বাংলাদেশের মানচিত্রের একেবারে শেষ প্রান্তে যেখানে নাফ নদী আর বঙ্গোপসাগর একে অপরের সঙ্গে মিতালিতে মেতেছে, ঠিক সেখানেই প্রকৃতির এক অপার বিস্ময় টেকনাফ ও শাহ পরীর দ্বীপ। পাহাড় আর সমুদ্রের এমন অভূতপূর্ব মেলবন্ধন দেশের আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। একদিকে সবুজে ঘেরা সুউচ্চ পাহাড়ের নিস্তব্ধতা, অন্যদিকে নীল জলরাশির অবিরাম গর্জন পর্যটককে নিয়ে যায় এক মায়াবী জগতে।
টেকনাফ থেকে শাহ পরীর দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত এই জনপদ এখন ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক নতুন স্বপ্নের নাম। শাহ পরীর দ্বীপের নির্জন সৈকত আর নাফ নদীর মোহনায় সূর্যাস্তের দৃশ্য পর্যটকদের ক্লান্তি দূর করে মনের গহীনে এক অপার্থিব প্রশান্তি এনে দেয়।
কক্সবাজার থেকে এই রোমাঞ্চকর যাত্রা শুরু করার সেরা সময় হলো খুব ভোর। ভোরের আলো ফোটার আগেই যদি যাত্রা শুরু করা যায়, তবে মেরিন ড্রাইভ রোডের আসল রূপটি উপভোগ করা সম্ভব। বিশ্বের দীর্ঘতম এই সমুদ্রসৈকত ঘেঁষা সড়কটি দিয়ে যাওয়ার সময় একপাশে উত্তাল সমুদ্র আর অন্যপাশে পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে থাকা সুউচ্চ পাহাড়ের সারি আপনাকে মোহিত করবেই।

ইনানী ও হিমছড়ি পেরিয়ে যখন গাড়ি টেকনাফের দিকে এগোতে থাকে, তখন ঝাউবনের মধ্য দিয়ে আসা স্নিগ্ধ বাতাস শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে দেয়। পাহাড়ের গা ঘেঁষে এঁকেবেঁকে চলা এই পথে মাঝে মাঝেই ছোট ছোট পাহাড়ি ঝরনা আর স্থানীয় জেলেদের কর্মব্যস্ততা যেন কোনো পটুয়ার আঁকা জীবন্ত ছবি।
টেকনাফ শহরে প্রবেশ করেই পর্যটকরা প্রথমে ঘুরে আসতে পারেন ঐতিহাসিক ‘মাথিনের কূপ’। টেকনাফ থানার ভেতরে অবস্থিত এই কূপটি এক অমর ও বিয়োগান্তক প্রেমকাহিনীর নীরব সাক্ষী। কলকাতার পুলিশ কর্মকর্তা ধীরাজ ভট্টাচার্য এবং রাখাইন জমিদার কন্যা মাথিনের সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার করুণ স্মৃতি আজও পর্যটকদের আবেগতাড়িত করে। কূপের চারপাশের সুশোভিত বাগান আর শান্ত পরিবেশ ভ্রমণকারীকে মুহূর্তের জন্য ইতিহাসের ট্র্যাজেডিতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

মাথিনের কূপ দেখা শেষে টেকনাফ বাজার বা আশেপাশের কোনো রেস্তোরাঁয় সকালের নাস্তা সেরে নিতে পারেন।
নাস্তা শেষে পরবর্তী গন্তব্য হবে টেকনাফ শহর থেকে প্রায় পনেরো কিলোমিটার দূরের শাহ পরীর দ্বীপ। নামে দ্বীপ হলেও এটি আসলে টেকনাফের সঙ্গেই যুক্ত বাংলাদেশের স্থলভাগের শেষ জনপদ। টেকনাফ থেকে যাত্রা করে শাহ পরীর দ্বীপে প্রবেশের সময় দুই পাশে লবণের ধবধবে সাদা মাঠ দেখবেন, যা এই অঞ্চলের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।
শাহ পরীর দ্বীপে পৌঁছে পর্যটকরা সরাসরি চলে যেতে পারেন জেটি ঘাটে। নাফ নদীর ওপর এই জেটি ঘাটের ওপাড়েই দেখা যায় মিয়ানমারের গ্রাম। জেটিতে দাঁড়িয়ে ডান দিকে তাকালে চোখে পড়বে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থল।

জেটি থেকে বের হয়ে আবারও এগিয়ে যাবেন আরও দক্ষিণে, বাংলাদেশের অখন্ড স্থলভাগের শেষ বিন্দুতে। এক পাশে নাফ নদীর তীর, আরেক পাশে বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ বালুকাময় সৈকত। প্রায় নির্জন সৈকতের কোথাও কোথাও হয়তো মাছ ধরছে জেলেরা, তাদের চারপাশ ঘিরে রেখেছে অগুনতি গাঙচিল।
দূর থেকে মনে হবে সাদা বালির সৈকতে কেউ বুঝি ছোপ ছোপ গাঢ় লাল রঙ ছিটিয়ে দিয়েছে। আসলে সেগুলো লাল কাকড়া। কাছে গেলেই পালিয়ে যায় বালির গর্তে। শাহ পরীর দ্বীপের পশ্চিম দিকের সমুদ্রসৈকতটি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও শান্ত। সৈকতের বালুচরে লাল কাঁকড়াদের অবাধ দৌড়ঝাঁপ এক অনন্য দৃশ্য তৈরি করে। রোদ ঝলমলে দিনে দিগন্তে মেঘ না থাকলে এই সৈকত থেকে দূরে সাগরের মাঝে দেখা যায় সেন্ট মার্টিন দ্বীপ।

শাহ পরীর দ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতেই মধ্যাহ্নভোজের সময় হয়ে আসবে। আর দুপুরের খাবারের জন্য টেকনাফ শহরে ফিরে আসাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। টেকনাফ বাস টার্মিনাল বা সংলগ্ন এলাকায় বেশ কিছু উন্নত মানের রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে। এই অঞ্চলের প্রধান আকর্ষণ হলো টাটকা সামুদ্রিক মাছ। কোরাল, রূপচাঁদা, লাক্ষা বা সুরমা মাছের ঝাল ভুনা ভোজনরসিকদের রসনা তৃপ্ত করবে। স্থানীয় রেস্তোরাঁগুলোতে পর্যটকদের আতিথেয়তা এই ভ্রমণের আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষে চলে যেতে পারেন শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের নাফ রিভার পয়েন্টে। কক্সবাজার-টেকনাফ পুরনো সড়কের একপাশে নে ট্যং পাহাড়, আরেক পাশে নাফ নদী এক নয়নাভিরাম সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে কক্সবাজার থেকে এই সড়ক ধরে আসার সময় মনে হবে গাড়ি রাস্তা থেকে সোজা নাফ নদীতে নেমে যাচ্ছে।

নাফ রিভার ভিউর আশেপাশেই আছে টেকনাফ নদী বন্দর। মিয়ানমার থেকে পণ্য নিয়ে আসা জাহাজ কিংবা ট্রলার ভিড়ে এই বন্দরে।
বিকেলের নরম আলোয় নাফ নদীর পাড় ধরে কিছুক্ষণ সময় কাটানো যেতে পারে। জেলেরা যখন ছোট ছোট নৌকায় মাছ ধরে ঘাটে ফিরে আসে, তখন এক দারুণ মুখর পরিবেশ তৈরি হয়।
তবে সন্ধ্যা হওয়ার আগেই কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে ফেরার পথ ধরতে হবে। ফেরার পথে মেরিন ড্রাইভ দিয়ে সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা হবে এক কথায় রাজকীয়। সমুদ্রের বিশালতায় সূর্য যখন লাল আভা ছড়িয়ে নীল জলে বিলীন হয়ে যায়, তখন পুরো আকাশটা যেন এক বিশাল ক্যানভাসে আঁকা রঙিন স্বপ্ন। ডানে গর্জনরত সমুদ্র আর বামে নিঝুম পাহাড় রেখে সন্ধ্যার আবছা আলোয় কক্সবাজারের দিকে ফেরার এই যাত্রা আপনার স্মৃতির পাতায় সারাজীবন অমলিন হয়ে থাকবে।
ভ্রমণকারীদের জন্য কিছু জরুরি নির্দেশনা:
টেকনাফ ও শাহ পরীর দ্বীপের দুর্গম সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি কিছু বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি। যেহেতু এটি একটি সীমান্ত এলাকা, তাই ভ্রমণের সময় সাথে অবশ্যই জাতীয় পরিচয়পত্র রাখা উচিত। নে ট্যং পাহাড়ে ট্রেকিং করতে চাইলে অবশ্যই স্থানীয় গাইড সঙ্গে নেওয়া উচিত। কারণ এই পাহাড়ে বুনো হাতি আছে। আর সন্ধ্যার আগেই জঙ্গল এলাকা ত্যাগ করা বুদ্ধিমানের কাজ।
সমুদ্র বা নাফ নদীর মোহনায় নামার আগে জোয়ার-ভাটার সময় সম্পর্কে স্থানীয়দের কাছ থেকে জেনে নেওয়া উচিত, কারণ মোহনার স্রোত অত্যন্ত শক্তিশালী হতে পারে।
প্লাস্টিক বর্জ্য, চিপসের প্যাকেট বা পানির বোতল যেখানে-সেখানে ফেলে এই স্পর্শকাতর পরিবেশের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকুন। দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে সাগর পাড়ে তূলনামূলকভাবে গরম বেশি। তাই সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি ও ছাতা সাথে রাখা ভাল। প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে নিয়ম মেনে ভ্রমণ করলে আপনার এই যাত্রা হবে নিরুপদ্রব ও স্মরণীয়।


