ব্যারাকে যাও, গণতন্ত্রে এসো

জসীম আহমেদ
4 Min Read
নুরুল হক নুরের ওপর হামলার প্রতিবাদে চট্টগ্রাম নগরীতে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ। ছবি: টাইমস

গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মী, বিশেষ করে এর সভাপতি নুরুল হক নুরের উপর হামলার পর রাজধানী থেকে জেলা শহরে বিভিন্ন প্রতিবাদ মিছিলে শোনা যাচ্ছে একটি স্লোগান, ‘নো মোর মিলিটারি, ব্যারাকে ফের তাড়াতাড়ি।’

এই কলরব কেবল রাজপথে নয়, ধ্বনিত হচ্ছে সুশীল সমাজের মধ‍্যেও। শিক্ষক, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী—অধিকাংশই এখন মনে করছেন, সেনাবাহিনীর ভূমিকা দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যেই সীমিত থাকা উচিত; জনজীবনের প্রতিদিনের রাজনীতিতে নয়।

সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানও একাধিকবার বলেছেন, তার সৈনিকদের স্থায়ী ঠিকানা ব্যারাক, রাজপথ নয়। তিনি বারবার উচ্চারণ করেছেন, ‘দেশে গণতন্ত্রের উত্তরণ ঘটালে সেনাবাহিনী স্বস্তির সাথে ব্যারাকে ফিরবে।’

কিন্তু বাস্তবতার চাপে এই প্রত‍্যাশা যেন দীর্ঘ হওয়ার পথে।

দেশজুড়ে এখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যত নিষ্ক্রিয়। পুলিশের হাতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার মতো সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া যায়নি। এই শূন্যতার সুযোগে সমাজে জেঁকে বসেছে ‘মবোক্রেসি’, যেখানে জনতার দঙ্গলবাহিনী আইন নিজেরাই তুলে নিচ্ছে হাতে।

কোথাও বিক্ষোভকারীরাই বিচার করছে, কোথাও দলীয় শক্তি নির্ধারণ করছে অপরাধের শাস্তি। দৃশ্যত, রাষ্ট্র ক্রমেই ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে জনবিচ্ছিন্ন ও ভঙ্গুর।

এই পরিস্থিতিতে রাজপথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে সেনাবাহিনীকে। তারা দুর্বৃত্ত দমনে চেকপোস্ট বসাচ্ছে, হট্টগোল ছত্রভঙ্গ করছে, এমনকি বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ভূমিকা নিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।

কিন্তু সকলেরই হয়তো জানা আছে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় নিয়োজিত সেনা সদস্যরা যত বেশিদিন জনগণের সাথে সরাসরি মিশে থাকেন, ততই তাদের সম্মানহানি ও নিরপেক্ষতার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইতিহাসও সাক্ষী—বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক শক্তির দীর্ঘ উপস্থিতি কেবল অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতিই ডেকে এনেছে।

আবার মাঠ পর্যায়ে দীর্ঘ সময় ধরে থেকে জনসাধারণের সাথে সরাসরি সংঘর্ষে জড়ালে যে ‘বদনাম’ হয়, তা এই বাহিনীর জন্য স্থায়ী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেনা সদস্যরা জানেন, তাদের আসল কাজ দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সীমান্ত রক্ষা, জাতীয় দুর্যোগে সহায়তা, কিংবা বিদেশি শান্তিরক্ষা মিশনে অবদান রাখা।

রাজপথের ভিড় সামলানো তাদের পেশাগত গৌরব নয়।

এ কারণেই সেনাপ্রধানের বক্তব্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তিনি চাইছেন, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটুক, যাতে সেনারা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে পারেন পুলিশ বাহিনীর হাতে এবং ফিরে যেতে পারে নিজেদের ঘাঁটিতে।

দেশবাসী দেখছে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুত রাজনৈতিক স্থিতি অনেকটাই অপূর্ণ। একদিকে প্রশাসন অচল, অন্যদিকে রাজনৈতিক ময়দান উত্তপ্ত। স্লোগান, মিছিল, পাল্টা মিছিল—সবমিলিয়ে নাগরিক জীবনে ছড়িয়ে পড়েছে এক ধরনের চাপা আতঙ্ক।

অন্যদিকে, সরকারের কার্যকরি ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। পুলিশ এখনো নির্ভর করছে সামরিক বাহিনীর উপস্থিতির উপর। এর ফলে সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্ন জেগেছে—তাহলে এই সরকার টিকে আছে কোন শক্তিতে?

এই সঙ্কটের একমাত্র সমাধান হলো দ্রুত নির্বাচন। নির্বাচন মানে কেবল ভোট নয়, নির্বাচন মানে রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া, জনগণের রায়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার বৈধতা নিশ্চিত করা।

সামরিক বাহিনী নিজেরা জানে, জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া তাদের অবস্থান টেকসই হতে পারে না। তাই তারা নিজেরাই চায় রাজনৈতিক দলগুলো দায়িত্ব নিক। যত দ্রুত সম্ভব গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঘটুক, তত দ্রুত তারা ফিরে যাবে নিজেদের প্রকৃত আবাসে—ব্যারাকে।

তাই ‘নো মোর মিলিটারি, ব্যারাকে ফের তাড়াতাড়ি’— এটি এখন আর শুধু ‘স্লোগান’ নয়, এটি এখন নাগরিক আকাঙ্ক্ষা মাত্র। এটি সেই ইতিহাসের প্রতিধ্বনি, যখন এই দেশের মানুষ বারবার রক্ত দিয়ে প্রমাণ করেছেন, শাসন জনগণের হাতে ফিরিয়ে দিতে হয়।

এই স্লোগান কেবল নুরের উপর হামলার প্রতিবাদ নয়, বরং এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক দাবি—রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর নয়, জনগণের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা হোক।

বাংলাদেশ এখন এক অনিশ্চিত সীমানায় দাঁড়িয়ে। একদিকে ‘মবোক্রেসির’ আতঙ্ক, অন্যদিকে সামরিক বাহিনীতে রয়েছে অস্বস্তি। সবমিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সীমাবদ্ধতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

এই বাস্তবতায় একমাত্র মুক্তির পথ– গণতন্ত্র। দ্রুত নির্বাচন আয়োজন, রাজনৈতিক শক্তির হাতে দায়িত্ব হস্তান্তর এবং সেনাবাহিনীর সসম্মানে ব্যারাকে প্রত্যাবর্তন—এটাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

Share This Article
Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *