টাইমস অব বাংলাদেশ দীর্ঘ অনুসন্ধানী ধারাবাহিক প্রতিবেদন শুরু করেছে। ব্যবসায়ী মো. শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি ভুতুড়ে জাহাজ কেনার আড়ালে অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে বিপুল অর্থ পাচার ও কর ফাঁকি দিয়েছেন। এ বিষয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের তৃতীয় পর্ব প্রকাশিত হলো বৃহস্পতিবার।
ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী মো. শওকত আলী চৌধুরী গড়ে তুলেছেন শেল কোম্পানির এক গোপন সাম্রাজ্য। সেগুলোর মাধ্যমে তিনি বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি ডলার পাচার করেছেন।
চট্টগ্রামের জাহাজভাঙা শিল্পের কয়েকজন ব্যবসায়ীও যুক্ত হয়েছেন তার এই অফশোর নেটওয়ার্কে, যা গড়ে তোলা হয়েছে গ্রেট ব্রিটেন অধিকৃত এই সামুদ্রিক অঞ্চলে।
টাইমস অব বাংলাদেশের দীর্ঘ অনুসন্ধানে জাহাজ ভাঙা শিল্পের শীর্ষ ব্যবসায়ী মো. শওকত আলী চৌধুরীর এই অন্ধকার জগত উন্মোচিত হয়েছে। ক্যারিবিয়ান সাগরের এই দ্বীপপুঞ্জটি অর্থ পাচারের স্বর্গ হিসেবে বৈশ্বিক সংস্থাগুলোতে তালিকাভুক্ত।
ব্রিটিশ অঞ্চলটিতে নিবন্ধিত তিনটি শেল কোম্পানির গত ১৭ বছরের নথি ঘেটে দেখা গেছে, এগুলোর মাধ্যমে কেবল চট্টগ্রামের সাতজন ব্যবসায়ী লেনদেন করেছেন। আর সবগুলো লেনদেন কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত ছিল শওকতের মালিকানাধীন এস এন করপোরেশনের সঙ্গে।
শওকতের অর্থ পাচারের নেটওয়ার্ক খুঁজতে টাইমসের এই অনুসন্ধান শুরু হয় বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার (বিএফআইইউ) এক অসমাপ্ত গোয়েন্দা প্রতিবেদনের খসড়া থেকে। অনুসন্ধানকারী টিমকে সরিয়ে দেওয়ার কারণে মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায় ওই তদন্ত।
বিএফআইইউ’র খসড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের মাধ্যমে শওকত আলী চৌধুরী ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডের তিনটি কোম্পানি থেকে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করেছেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা প্রতিবেদনে লিখেছিলেন, ‘বেনিফিসিয়ারি প্রতিষ্ঠান তিনটি মূলত স্বার্থসংশ্লিষ্ট এবং অবস্থাদৃষ্টে এদেরকে শেল কোম্পানি মর্মে প্রতীয়মান হয়।’ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই এলসিগুলো (ঋণপত্র) খোলার সময় ব্যাংকটি অর্থ পাচার প্রতিরোধে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করেনি।
এই সূত্র ধরে অনুসন্ধানে টাইমস জানতে পারে, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে শওকতের নেতৃত্বে গঠিত অর্থ পাচার চক্রটি অন্তত ২০০৮ সাল থেকে সক্রিয়। সেখানে একের পর এক শেল কোম্পানি নিবন্ধন করে এগুলোর মাধ্যমে ঘুরেফিরে লেনদেন করেছে বাংলাদেশের সাত ব্যবসায়ীর নয়টি প্রতিষ্ঠান।
শওকতের সিন্ডিকেটের তিনটি মূল শেল কোম্পানি হলো–রেড রুবি গ্রুপ লিমিটেড, ট্যালেন্ট মাইল লিমিটেড এবং কলম্বিয়া সিস লিমিটেড। এগুলো ভার্জিন আইল্যান্ডের অফশোর সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ভিস্ত্রা (বিভিআই) লিমিটেডের মাধ্যমে নিবন্ধিত। ব্রিটেনের সরকারি সূত্রে জানা গেছে, মানিলন্ডারিং আইন লঙ্ঘনের দায়ে ২০২৪ সালের অক্টোবরে ভিস্ত্রা লিমিটেডকে ২ দশমিক ৭৭ লাখ ডলার জরিমানা করা হয়েছে।
শেল কোম্পানি বলতে বোঝায় এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা কাগজে-কলমে বা আইনি নথিতে বিদ্যমান থাকলেও বাস্তবে কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রম বা সম্পদ নেই। এর মূল উদ্দেশ্য অর্থ পাচার, কর ফাঁকি বা সম্পদ গোপন রাখা। অন্যদিকে, অফশোর কোম্পানি সাধারণত এমন দেশগুলোতে নিবন্ধিত হয় যেখানে করের হার কম এবং গোপনীয়তা বেশি, যাতে অন্য দেশের ব্যক্তি বা কোম্পানিগুলো এসব প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে সম্পদ স্থানান্তর বা পাচার করতে পারে।
আন্তর্জাতিক নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শওকতের এই তিনটি শেল কোম্পানির সঙ্গে নিয়মিত আমদানি-রপ্তানি করেছে তার মালিকানাধীন এস এন করপোরেশন, মো. সিরাজউদ্দৌলার মালিকানাধীন সাগরিকা শিপ ব্রেকিং ইন্ডাস্ট্রি, মুহাম্মদ শামসুল আলমের বারাকা শিপ ব্রেকিং, তাসলিম উদ্দিনের কে আর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড ও এন বি স্টিল, মোহাম্মদ আলীর তাইহুয়া স্টিল এন্টারপ্রাইজ, এস এম নুরুন্নবির মাহিনুর শিপরিসাইক্লিং লিমিটেড ও বব রিসাইক্লার্স এবং মো. নেজাম উদ্দিনের মালিকানাধীন সি-শোর ইন্টারন্যাশনাল। এদিকে সিরাজউদ্দৌলা আবার বারাকা শিপ ব্রেকিংয়ের অংশীদার।
চট্টগ্রামের তিনটি স্বাধীন সূত্র টাইমসকে নিশ্চিত করেছে, এই সব কোম্পানির মালিকদের সঙ্গে শওকতের ঘনিষ্ঠ আর্থিক সম্পর্ক রয়েছে এবং তাদের অনেককেই তিনি নগদ টাকা ধার দিয়েছেন। তবে কেউই নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশে রাজি হননি।
আন্তর্জাতিক ওয়াচডগ সংস্থা ক্রেডেন্সের নথি অনুযায়ী, রেড রুবি গ্রুপের নিবন্ধিত চারটি কোম্পানিই ২০১৫ সালে বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু ঠিক সেই বছরেই শওকতের এস এন করপোরেশন রেড রুবি গ্রুপের মাধ্যমে একটি বৃহদাকার স্ক্র্যাপ ভেসেল আমদানি করে, যা বাজারমূল্যের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি দামে কেনা হয়।
ফরাসি গবেষণা সংস্থা রবিন দে বোয়ার শিপ ব্রেকিং বুলেটিনে উল্লেখ আছে, হংকং পতাকাবাহী ওই জাহাজটি প্রতি টন ৪২৫ ডলারে কেনে এস এন করপোরেশন। কিন্তু ইন্টারমডালের সাপ্তাহিক বাজার প্রতিবেদনে তখনকার বাজারদর দেখানো হয়েছিল প্রতি টন ২৩০ থেকে ৪০৫ ডলার।
হিসাব অনুযায়ী, এই এক জাহাজেই বাজারমূল্যের তুলনায় প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার ডলারের বেশি পরিশোধ করে এস এন করপোরেশন। ১৯৮৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৮৫টি জাহাজ আমদানি করেছে দেশের শীর্ষ এই জাহাজ ভাঙা প্রতিষ্ঠানটি।

রেড রুবি বন্ধ হওয়ার পর একই ঠিকানায় ভিস্ত্রা লিমিটেডের মাধ্যমে গঠন করা হয় ট্যালেন্ট মাইল লিমিটেড নামের আরেক শেল কোম্পানি। এই প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমেই সর্বশেষ ২০২০ সালে একটি জাহাজ আমদানির জন্য স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে এলসি খোলে এস এন করপোরেশন। কিন্তু সরকারি কিংবা আন্তর্জাতিক কোনো নথিতে এই জাহাজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। ক্রেডেন্স ও ট্রাস্টেটডকসের নথি বলছে, অর্থ পরিশোধের পর ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ট্যালেন্ট মাইল বন্ধ করে দেওয়া হয়।
যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন না করে এলসি খোলার কারণ জানতে স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাসের এজাজ বিজয়কে একাধিকবার ফোন ও বার্তা পাঠানো হলেও এই সংবাদ লেখা পর্যন্ত উত্তর দেননি। তথ্য-প্রমাণ বলছে, ট্যালেন্ট মাইলের লেনদেনগুলোর প্রকৃতি ছিল সন্দেহজনক।
বৈশ্বিক সংস্থা ক্রেডেন্স ও ভলজার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ট্যালেন্ট মাইল বাংলাদেশের শুধু চারটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৫৩টি শিপমেন্ট করে। এই কোম্পানিগুলো হলো চট্টগ্রামভিত্তিক এস এন করপোরেশন, এন বি স্টিল, এস এইচ এন্টারপ্রাইজেস ও সিশোর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড।
এদিকে, বিএফআইইউর অসমাপ্ত তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ট্যালেন্ট মাইলের ইমেইল ঠিকানাও রেড রুবি গ্রুপের সঙ্গে অভিন্ন, যা তাদের পারস্পরিক স্বার্থ যুক্ত তা-ই প্রমাণ করে।
টাইমসের অনুসন্ধানেও দেখা গেছে, রেড রুবি ও ট্যালেন্ট মাইলের সব ফাইল ইনপুট দেওয়া হয়েছিল সিঙ্গাপুরের ডোমেইন ব্যবহার করে। এটা আন্তর্জাতিক অর্থ পাচার চেইনে সিঙ্গাপুরকে মধ্যবর্তী কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার ইঙ্গিত দেয়। ইতোমধ্যে সিঙ্গাপুরে শওকতের অবৈধ সম্পদের খোঁজ পেয়েছে এই সংবাদ মাধ্যমটি।

রেড রুবির জায়গায় ট্যালেন্ট মাইল গঠন করা হয়েছিল এবং এই দুটিই কলম্বিয়া সিসের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আবার এই তিনটি কোম্পানিই বিভিআই’র মাধ্যমে নিবন্ধিত ছিল। এগুলো মূলত এস এন করপোরেশনের লেনদেন পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়েছে বলে বিভিন্ন নথিতে উঠে এসেছে। দেখা গেছে, ট্যালেন্ট মাইল বন্ধ করে দেওয়ার পর কলম্বিয়া সিস লিমিটেডের মাধ্যমে অর্থ পাচারের কার্যক্রম চালু রাখে শওকতের এই সিন্ডিকেট।
ক্রেডেন্স ও ভলজার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে কলম্বিয়া সিস আমদানি-রপ্তানির সব লেনদেন করেছে মূলত বাংলাদেশের এই সিন্ডিকেটভুক্ত কোম্পানিগুলোর সঙ্গে। একই ব্যক্তিদের মালিকানাধীন শিপ ব্রেকিং কোম্পানিগুলোই কখনো কলম্বিয়া সিসে পণ্য রপ্তানি করেছে, আবার কখনো সেখান থেকে আমদানি করেছে।
একজন শীর্ষ আর্থিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা টাইমসকে বলেছেন, এই লেনদেনগুলো একেবারেই কৃত্রিম বলে মনে হচ্ছে। একে অপরের কোম্পানির মাধ্যমে লেনদেন দেখিয়ে প্রকৃতপক্ষে অর্থ পাচার করা হয়েছে।
নথি অনুযায়ী, কলম্বিয়া সিস গত ১৭ বছরে মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান–-এস এন করপোরেশন, সাগরিকা শিপ ব্রেকিং ইন্ডাস্ট্রি ও বারাকা শিপ ব্রেকিং–থেকে পণ্য আমদানি করেছে। একই সময়ে তারা রপ্তানি করেছে চট্টগ্রামের পাঁচ প্রতিষ্ঠানের-–কে আর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড, বব রিসাইক্লার্স, এন বি স্টিল, মাহিনুর শিপরিসাইক্লিং লিমিটেড এবং তাইহুয়া স্টিল এন্টারপ্রাইজ–কাছে।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, এস এন করপোরেশন রেড রুবি ও ট্যালেন্ট মাইল থেকে সবসময় স্ক্র্যাপ ভেসেল আমদানি করেছে, কিন্তু কলম্বিয়া সিসের কাছ থেকে কখনো জাহাজ আমদানি করেনি। উল্টো রপ্তানি করেছে। একই সময়ে কলম্বিয়া সিসের কাছ থেকে সিন্ডিকেটের অন্য ৫টি প্রতিষ্ঠান জাহাজ আমদানি করেছে। এতে স্পষ্ট, এই সিন্ডিকেটের প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মধ্যেই আমদানি-রপ্তানি দেখিয়ে অর্থ পাচার করেছে।
আর্থিক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা টাইমসকে জানিয়েছেন, এসব লেনদেনের উদ্দেশ্য ব্যবসা নয়, বরং অর্থ পাচারের সূত্র গোপন রাখা।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, শওকতের সিন্ডিকেটভুক্ত অন্যতম কোম্পানি তাইহুয়া স্টিল এন্টারপ্রাইজ ২০২২ সালের ১৩ জুন যুক্তরাজ্যের লন্ডনে একটি ব্যবসায়িক কার্যালয় খুলেছে। এটি শওকতের অফশোর নেটওয়ার্কের পরিধি বাড়ানোর আরেকটি ধাপ হিসেবে মনে করছেন আর্থিক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
বিএফআইইউ কর্মকর্তাদের ধারণা, বহুস্তরে গড়ে ওঠা এই অফশোর নেটওয়ার্ক এখন বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ অর্থ পাচার চক্রের রূপ নিয়েছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বৈশ্বিক সংস্থা ওসিসিআরপি ও আইসিআইজে’র অনুসন্ধানেও একই ধরনের বহুস্তরীয় শিপিংভিত্তিক অর্থ পাচারের ঘটনা উঠে এসেছে।
শওকত আলী চৌধুরীর বক্তব্য জানার জন্য গত ১৫ অক্টোবর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত তার সঙ্গে টেলিফোন ও ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে টাইমস। কিন্তু কোনো সাড়া দেননি তিনি।


