ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থা। সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোট দেওয়ার জন্য দেশ ও দেশের বাইরে থেকে প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ ভোটার নিবন্ধন করেছেন, যা নির্বাচন কমিশনের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে। কমিশন মনে করছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে পোস্টাল ভোটই ফলাফল নির্ধারণে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ ওয়েবসাইট ও অ্যাপের তথ্য অনুযায়ী, পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য মোট নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮২ জন। এর মধ্যে দেশের ভেতর থেকে নিবন্ধন করেছেন ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৪০ জন এবং বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটারের সংখ্যা ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪২ জন। লিঙ্গভিত্তিক হিসাবে নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে পুরুষ ১২ লাখ ৮১ হাজার ৪৩৪ জন এবং নারী ২ লাখ ৫২ হাজার ২৪৬ জন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দেশের অভ্যন্তরে যারা ডাকযোগে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন, তাদের মধ্যে সরকারি চাকরিজীবী রয়েছেন ৫ লাখ ৭৫ হাজার ২০০ জন। নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী নিবন্ধন করেছেন ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৪২ জন এবং আনসার-ভিডিপি সদস্য রয়েছেন ১০ হাজার ১০ জন। এ ছাড়া আইনি হেফাজতে থাকা ভোটারদের মধ্য থেকেও ৬ হাজার ২৮৩ জন পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন।

এদিকে, আসনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের প্রতিটিতেই অন্তত ১ হাজার করে পোস্টাল ভোটার রয়েছেন। ১১৫টি আসনে এই সংখ্যা ৫ হাজার ছাড়িয়েছে এবং ১৮টি আসনে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি।
নিবন্ধনের দিক থেকে এগিয়ে থাকা আসনগুলোর মধ্যে রয়েছে ফেনী, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চাঁদপুর, কক্সবাজার, লক্ষ্মীপুর ও সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন আসন। তথ্য অনুযায়ী, ফেনী-৩ আসনে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ৯০ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন। চট্টগ্রাম-১৫ আসনে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ১৪ হাজার ৩০১ জন, কুমিল্লা-১০ আসনে ১৩ হাজার ৯৭৭ জন, নোয়াখালী-১ আসনে ১৩ হাজার ৬৫৮ জন এবং ফেনী-২ আসনে ১২ হাজার ৭৯৭ জন।
এ ছাড়া নোয়াখালী-৩ আসনে ১২ হাজার ৮২৯ জন, কুমিল্লা-১১ আসনে ১২ হাজার ৫৮৩ জন, সিলেট-১ আসনে ১২ হাজার ৪৫৮ জন এবং কুমিল্লা-৫ আসনে ১২ হাজার ৩৭৩ জন ভোটার পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধন করেছেন।
বিদেশের মাটিতে অবস্থানরত প্রবাসীদের মধ্যে ১২৩টি দেশ থেকে ভোটাররা নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিবন্ধন হয়েছে সৌদি আরব থেকে। এই দেশ থেকে নিবন্ধন করেছে ২ লাখ ৩৯ হাজার ১৮৬ জন।
এ ছাড়া, মালয়েশিয়ায় ৮৪ হাজার ২৯২ জন, কাতারে ৭৬ হাজার ১৩৯ জন, ওমানে ৫৬ হাজার ২০৭ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৩৮ হাজার ৫৭৪ জন, কুয়েতে ৩৫ হাজার ৩৮৬ জন, যুক্তরাজ্যে ৩২ হাজার ৪১৪ জন, যুক্তরাষ্ট্রে ৩১ হাজার ৬৪ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন। তবে ভেনেজুয়েলা, সিরিয়া ও কিউবাসহ ৩৩টি দেশ থেকে কোনো নিবন্ধন পড়েনি।
নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলেও পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোতে এই পদ্ধতিতে ভোটারদের অংশগ্রহণ ছিল না। এবারই প্রথমবারের মতো আইটি-সমর্থিত পোস্টাল ব্যালট ভোটিং ব্যবস্থা চালু করায় ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। পোস্টাল ভোট বিডি অ্যাপের মাধ্যমে এবার প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটারের পাশাপাশি দেশের ভেতরে তিন শ্রেণির ভোটার নিবন্ধনের সুযোগ পেয়েছেন।
এর মধ্যে প্রথমবারের মতো নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভোট দিতে পারবেন। এ ছাড়া, নিজ এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীরা এবং আইনি হেফাজতে (কারাগারে) থাকা ভোটাররাও পোস্টাল ব্যলটে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
কর্মকর্তারা আরও জানান, ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ হওয়ার পর যার যার আসনের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন নিবন্ধিত ভোটারা এবং পরদিন থেকেই ফিরতি ডাক পাঠানো যাবে। আর দ্রুত সময়ে ভোট দিয়ে ব্যালট ফেরত পাঠাতে হবে। ১২ ফেব্রুয়ারির আগে উপযুক্ত সময়ের মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে ব্যালট না পৌঁছালে গণনায় নেওয়া হবে না।
পোস্টাল ভোটের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সাড়া পেয়েছি। সাধারণত বিশ্বে পোস্টাল ভোটের হার ২ দশমিক ৭ শতাংশের মতো থাকে, কিন্তু বাংলাদেশে তা ৩ দশমিক ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এটি একটি বিশ্বরেকর্ড হতে পারে।
সব আসনেই এসব ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে যেসব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হবে, সেখানে পোস্টাল ভোটের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।’


