সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের জীবন বরাবরই নানা অনিশ্চয়তা ও শঙ্কায় ঘেরা। কখনো সীমান্ত হত্যা, কখনো কৃষকদের ওপর ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হয়রানি আবার কখনো অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ। এসব ঘটনা সীমান্তবাসীর দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি ‘পুশইন’ ইস্যুকে কেন্দ্র করে নওগাঁর বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় নতুন করে উদ্বেগ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। এতে সীমান্তঘেঁষা জনপদের মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। এমন পরিস্থিেিত সীমান্তজুড়ে চলমান এই পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে সীমান্তে স্থিতিশীলতা ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। কারণ সীমান্তের মানুষের কাছে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ জীবনই সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমান্তে নজরদারি ও টহল কার্যক্রম জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে সীমান্ত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাহিনীটি।
নওগাঁ জেলার সঙ্গে ভারতের মোট ৯টি সীমান্ত এলাকা সংযুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে সাপাহার উপজেলার হাঁপানিয়া ও করমুডাঙ্গা, পোরশা উপজেলার নিতপুর এবং ধামইরহাট উপজেলার কালুপাড়া, চকিলাম, চকচণ্ডি, বস্তাবর, শিমুলতলী ও তালান্দার সীমান্ত উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘদিন ধরে এসব এলাকার বাসিন্দারা সীমান্তসংক্রান্ত নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়ে আসছেন।

স্থানীয়দের দাবি, বিশেষ করে সাপাহারের হাঁপানিয়া ও করমুডাঙ্গা এবং পোরশার নিতপুর সীমান্তে বিএসএফের হয়রানি, কৃষকদের ধাওয়া দেওয়া কিংবা সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনা তুলনামূলক বেশি ঘটে থাকে।
সম্প্রতি গত ৫ জুন করমুডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে ১৭ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে বিজিবির কঠোর নজরদারি ও দ্রুত পদক্ষেপের কারণে ওই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং বিএসএফকে তাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হতে হয়। এই ঘটনার পর থেকেই সীমান্তজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সীমান্তবর্তী অধিকাংশ পরিবারের জীবিকা কৃষিকাজ ও গবাদিপশু পালনের ওপর নির্ভরশীল। বছরের পর বছর ধরে চাষাবাদ করে তারা সংসার চালিয়ে আসছেন। কিন্তু কৃষিকাজ করতে গিয়ে প্রায়ই নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
হাঁপানিয়া গ্রামের বাসিন্দা রেজাইল ইসলাম বলেন, আমাদের প্রধান জীবিকা কৃষিকাজ। জমিতে কাজ করতে গেলেই অনেক সময় বিএসএফ সদস্যরা ধাওয়া দেয় বা ভয়ভীতি দেখায়। তবুও পরিবারের জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়েই মাঠে যেতে হয়।
একই এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, অতীতেও সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। আমার চাচাসহ তিনজন নিজেদের জমিতে গম কাটার সময় বিএসএফের হাতে নিহত হন। এখনও অনেক সময় গরু চরাতে বা ঘাস কাটতে গেলে মানুষ হয়রানির শিকার হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস ছাত্তারের মতে, সাম্প্রতিক পুশইন ইস্যু সীমান্ত এলাকার মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, “অবৈধভাবে মানুষ পাঠানোর চেষ্টা নিয়ে নানা গুঞ্জন রয়েছে। বিজিবি সতর্ক অবস্থানে থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা কাজ করছে। সীমান্ত রক্ষায় আমরা স্থানীয়রাও সহযোগিতা করছি।

অন্যদিকে পোরশা উপজেলার বাসিন্দা ফারুক হোসেন জানান, কয়েকদিন ধরে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। তিনি বলেন, রাতের বেলায় সীমান্ত এলাকায় কিছু মানুষকে অবস্থান করতে দেখে স্থানীয়রা সতর্ক হয়ে ওঠেন। পরে কয়েকশ মানুষ লাঠি ও টর্চলাইট নিয়ে সীমান্ত এলাকায় পাহারা দেন, যাতে কোনো ধরনের অনুপ্রবেশের ঘটনা না ঘটে।
আইনজীবী অ্যাডভোকেট মহসিন রেজা বলেন, যেকোনো দেশে অবৈধভাবে অবস্থানকারী ব্যক্তি থাকতে পারেন। তবে আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কাউকে জোরপূর্বক অন্য দেশে পাঠানোর চেষ্টা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং তা গ্রহণযোগ্য নয়।
নওগাঁ-১৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে বিজিবি। সার্বক্ষণিক নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত টহল কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও জনগণের সঙ্গে সমন্বয় রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। মানবপাচার, অবৈধ অনুপ্রবেশ কিংবা পুশইনের যেকোনো অপচেষ্টা প্রতিহত করতে বিজিবি দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে।


