বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই বিশ্বসেরা হওয়ার লড়াই, বিশ্বমঞ্চে নিজেদের জাত চেনানোর মহোৎসব। তবে চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপটি যেন এক অলিখিত নাটকের মঞ্চ, যেখানে এক মহাদেশে আনন্দের জোয়ার অন্য মহাদেশে এনে দিয়েছে হতাশা। ৪৮ দলের এই ঐতিহাসিক আসরে প্রথমবারের মতো গ্রুপ পর্বের খেলা শেষে যখন ‘রাউন্ড অব ৩২’ বা দ্বিতীয় পর্বের সমীকরণ মিলছে, তখন ফুটবলবিশ্ব অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখছে এক বিপরীত চিত্র। একদিকে আফ্রিকার উত্থান, অন্যদিকে সুযোগের বিপুল ডালা সাজিয়েও এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের পরাশক্তিদের ভরাডুবি।
আফ্রিকান রূপকথা: ১০ এ ৯
এবারের বিশ্বকাপে আফ্রিকা অঞ্চল থেকে অংশ নিয়েছিল রেকর্ড ১০টি দেশ। দেশগুলো হলো মরক্কো, দক্ষিণ আফ্রিকা, সেনেগাল, আইভরি কোস্ট, ঘানা, মিশর, আলজেরিয়া, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, কেপ ভার্দে এবং তিউনিসিয়া।
টুর্নামেন্ট শুরুর আগে হয়তো কট্টর আফ্রিকান সমর্থকও ভাবেননি, দ্বিতীয় পর্বের টিকিট কাটার লড়াইয়ে তারা এভাবে ছড়ি ঘোরাবে। তিউনিসিয়া ছাড়া বাকি ৯টি দেশই গ্রুপ পর্বের বৈতরণী পার হয়ে নাম লিখিয়েছে রাউন্ড অব ৩২-এর নকআউট পর্বে। এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত।
গতি, শারীরিক শক্তি আর নিখুঁত ট্যাকটিকসের মিশেলে আফ্রিকান দলগুলো ল্যাটিন বা ইউরোপীয় পরাশক্তিদের চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছে। প্রতিটি ম্যাচেই তাদের মধ্যে দেখা গেছে জয়ের তীব্র ক্ষুধা। মরক্কো, দক্ষিণ আফ্রিকা, আইভরি কোস্টসহ পাঁচটি দেশই নিজেদের গ্রুপে রানার্স আপ হয়ে দ্বিতীয় পর্বে গেছে। ঘানা, আলজেরিয়া, সেনেগালসহ বাকি চারটি দেশ এসেছে সেরা তৃতীয় স্থান দখল করে।
তাদের এই সাফল্য প্রমাণ করে, আফ্রিকার ফুটবল এখন আর কেবল ‘কালো ঘোড়া’ বা ‘অঘটন’ ঘটানোর বৃত্তে সীমাবদ্ধ নেই; তারা এখন বিশ্বমঞ্চের নিয়ন্ত্রক হওয়ার যোগ্যতা রাখে।
মরক্কোর জাদুকরী উত্থান
এবারের আসরে আফ্রিকার সামগ্রিক সাফল্যের মুকুটে সবচেয়ে উজ্জ্বল পালকটি যুক্ত করেছে মরক্কো। গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্টরা এবার প্রমাণ করেছে আগের সাফল্য কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। বরং তারা এখন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম প্রধান শক্তি। গ্রুপ পর্বে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন শক্তিশালী ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়ে মরক্কো যে ফুটবল উপহার দিয়েছে, তা দীর্ঘদিন ফুটবলপ্রেমীদের মনে থাকবে।
ম্যাচটি ড্র হলেও মাঠের লড়াইয়ে সেলেসাওদের রীতিমতো নাকানিচুবানি খাইয়েছে মরক্কো। ইউরোপের শীর্ষ লিগে খেলা একঝাঁক তারকাদের নিয়ে গড়া এই দলটির জমাট রক্ষণ আর চোখের পলকে কাউন্টার অ্যাটাকের সামনে খেই হারিয়ে ফেলেছিল ল্যাটিন পরাশক্তিরা। ব্রাজিলের মতো দলকে পুরো ম্যাচজুড়ে ব্যতিব্যস্ত করে রাখা মরক্কো এবার কেবল নকআউট পর্বের টিকিটই কাটেনি, বরং অন্য পরাশক্তিদের মনেও কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে।
আলো ছড়িয়েছে অন্যরাও
আফ্রিকার সাফল্যের গল্প কেবল একটি দেশের নয়। কেপ ভার্দে প্রথম বিশ্বকাপ খেলেই নকআউট পর্বে উঠে রূপকথা লিখেছে। ডিআর কঙ্গো দীর্ঘ বিরতির পর ফিরে এসে সরাসরি রাউন্ড অব ৩২-এ জায়গা নিশ্চিত করেছে। আলজেরিয়া শেষ ম্যাচে স্নায়ুচাপ সামলে এগিয়েছে। সেনেগাল ধারাবাহিকতার প্রমাণ দিয়েছে, আর ঘানা ও মিসরও নিজেদের অভিজ্ঞতার যথার্থ ব্যবহার করেছে। ফলে এবার আর আফ্রিকার সাফল্যকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলার সুযোগ নেই; এটি একটি মহাদেশের সম্মিলিত অগ্রযাত্রা।
এশিয়া-ওশেনিয়ার ব্যর্থতা
আফ্রিকার এই জয়োৎসবের ঠিক উল্টো পিঠেই রয়েছে এশিয়ার কান্না। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডসহ এশিয়া-ওশেনিয়া অঞ্চল থেকে এবার বিশ্বমঞ্চে পা রেখেছিল ১০টি দল। এই ঐতিহাসিক বহরের প্রতিনিধিরা হলো জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, সৌদি আরব, ইরান, কাতার, ইরাক, জর্ডান, উজবেকিস্তান এবং ওশেনিয়ার পরাশক্তি নিউজিল্যান্ড। ঘরের মাঠের মতো পরিচিত কন্ডিশন কিংবা চেনা আবহাওয়া—সব সুযোগই ছিল এই দলগুলোর অনুকূলে। কিন্তু মাঠের পারফরম্যান্সে তার বিন্দুমাত্র প্রতিফলন দেখা যায়নি।
এই বিশাল বহর থেকে নকআউট পর্বের টিকিট নিশ্চিত করতে পেরেছে মাত্র দুটি দেশ। বাকি ৮টি দেশকেই প্রথম পর্ব শেষে ফিরতি ফ্লাইট ধরতে হয়েছে। কাতার, ইরাক, জর্ডান ও উজবেকিস্তানের মতো নতুন ও উদীয়মান শক্তিগুলো গ্রুপ পর্বেই খেই হারিয়েছে।
অন্যদিকে ওশেনিয়ার নিউজিল্যান্ড এবং এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দল দক্ষিণ কোরিয়া ও সৌদি আরব চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে বিদায় নিয়েছে। ফুটবলপ্রেমীদের নজর ছিল ইরানের দিকে; কিন্তু ৩ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ পর্ব শেষ করা ইরান সেরা তৃতীয় স্থানের লড়াইয়ের সমীকরণে ছিটকে গেছে।
মহাদেশের মান রাখতে রাউন্ড অব ৩২-এর মঞ্চে টিকে আছে জাপান ও অস্ট্রেলিয়া। এর মধ্যে জাপান মাঠের লড়াইয়ে নিজেদের সেরাটা ঢেলে দিয়ে অত্যন্ত চমৎকার ফুটবল খেলেছে, যা এই চরম ব্যর্থতার মাঝেও এশীয় ফুটবলের জন্য একমাত্র প্রাপ্তি।
পার্থক্যটা যেখানে
আফ্রিকা এবং এশিয়া-ওশেনিয়ার এই বিপরীতমুখী ফলাফলের পেছনে মূল কারণটি লুকিয়ে আছে খেলোয়াড়দের অভিজ্ঞতা ও মানসিকতায়। আফ্রিকার অধিকাংশ ফুটবলার ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় লিগগুলোতে নিয়মিত খেলেন। সপ্তাহের পর সপ্তাহ বিশ্বসেরা তারকাদের বিরুদ্ধে খেলার যে অভিজ্ঞতা এবং আত্মবিশ্বাস, তা তারা ঢেলে দিয়েছেন জাতীয় দলের জার্সিতে। চাপের মুখে কিভাবে ঠান্ডা মাথায় ম্যাচ বের করে আনতে হয়, তা আফ্রিকান ফুটবলারদের নখদর্পণে।
অন্যদিকে, এশিয়া ও ওশেনিয়ার দলগুলোর ফুটবলারদের একটি বড় অংশ ঘরোয়া বা আঞ্চলিক লিগের ওপর নির্ভরশীল। ইউরোপের টপ-ফাইভ লিগে খেলা ফুটবলারের সংখ্যা এখনো হাতেগোনা। ফলে, বিশ্বকাপের মতো হাই ভোল্টেজ টুর্নামেন্টে ইউরোপ বা ল্যাটিন আমেরিকার গতিময় ফুটবলের সামনে এই খেলোয়াড়রা খেই হারিয়ে ফেলেছেন। কৌশলের দিক থেকেও আফ্রিকান দলগুলোর আধুনিকায়ন যেখানে চোখে পড়ার মতো ছিল, সেখানে বিদায় নেওয়া এশিয়ার দলগুলোকে অনেক বেশি রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলতে দেখা গেছে।
নতুন ভোরের অপেক্ষায়
চলমান বিশ্বকাপের এই সমীকরণ দুই অঞ্চলের ফুটবলের জন্য দুটি ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। আফ্রিকার জন্য এটি বিশ্বজয়ের স্বপ্নের এক নতুন দিগন্ত। তারা বুক ফুলিয়ে বলতে পারে—’কাপ এবার আমাদেরও হতে পারে’। আর এশিয়ার জন্য এটি এক বড় ধাক্কা। কেবল সুযোগের সংখ্যা বা দল বাড়ালেই যে সাফল্য আসে না, তার প্রমাণ এই বিশ্বকাপ।
মাঠের ফুটবলে আমূল পরিবর্তন, তৃণমূলের উন্নয়ন এবং ফুটবলারদের ইউরোপীয় স্তরে তুলে না আনতে পারলে এশিয়ার ফুটবল যে আরও পিছিয়ে পড়বে, সেই নির্মম সত্যটিই যেন ফিফার এই বিশ্বমঞ্চ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।


