেই জেদের ওপর ভর করেই তারা ম্যাচে দুই দুইবার সমতায় ফেরে, যা বিশ্বজুড়ে টেলিভিশন পর্দার সামনে থাকা দর্শকদের রোমাঞ্চিত করেছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মাধ্যমে এখন কেপ ভার্দের এই হার না মানা মানসিকতার প্রশংসা চলছে। ফুটবলপ্রেমীরা বলছেন, আর্জেন্টিনা ম্যাচ জিতেছে সত্যি, কিন্তু মন জিতেছে কেপ ভার্দে। ক্ষুদে এই দেশটির ফুটবলাররা প্রমাণ করেছেন, ফুটবল কেবল তারকাখ্যাতি বা বিশাল বাজেটের খেলা নয়; এটি মূলত তীব্র ইচ্ছা, শৃঙ্খলা এবং সাহসের খেলা। মাঠের প্রতিটি ইঞ্চি জায়গার জন্য তারা যেভাবে লড়াই করেছে, যেভাবে বিশ্বসেরা আক্রমণভাগকে রুখে দিতে নিজেদের উজাড় করে দিয়েছে, তা যেকোনো উদীয়মান দলের জন্য অনুপ্রেরণার এক অন্তহীন উৎস।

বিশেষ করে দলটির ৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহার অবিশ্বাস্য বীরত্ব এবং পুরো দলের একতাবদ্ধ পারফরম্যান্স মায়ামির গ্যালারিকে তাদের জন্য করতালি দিতে বাধ্য করেছে। অতিরিক্ত সময়ে একটি দুর্ভাগ্যজনক আত্মঘাতী গোলে যখন তাদের রূপকথার সমাপ্তি ঘটে, তখনো তাদের চোখে জল ছিল না, ছিল মাথা উঁচু করে বিদায় নেওয়ার এক পরম তৃপ্তি।

কেপ ভার্দে বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করে দিয়ে গেল, শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে ম্যাচ শুরুর আগেই যারা মনস্তাত্ত্বিকভাবে হেরে যায় না, দিনশেষে ফুটবল দেবতা তাদেরই অমরত্ব দেন। বিশ্বকাপ থেকে দলটির এই বিদায় কেবলই একটি টুর্নামেন্টের সমাপ্তি, কিন্তু তাদের এই অদম্য লড়াইয়ের গল্প ফুটবল ইতিহাসের পাতায় চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad