রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংস্কারের নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও জনগণের হারানো আস্থা ফিরে পেতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ বাহিনী। দুর্নীতি, হয়রানি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এখনো প্রতিনিয়ত সামনে আসছে, যা এই প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত পরিবর্তন নিয়ে জনমনে গভীর প্রশ্ন তুলছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণআন্দোলন চলাকালে হতাহতের ঘটনায় পুলিশের কিছু সদস্যের ভূমিকা কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ে, যা বাহিনীর ভাবমূর্তিকে চরম সংকটে ফেলে দেয়। পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ ওঠে। এর ফলে অনেক কর্মকর্তা আত্মগোপনে চলে যান এবং শত শত সদস্যকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওএসডি করা হয়, যা ছিল বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলারই প্রতিফলন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পুলিশের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরাতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং পেশাদার নিরপেক্ষতা বজায় রাখার লক্ষ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়। তবে এক বছরেরও বেশি সময় পার হলেও সমালোচকদের মতে, পুলিশ বাহিনী সেই কলঙ্কিত অধ্যায় থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর অনেক কর্মকর্তা বদলি বা বিভাগীয় শাস্তির ভয়ে অতি-সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় থাকার চেয়ে রুটিন কাজে সময় পার করার প্রবণতা বেড়েছে। এমনকি আইজিপি নির্দেশ দিয়েছেন যেন কোনো কর্মকর্তা পোস্টিং বা বদলির তদবিরের জন্য কর্মস্থল ছেড়ে মন্ত্রণালয়ে না যান।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হলেও পুলিশের বিরুদ্ধে হয়রানি, মামলার মারপ্যাঁচ এবং গ্রেপ্তারের নামে বাণিজ্যের অভিযোগ থামেনি। যদিও পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা দাবি করছেন, গত সংসদ নির্বাচনে তারা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করে নিজেদের পেশাদারিত্বের প্রমাণ দিয়েছেন। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের চিত্র ভিন্ন।
এখনো পোস্টিংয়ে ঘুষ লেনদেন এবং মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানোর মতো পুরনো চর্চাগুলো বহাল আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংস্কারের অংশ হিসেবে একটি অর্ডিন্যান্স আনা হলেও বাহিনীর ভেতর থেকেই তাতে আপত্তি উঠেছে। অনেকে বলছেন, দৃশ্যমান পরিবর্তনের মধ্যে কেবল ইউনিফর্মের রঙ বদলেছে, কিন্তু মৌলিক সংস্কার এখনো অধরা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ দায়িত্ব নেওয়ার পর বারবার বলেছেন, সরকার অতীত বদনাম ঘুচিয়ে একটি পেশাদার ও নির্ভরযোগ্য বাহিনী গড়তে বদ্ধপরিকর। আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকিরও একটি অরাজনৈতিক ও দক্ষ প্রতিষ্ঠান গড়তে সরকার ও জনগণের সহযোগিতা চেয়েছেন এবং উন্নত সেবার মাধ্যমে আস্থা ফেরানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, তারা সফলভাবে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে কাজ করছেন এবং বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নেই।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পরিদর্শক কামরুল হাসান বলেন, তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে চান এবং অপরাধীদের তথ্য দিয়ে জনসহযোগিতা কামনা করেন।
তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, এই সংকট দ্রুত সমাধানযোগ্য নয়। তিনি বলেন, গত কয়েক দশকের চরম রাজনীতিকরণ পুলিশের পেশাদারিত্বকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এটি কেবল কোনো একটি দলের সমস্যা নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। পুলিশকে যখন রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন কেবল নেতৃত্ব বদল করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
তিনি সতর্ক করে বলেন, সর্বস্তরে রাজনৈতিক প্রভাব নির্মূল না হলে সংস্কার উদ্যোগ সফল হবে না এবং সাধারণ মানুষকে এর খেসারত দিতেই হবে।
পুলিশ সংস্কার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান সফর রাজ হোসেন জানান, ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি তারা সংস্কারের ১১ সদস্যের একটি সুপারিশমালা সরকারের কাছে জমা দিয়েছেন। কিন্তু এরপর থেকে সরকারের পক্ষ থেকে সেভাবে কোনো ফলোআপ পাওয়া যায়নি। তার মতে, এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হলে পুলিশ অনেক বেশি জনবান্ধব ও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের মোট জনবল প্রায় ২ লাখ ১৩ হাজার, যার মধ্যে নারী সদস্য রয়েছেন ১৩ হাজারের বেশি। জন সংখ্যার অনুপাতে প্রতি ৮০০ মানুষের জন্য একজন পুলিশ সদস্য নিয়োজিত। এত বিশাল বাহিনী থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা সমালোচনার পালে হাওয়া দিচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যবসায়ীদের কাছে পুলিশের মোটা অংকের চাঁদা দাবি, রিমান্ডে নির্যাতন, এমনকি ঘুষের মামলা করতে আসা ব্যক্তিকে খোদ পুলিশ সদস্য কর্তৃক মারধরের প্রমাণ মিলেছে।
উত্তরবঙ্গে পুলিশের নির্যাতনে এক শিক্ষার্থীর শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট হওয়া এবং রেশন স্টোরের পণ্য আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে। এ ছাড়াও সাধারণ মানুষকে মাদক মামলায় ফাঁসানো, গ্রেপ্তার বাণিজ্য এবং অভিযানে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার মতো ঘটনা জনমনে ক্ষোভ জিইয়ে রেখেছে। একটি ঘটনায় গ্রেপ্তারের সময় পুলিশ সদস্যের লাথিতে এক বৃদ্ধের মৃত্যুর অভিযোগও উঠেছে।
এসব বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এইচ এম শাহাদাত হোসেন বলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পুলিশ ধীরে ধীরে নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরছে। মাঠ পর্যায়ে পেশাদারিত্বের সঙ্গেই দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে। তবে কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হয় এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নিতে পুলিশ আপসহীন। বাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য।


