ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার কাপাসহাটিয়া বাওড়ের ধারেই অবস্থান শতবর্ষী এক বটগাছের। ব্যক্তি মালিকানার জমিতে শতবছর পার করা এই গাছটি কেটে স্থানীয় কয়েক যুবক তৈরি করেছেন ‘ট্রি ক্যাফে হাউস’। পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, শতবর্ষী গাছের ডাল কাটা বেআইনি।
জানা গেছে, উপজেলার ঘোড়দহ গ্রামে কাপাসহাটিয়া বাওড়ের ধারে একশত বছরের বেশি সময় ধরে গাছটি বেড়ে উঠেছে। বাওড়ের ধারে হওয়ায় শতবছর ধরে গাছটির ডালে ডালে শতশত পাখি ও বন্যপ্রাণি বসবাস করতো। গাছটি ঘিরে প্রায় ২০ শতক জমি ছিল বনজ গাছ-লতাপাতায় ঘেরা।
ছায়া, পাখি ও বন্যপ্রাণিদের আবাসস্থল হিসেবে জন্ম থেকেই এলাকার পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ এই গাছ। গাছের ডাল কেটে ক্যাফে করার ফলে মানুষের বিচরণ বাড়ায় পাখিদের অধিকার হারিয়েছে গাছ থেকে। এখনো ডালে ডালে ঝুলছে শালিক ও অন্যান্য পাখিদের পরিত্যক্ত বাসা।
এই গাছের নামে পাশেই শতবর্ষী একটি বাজার রয়েছে যার নাম ‘চারাতলা বাজার’। এক সময় এই গাছের গোড়ায় বসত চৈত্র মেলা, হতো চৈত্র সংক্রান্তি পূজা।
সম্প্রতি ঘোড়দহ গ্রামের আব্দুল মালেকের ছেলে আবির হাসান গাছটির গোড়া ও ডাল পরিষ্কার করে গাছের ডালে মাচা বানিয়ে একটি ক্যাফে তৈরি করেছেন।
আগে যেখানে গাছের ডালে ডালে পাখিরা বসে থাকতো এখন গাছের ডালে জায়গা হয়েছে উৎসুক মানুষের। গত ২০ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই ক্যাফেতে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষের ভিড় থাকে।

গাছের নিচেই রান্নাঘর ও সন্ধ্যার পরে রঙিন আলো মানুষকে আকর্ষণ করলেও বন্যপাখি ও প্রাণিদের জন্য বিরূপ পরিবেশ তৈরি করেছে। আগন্তুক শত শত মানুষের রেখে যাওয়া বর্জ্যও ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঘোড়দহ গ্রামের সত্তরোর্ধ ইউনুস আলী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকে এই বটগাছ এমনই দেখছি। ছোট বেলায় দেখেছি এখানে চৈত্র পূজা ও মেলা হতো। পরে এখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।’
দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় এই গাছের গোড়ায় ঘন জঙ্গল তৈরি হয়েছিল। গাছের ডালে ডালে সারাদিন পাখির কিচিরমিচির শব্দ শোনা যেত। গন্ধগোকুল, বাদুড়সহ বিভিন্ন পাখি গাছে বাসা বেঁধে থাকতো। এখানো গাছের ডালে পাখির বাসা দেখা যায়।
তিনি বলেন, ‘আবদার আলী নামে এক ব্যক্তি ছিলেন আমাদের গ্রামে। তিনি মারা গেছেন অনেক বছর হলো। উত্তরাধিকার সূত্রে এই জমিটি তিনি পেয়েছিলেন। এখন মালিক তার ছেলেরা। তবে তার একজন ছেলে গ্রামে থাকেন বাকিরা অনেক দিন ধরেই ঝিনাইদহ শহরসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করেন।’
রবিবার বিকালে গাছটিতে চালু হওয়া ক্যাফেতে যেয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন এলাকা থেকে বন্ধু বান্ধব নিয়ে ঘুরতে এসেছেন অনেকেই। কেউ গাছের ডালে তৈরিকৃত মাচায় বসে চা-কফি কিংবা বিভিন্ন খাবার খাচ্ছেন। কেউবা গাছের নিচে তৈরি করা টং ঘরে বসে আড্ডা দিচ্ছেন।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, গাছের কয়েকটি ডাল কেটে মাটি থেকে প্রায় ১৫ ফুট ওপরে লোহা ও কাঠের পাটাতনে মাচা তৈরি করা হয়েছে। মানুষের উপস্থিতিতে বন্যপাখি ও প্রাণিরা ছেড়ে গেছে এই এলাকা।
ঘুরতে আসা ঝিনাইদহ সরকারি কেশব চন্দ্র কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র রমজান আলী জানান, ফেসবুকে ভিডিও দেখে বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে এসেছেন। গাছের ডালে মাচা তৈরি করায় প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর প্রভাব নিয়ে কোনো উপলব্ধি হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখানে গাছের ডালে ডালে পাখির বাসা দেখছি কিন্তু পাখি দেখছি না। হয়তো মানুষের আনাগোনায় তারা দূরে চলে গেছে।’
গাছটি ঘিরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তৈরি করা আবির হাসান বলেন, ‘ট্রি হাউসের ধারণা থেকেই এখানে জঙ্গল পরিষ্কার করে গাছের ডালে মাচা তৈরি করেছি। এতে পরিবেশের কোন সমস্যা হবে বলে আমার মনে হয় না।’
ঝিনাইদহ পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মুন্তাছির রহমান জানান, শতবর্ষী একটি গাছের ডাল কাটা বেআইনি। গাছের ডালে মাচা করায় গাছটিতে বন্য পাখির আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গাছের স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি হবে না। প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বনবিভাগের আইন অনুযায়ী এর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলব।’
ঝিনাইদহ বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, ‘এই গাছের বিষয়ে আমরা উপজেলা প্রশাসনকে জানাবো। আইনের ব্যত্যয় হলে ব্যবস্থা নেব।’


