বাল্যবিবাহের শিকলে আটকা কন্যাশিশুর ভবিষ্যৎ

বাল্যবিবাহের শিকলে আটকা কন্যাশিশুর ভবিষ্যৎ
বাল্যবিবাহের প্রতীকী ছবি। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
Advertisement
Advertisement

এক সময় কন্যা সন্তানের জন্ম আনন্দ নয়, ছিল নীরব হতাশা। সমাজে মেয়ে সন্তানকে দেখা হতো এক ধরনের বোঝা হিসেবে। তবে গত দুই দশকে বাংলাদেশের দৃশ্যপটে এই দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সচেতনতার বিস্তারে কন্যাশিশুর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এখন বেশ ইতিবাচক।

তবুও বাস্তবতা ভিন্ন। বিশেষ করে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে উদ্বেগজনক অবস্থানে রয়েছে।

ইউনিসেফ ২০২৩-এর তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের সেই ১০টি দেশের মধ্যে অন্যতম, যেখানে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি। দেশে প্রায় ৪১ দশমিক ৬ মিলিয়ন কন্যাশিশু বাল্যবিবাহের শিকার, যার মধ্যে ২২ দশমিক ৩ মিলিয়ন মেয়ে ১৫ বছরের আগে বিবাহিত হয়েছে। বর্তমানে ১৮ বছরের আগে মেয়েদের বিয়ে হওয়ার হার ৫১ শতাংশ।

অল্প বয়সে বিয়ে ও মাতৃত্বের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কন্যাশিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, ‘বাল্যবিবাহ এখনও বড় প্রতিবন্ধক। স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের যথেষ্ট মনোযোগ নেই।’

ইউনিসেফ ২০২০ তথ্যানুযায়ী, অবিবাহিত মেয়েদের থেকে চার গুণ বেশি বিবাহিত মেয়েরা স্কুলে যায় না, আর বাল্যবিবাহের শিকার মেয়েদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৫ জন ১৮ বছরের আগে এবং ৮ জন ২০ বছরের আগে সন্তান জন্ম দিয়েছে। মানবাধিকারকর্মী এবং ‘নিজেরা করি’-এর সমন্বয়কারী খুশী কবির বলেন, ‘যদি ১৮ বছর হওয়ার আগেই মেয়েরা সন্তান জন্ম দেয়, তাহলে তার শরীরের অনেক ক্ষয় হয়।’

প্রতিবছরের ১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস পালন করা হয়। সেই কন্যাশিশুরা কতটা নিরাপদ তা উঠে আসে বিভিন্ন গবেষণায়। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৫ শতাংশ শিশু, যার মধ্যে ৪৮ শতাংশ কন্যা। তাই তাদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বৃদ্ধি থাকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যানবেইস ২০২৩ অনুযায়ী, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কন্যাশিশুর উপস্থিতি ৫৩ দশমিক ২০ শতাংশ, যা ছেলেদের চেয়ে বেশি।

আরও পড়ুন

এছাড়া কমেছে মেয়েদের ড্রপআউট (ঝরে পড়া) হার। সারভাইভাল (টিকে থাকার) হার ২০১০ সালের ৬৮ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে বেড়ে ৮৭ দশমিক ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে। মালেকা বানু বলেন, ‘আমরা কিছু সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করতে পেরেছি, যার কারণে শিক্ষাক্ষেত্রে কন্যা শিশুদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। তবে তারা যে শিক্ষা গ্রহণ করছে, তা কতটা প্রোডাক্টিভ(উৎপাদনশীল) হচ্ছে, সেদিকে আমরা পর্যাপ্ত মনোযোগ দিইনি।’

শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রগতি থাকা সত্ত্বেও সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। গ্রামাঞ্চলে কন্যাশিশুদের স্কুলে যাওয়া অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় এবং স্থানীয় পরিবেশে মেয়েদের প্রতি অবাঞ্ছিত আচরণ বা ভয়ভীতির কারণে অভিভাবকরা অনেক সময় তাদের স্কুলে পাঠাতে দ্বিধায় থাকেন। ফলে, নিয়মিত ক্লাসে যাওয়া অনেক কন্যাশিশু মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রগতি থাকলেও সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। অপরাধের দ্রুত বিচার, সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক শিক্ষায় জেন্ডার সংবেদনশীলতা, ভিকটিম-ব্লেমিং বন্ধ করার পদক্ষেপগুলো কার্যকর না হলে কন্যা শিশুর প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনার শিরীন পারভিন হক বলেন, ‘স্কুলে ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্য লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও সম্মান বিষয়ক মডিউল থাকা উচিত। জাতীয় পরিসরে সচেতনতা অভিযান ছাড়া পরিবার ও সমাজের মানসিকতা পরিবর্তন সম্ভব নয়।’

কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ৩৯০ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৪৩ জনকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। খুশী কবির বলেন, ‘ধর্ষণের যেসব মামলা হয় তার ১ শতাংশেরও বিচার হয় না। বরং ধর্ষিতাকেই সমাজ দোষারোপ করে বলে, ওর পোশাকের দোষ ছিল বা সে প্ররোচিত করেছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক বলেন, ‘শিক্ষাব্যবস্থায় নারীদের সংখ্যা বেড়েছে এটা ভালো তথ্য। কিন্তু শিশু কন্যাদের প্রতি সহিংসতার হারও বেড়েছে। এটা কেবল অপরাধ নয়, সামাজিক ব্যাধি।’

শিরীন পারভিন হকের মতে, ‘কন্যা শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু সরকার কাজ করলে হবে না। এটি মূলত সামাজিক দায়িত্ব। মেয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিক্ষা ও গণমাধ্যমকে সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করতে হবে।’

অন্তর্বর্তী সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ বলেন, ‘যেকোনো মূল্যে কন্যা শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার দ্রুত সাড়া দেবে।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad