১ কোটি ২০ লাখ টাকার সড়ক গায়েব!

১ কোটি ২০ লাখ টাকার সড়ক গায়েব!
হারিয়ে যাওয়া রাস্তা। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

এক দশকেরও বেশি সময় আগের কথা। অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বদলে দিতে আর ফসল পরিবহন সহজ করতে পাবনার বেড়া উপজেলায় নির্মাণ করা হয় পাঁচ কিলোমিটারের একটি পাকা রাস্তা। নাম: বারশিলা–নলভাঙ্গা–খাকছড়া সড়ক। খরচ হয়েছিল ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। তবে নির্মাণের পর বছর গড়ালেও সড়কটির দিকে আর কোনো নজর দেয়নি কর্তৃপক্ষ, হয়নি কোনো সংস্কার।

কাগজে-কলমে আর মানুষের স্মৃতিতে রাস্তাটি থাকলেও বাস্তবে এখন এর কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া ভার। নিয়মিত তদারকি আর সংস্কারের অভাবে এটি প্রায় হারিয়ে গেছে। একসময় যে রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন শ শ গাড়ি চলাচল করত, তা এখন খানাখন্দ আর ঝোপঝাড়ে ঢেকে একেবারেই চলাচলের অযোগ্য। ফলে বলতে গেলে, পুরো রাস্তাটির বড় একটি অংশই এখন উধাও।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালে বারশিলা–নলভাঙ্গা–খাকছড়া সড়কটির কাজ শেষ হয়। প্রায় পাঁচ কিলোমিটারের এই পথটি বেড়া পৌরসভার বারশিলা থেকে শুরু করে বিল এলাকার ওপর দিয়ে নলভাঙ্গা হয়ে খাকছড়া পর্যন্ত চলে গেছে।

রাস্তাটি চালুর পর উপজেলা সদরের সাথে নলভাঙ্গা, খাকছড়া, চাকলা, দমদমা, জয়নগর ও কৈটোলাসহ আশেপাশের অন্তত ১০টি গ্রামের যোগাযোগ খুব সহজ হয়ে গিয়েছিল। দ্রুতই এটি এলাকার অন্যতম ব্যস্ত রাস্তায় পরিণত হয়। প্রতিদিন শ শ যানবাহনে চড়ে কৃষক তার ফসল নিয়ে হাটে যেতেন, শিক্ষার্থীরা যেতেন স্কুলে। কিন্তু এখন সেসব চলাচল একেবারেই বন্ধ।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, রাস্তাটি তৈরির সময় চারপাশের বিলের কথা একদম ভাবা হয়নি। প্রয়োজনের তুলনায় পথটি খুব নিচু ও সরু করে বানানো হয়েছিল। ফলে চালুর প্রথম বছরই বৃষ্টি আর বিলের পানির তোড়ে রাস্তার বিভিন্ন জায়গা ভাঙতে শুরু করে। বর্ষা এলে পথের বড় একটা অংশ পানির নিচে তলিয়ে যেত।

প্রথম কয়েক বছর কোনোমতে চলাচল করা গেলেও পরে কোনো মেরামত না করায় রাস্তাটি ধীরে ধীরে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়।

সম্প্রতি এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের কথার সত্যতা দেখা গেছে। রাস্তার বড় বড় জায়গা ভেঙে গিয়ে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। গজিয়ে উঠেছে ঘন ঘাস ও আগাছা। দুপাশের ঝোপঝাড় এসে পথটিকে এমনভাবে ঢেকে ফেলেছে যে দেখে বোঝার উপায় নেই এটি একটি সড়ক। এখন এই পথে হাঁটাও অসম্ভব।

আরও পড়ুন

বারশিলা গ্রামের বাসিন্দা হযরত আলী আফসোস করে বলেন, ‘চারপাশের পুরো বিলটা দেখুন, চারদিকে শুধু জমি আর জমি। রাস্তার এতই করুণ অবস্থা যে জমি থেকে পাট আর পাটকাঠি বাড়ি আনব, তার উপায় নেই। কত কষ্ট যে হয় বলে বোঝানো যাবে না। এত টাকা ঢেলে রাস্তা বানানো হলো, অথচ বানানোর পর আর কেউ একটা খোঁজও নিল না।’

রাস্তার পাশে বিলে ধর্মজাল দিয়ে মাছ ধরছিলেন মিলন নামের এক ব্যক্তি। তিনি জানান, জায়গাটির নাম কাজলকুড়ো বিল। তার কথায়, ‘এটাকে এখন আর রাস্তা বলা চলে না, মনে হয় একটা জঙ্গল। সাপ আর সব পোকামাকড়ের বাসা হয়েছে এখানে।’

স্থানীয় ভ্যানচালক হাশেম আলী বলেন, ‘পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে আধা কিলোমিটার পথও চলার মতো নেই। এরপরে আর রাস্তা আছে বলে মনেই হয় না। কয়েকদিন আগে দূর থেকে আসা কয়েকজন ভ্যানচালক রাস্তার খবর না জেনে এই পথে ঢুকেছিলেন। একটু দূরে গিয়ে আর পথ না পেয়ে তাদের ঘুরে চলে যেতে হয়েছে। অথচ একসময় এই পথেই আমরা নিয়মিত ভ্যান চালিয়েছি।’

রামিস উদ্দিন নামের আরেকজন বলেন, এই রাস্তাটি হওয়ায় কৃষকেরা জমি থেকে সোজা হাটে গিয়ে ফসল বিক্রি করতে পারতেন। এখন মানুষের হেঁটে যাওয়ার পথটুকুও নেই। রাস্তার সাথে একটা ব্রিজও বানানো হয়েছিল, কিন্তু সেটাও রাস্তার চেয়ে নিচু।

এলাকার অন্যদের মতোই তিনি রাস্তাটি দ্রুত মেরামত করে চলাচলের উপযোগী করার দাবি জানান।

খাকছড়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মানিক হোসেন জানান, রাস্তাটি হওয়ার পর পাশের গ্রামগুলো থেকে প্রচুর ছেলেমেয়ে তাদের স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। এখন রাস্তার এই অবস্থার কারণে অনেক শিক্ষার্থী আর স্কুলে আসতে পারে না।

এলাকাবাসী ও এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, মানুষের দাবির মুখে ২০২২ সালে প্রায় ১০ কোটি টাকা খরচে রাস্তাটি নতুন করে তৈরির একটি পরিকল্পনা করে এলজিইডি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এলাকা ঘুরেও যান। তবে শেষ পর্যন্ত টাকার বরাদ্দ না মেলায় প্রকল্পটি আর পাস হয়নি। এরপর থেকে সড়কটি ঠিক করার জন্য আর বড় কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

এ বিষয়ে পাবনা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইসলাম জানান, তিনি নিজে রাস্তাটি দেখে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘পাবনা উন্নয়ন’ নামের একটি প্রকল্পের আওতায় এই রাস্তা সংস্কারের কথা রয়েছে। টাকা বরাদ্দ পেলেই নতুন করে কাজ শুরু করা হবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad