চলতি ফুটবল বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার কাছে ৩-২ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে মিসর। তবে মাঠের ফুটবল ছাপিয়ে এখনো উত্তাপ ছড়াচ্ছে রেফারিং ও ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভিএআর) দুটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত।
মিসরীয় শিবিরের স্পষ্ট অভিযোগ, ৬২ মিনিটে মোস্তফা জিকোর করা গোলটি অন্যায্যভাবে বাতিল করা হয়েছে, অথচ যোগ করা সময়ে আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজের জয়সূচক গোলের আগে ফাউল হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। ম্যাচ শেষে রেফারিকে ‘জালিম’ আখ্যা দিয়েছেন খোদ গোলদাতা জিকো।
আদতে মাঠের সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তে নিয়ম কী বলছিল? দুই ফাউলের ক্ষেত্রে কেন দুই রকম সিদ্ধান্ত এল? এই জটিল সমীকরণের জট খুলতে ম্যাচটির বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করেছে বিশ্বখ্যাত ক্রীড়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইএসপিএন। ইংলিশ ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে এক যুগেরও বেশি সময় রেফারিং ও ভিএআর হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সাবেক সিলেক্ট গ্রুপ রেফারি অ্যান্ডি ডেভিস দিয়েছেন এর ব্যাখ্যা। সেই বিশ্লেষণের অনুবাদ তুলে ধরা হলো।
মিসরের গোলটি কেন বাতিল করা হলো?
কী হয়েছিল
ম্যাচের ৬২তম মিনিটে মিসরের ফরোয়ার্ড মোস্তফা জিকো যখন বল জালে জড়ান, তখন মনে হচ্ছিল এটি বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোল। মিসর ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে উল্লাসে মাতে। কিন্তু ভিএআরের হস্তক্ষেপে ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে অন-ফিল্ড মনিটর পরীক্ষা করে গোলটি বাতিল করেন। কারণ, আক্রমণ গড়ে ওঠার শুরুতে মিসরের ডিফেন্ডার মারওয়ান আতিয়া আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেসকে ফাউল করেছিলেন।
ভিএআর পর্যালোচনা ও ডেভিসের রায়
ভিএআর পুঙ্খানুপুঙ্খ দেখে নিশ্চিত হয়, আত্তিয়া একই সময়ে মার্তিনেসের জার্সি ধরে টেনেছিলেন এবং তার পায়ের ওপর পা রেখেছিলেন। অ্যান্ডি ডেভিসের মতে, গোল বাতিলের এই সিদ্ধান্তটি শতভাগ সঠিক ছিল।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘আতিয়ার স্পষ্ট ফাউলের কারণে আর্জেন্টিনা আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ হারায় এবং সেই ফাউলের সরাসরি ফল হিসেবে মিসর কাউন্টার-অ্যাটাক থেকে গোলটি করেছিল। ঘটনাটি মিসরের অর্ধে বক্সের বেশ বাইরে ঘটলেও একই আক্রমণপর্বের শুরুতে ফাউল হলে নিয়ম অনুযায়ী গোল বাতিল করাই সঠিক সিদ্ধান্ত।’
আর্জেন্টিকার জয়সূচক গোলের আগে কেন ফাউল ধরা হয়নি?
কী হয়েছিল
ম্যাচের শেষ দিকে পেনাল্টি বক্সের ভেতর দুটি আলাদা ঘটনায় ফাউল ও পেনাল্টির আবেদন জানায় মিসর। প্রথমত, যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের জয়সূচক গোলের ঠিক আগে আর্জেন্টিনার আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টার মিসরের হামদি ফাতির জার্সি টেনে ধরেন এবং ফাতি মাটিতে পড়ে যান।
দ্বিতীয়ত, একদম শেষ মুহূর্তে মোহাম্মদ সালাহ দাবি করেন, পেনাল্টি এলাকায় ঢোকার সময় হুলিয়ান আলভারেস তাকে ফাউল করেছেন। কিন্তু রেফারি কোনোটিতে সাড়া দেননি এবং ভিএআরও মাঠের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
ভিএআর পর্যালোচনা ও ডেভিসের রায়
ভিএআরের জন্য এই অংশটি ছিল এক অদ্ভুত ‘দ্বিমুখী পরিস্থিতি’। কারণ রেফারি সিদ্ধান্ত পাল্টালে একদিকে আর্জেন্টিনার গোল বাতিল হতো, অন্যদিকে মাঠের অপর প্রান্তে মিসর পেনাল্টি পেয়ে যেত। তবে দুটি ক্ষেত্রে রেফারি ও ভিএআর সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে রায় দিয়েছেন ডেভিস।
ম্যাক আলিস্টারের ঘটনা নিয়ে ডেভিস বলেন, ‘ম্যাক আলিস্টার ফাতির জার্সি ধরে কিছুটা ঝুঁকি অবশ্যই নিয়েছিলেন। কিন্তু সেটি ছিল খুবই অল্প সময়ের জন্য। এতে ফাতির বল পাওয়ার সম্ভাবনা বা আক্রমণে অংশ নেওয়ার ওপর উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব পড়েনি। তাই এটিকে পেনাল্টি দেওয়ার মতো ফাউল বলা যায় না।’
সালাহর পেনাল্টির দাবি নাকচ করে তিনি যোগ করেন, ‘আলভারেসের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট ফাউল ছিল না। দুজনের বুট একে অপরের সঙ্গে লেগেছিল এবং দুজনের গতির কারণে সেই স্বাভাবিক সংস্পর্শ তৈরি হয়। সালাহ এখানে ফাউলের চেয়ে পেনাল্টি আদায়ের চেষ্টা বেশি করেছেন এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে মাটিতে পড়ে গেছেন।’
দুই ফাউলে ভিন্ন সিদ্ধান্ত কেন
অনেকে শেষের ঘটনাটির সঙ্গে মিসরের বাতিল হওয়া গোলের আগে আত্তিয়ার ফাউলের তুলনা করতে পারেন। তবে দুটি ঘটনার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে।
প্রথম ঘটনায় একজন ডিফেন্ডার স্পষ্টভাবে প্রতিপক্ষের পায়ের ওপর পা রেখেছিলেন। কিন্তু সালাহর ঘটনায় দুজনের বুটের মধ্যে স্বাভাবিক সংস্পর্শ হয়েছিল, যা দুই খেলোয়াড়ের গতির ফল। তাই দুটি ঘটনা এক নয়।


