খাগড়াছড়িতে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ, প্রসিত) এর সঙ্গে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস, সন্তু) গ্রুপের দ্বিতীয় দিনের সশস্ত্র সংঘাতে পানছড়িতে ইউপিডিএফ-সহযোগী এক নেতা নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
ইউপিডিএফ-এর সহযোগী সংগঠন গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, প্রতিপক্ষ জেএসএস (সন্তু) গ্রুপের অন্তত ২০ জনের সশস্ত্র গ্রুপের গুলিতে সংগঠনের জেলা শাখার সদস্য খুকু চাকমা নিহত হয়েছেন।
তাদের অভিযোগ, পানছড়ির ২ নম্বর চেঙ্গী ইউনিয়নের উগুদোছড়ি গ্রামে রোববার বিকাল তিনটার দিকে গুলিতে খুকু চাকমা আহত হওয়ার পর জেএসএস (সন্তু) গ্রুপ ‘বন্দুক ঠেকিয়ে’ তাকে হত্যা করে।
শনিবারই জেলার অপরপ্রান্তে দীঘিনালার দুর্গম পাহাড়ে আঞ্চলিক ওই দুই গ্রুপের গোলাগুলির খবর স্থানীয়দের পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসন স্বীকার করে।
তবে ইউপিডিএফ মুখপাত্র অংগ্য মারমা টাইমস অব বাংলাদেশকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেননি। তিনি বলেন, ‘গোলাগুলিতে ইউপিডিএফ-এর চারজন নিহতের যে খবর গণমাধ্যমে প্রচার হচ্ছে, তা একেবারেই ভিত্তিহীন।’
এমন আবহে দুই গ্রুপের মধ্যে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ইউপিডিএফ সমর্থিত সদস্য নিহতের খবর এলো।
ইউপিডিএফ দমনে মরিয়া জেএসএস
পাহাড়ের স্থানীয় সূত্রগুলো নিশ্চিত করে বলছে, পার্বত্যাঞ্চলে জাতীয় নির্বাচনের আগে শান্তিচুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফ’কে দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি শান্তিচুক্তি পক্ষীয় জেএসএস (সন্তু) গ্রুপ সশস্ত্র অভিযানে নেমেছে।
এরই অংশ হিসেবে খাগড়াছড়ির দীঘিনালার পর পানছড়িতে অভিযান চালায় জেএসএস (সন্তু) গ্রুপ। জেলায় সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস প্রকাশ্যে নেই বলে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) সম্প্রতি দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ে ইউপিডিএফ বিরোধী অভিযানের ঘোষণা দেওয়ার পর শীর্ষ নেতারা গা ঢাকা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

দলের মুখপাত্র অংগ্য মারমাও নেতাদের আত্মগোপনের কথা টাইমস অব বাংলাদেশের কাছে স্বীকার করেন। তার অভিযোগ, বিগত ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের মতো অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও তারা একই রকম দমন-পীড়নের শিকার।
অন্যদিকে, ঢাকায় সক্রিয় ‘আয়নাঘর’ ফেরত মাইকেল চাকমাও গা ঢাকা দিয়েছেন। পরিস্থিতি আগাম আঁচ করতে পেরে বছর খানেক আগেই দলের সভাপতি প্রসিত বিকাশ খীসা ও সাধারণ সম্পাদক রবিশংকর চাকমা পাড়ি দিয়েছেন ওপারে, ভারতের ত্রিপুরায়।
আরেক কেন্দ্রীয় নেত্রী সমারি চাকমা বছর দুয়েক আগে পাড়ি জমিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে।
সম্প্রতি ইউপিডিএফ-এর ফেসবুক পেজটিও নিস্ক্রিয় করা হয়েছে।
দুঃসময়ে পাশে নেই বিএনপি ও জামায়াত
পাহাড়ের সূত্রগুলো বলছে, ভোটের রাজনীতিতে বিগত হাসিনা সরকারের আমলে শান্তিচুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী সখ্য গড়ে তুললেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পাল্টে গেছে পরিস্থিতি।
সারাদেশের মতো পাহাড়েও বিএনপি ও জামায়াত একক ভোটের রাজনীতি নিয়েই এগুচ্ছে। ‘অন্তর্বর্তী সরকার বিরোধী সশস্ত্র অবস্থানের’ কারণে ইউপিডিএফ এই দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের সমর্থন হারিয়েছে।

সন্ত্রাসে জনবিচ্ছিন্ন ইউপিডিএফ
ইউপিডিএফ (প্রসিত)-এর বিরুদ্ধে বরাবরই হত্যা, অপহরণ, গুম খুন, চাঁদাবাজির বিস্তর অভিযোগ থাকলেও বরাবরই তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। ২০০১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটির নানিয়ারচরে ড্যানিডার তিন বিদেশিকে একমাসের জন্য জিম্মি করে আন্তর্জাতিক সংবাদে পরিনত হয় ইউপিডিএফ।
২০১৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটিতে জেএসএস (সন্তু) সমর্থিত প্রায় ৭০ জন গ্রামবাসীকে ট্রলারসহ অপহরণ করে বাংলাদেশে ‘সবচেয়ে বড় অপহরণের রেকর্ড’ করে গ্রুপটি।
সবশেষ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত এপ্রিলেই চাকমাদের ‘বিঝু’ উৎসবের সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ পাহাড়ি শিক্ষার্থীকে অপহরণ করে ফের আলোচনায় আসে গ্রুপটি।
পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর ইউপিডিএফ (প্রসিত) ও জেএসএস (সন্তু)-এর মূল দল এবং তাদের আরো দুটি উপদলের ‘ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে’ গত আড়াই দশকে হতাহতের সংখ্যাও অনেক। বিভিন্ন সময় নিরাপত্তা অভিযানে ইউপিডিএফ-এর অনেক ক্যাডার অস্ত্র-শস্ত্রসহ গ্রেপ্তারও হয়েছেন।


