পুলিশি অভিযানের সময় ধরে আনা নারীদের ভিডিও তুলে জনসমক্ষে অপমান করার ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। আর এসব ভিডিওর বড় অংশই সরাসরি সাংবাদিকদের হাতে তুলে দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
কোনো অপরাধ প্রমাণ হওয়ার আগেই এসব ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মূলধারার সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। এমনকি অভিযোগ রয়েছে, টাকা আদায় করার জন্য কর্মকর্তারা এসব ভিডিও ধারণ করে ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়ার ভয় দেখান। দাবি মেনে না নিলে সত্যি সত্যিই তা ছড়িয়ে দেন।
পুরুষদের ক্ষেত্রেও একইভাবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা (প্রাইভেসি) লঙ্ঘন করা হচ্ছে। বাসা বা গাড়িতে তল্লাশি, ব্যক্তিগত বিষয়ে নানারকম জেরা এবং জিজ্ঞাসাবাদের ভিডিও পোস্ট করা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
মানবাধিকার কর্মীরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার ও আইনি সুরক্ষাকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করে এবং পুলিশের অভিযানকে সাধারণ মানুষের জন্য মুখরোচক তামাশায় পরিণত করে।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ডক্টরাল ফেলো আসিফ বিন আলী টাইমসকে বলেন, ‘পরে আদালত কাউকে নির্দোষ ঘোষণা করলেও ইন্টারনেটে যে অপমানের দাগ লেগে যায় তা সহজে মোছা যায় না।’
গত ১৯ অক্টোবর ঢাকার পূর্বাচলের পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-১-এর একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ডিবি পুলিশ ৮৫ জনকে গ্রেপ্তার করে। আটকদের যখন বাইরে নিয়ে আসা হচ্ছিল, তখন ক্যামেরার সামনে তাদেরকে মুখ দেখাতে বাধ্য করা হয়। যারা মুখ ঢাকার চেষ্টা করছিলেন, তাদের হাত টেনে সরিয়ে দেওয়া হয় বা মুখের কাপড় খুলে ফেলা হয়।
ক্যামেরার পেছন থেকে এক গলায় বলতে শোনা যায়, ‘সব খুলে ফেল, মাস্ক খোল, ঢাকবি না; ঢাকলে পিটুনি হবে।’
পরে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয় এবং মূলধারার খবরেও স্থান পায়। তবে কিছু সংবাদমাধ্যম কেবল আটকে পড়া ব্যক্তি ও তাদের অভিভাবকদের নাম প্রকাশ করে।
গুলশানের জার্মান ক্লাবে পুলিশের অভিযানের সময়ও অনুরূপ ঘটনা ঘটে। সেখানে মূল গেট দিয়ে বের হওয়ার সময় অতিথিদের ভিডিও রেকর্ড করে তা ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়া হয়।
উত্তরা একটি বারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সরবরাহ করা একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, সেখানেও আটকে রাখা নারীদের মুখ জোর করে দেখানোর চেষ্টা চলছে।
সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ টাইমসকে বলেন, ‘এ ধরনের ভিডিও প্রচার করা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মর্যাদার মারাত্মক লঙ্ঘন। তা ছাড়া জোর করে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য না করার যে আইনি সুরক্ষা রয়েছে, এই চর্চা তার ওপরও আঘাত হেনে চলেছে।’
তিনি বলেন, ভিউ ও প্রচারের লোভে সংবাদমাধ্যমে এক ধরনের ‘লাইভ উন্মাদনা’ তৈরি হয়েছে। আর পুলিশও নিজেদের ঢাক পেটাতে এসব ভিডিও ব্যবহার করছে।
আইনি দিক ছাড়াও এই চর্চা একজন মানুষের অপমানকে সাধারণ মানুষের বিনোদনে পরিণত করে বলে মনে করেন আসিফ বিন আলী। তিনি বলেন, ‘মানুষের কৌতূহল, অন্যকে শাস্তি পেতে দেখার বিকৃত আনন্দ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিউ পাওয়ার প্রতিযোগিতাই এই অন্যায় বাড়িয়ে তুলছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক সাইফুল আলম চৌধুরী টাইমসকে বলেন, ‘কোনো প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, অন্যায় বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহারের খবর প্রকাশে জনস্বার্থ থাকতে পারে। কিন্তু তার জন্য সাধারণ মানুষের মুখ আর ব্যক্তিগত তথ্য তুলে ধরা কতটা দরকার?’
আজকাল শিশুরাও এই অপমান ও গোপনীয়তা লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছে। গত মাসে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক রুমে একসঙ্গে থাকার অভিযোগে পোশাক পরা এক স্কুলছাত্রী ও এক ছেলেকে স্থানীয় লোকজন ঘিরে ধরে রেখেছে। ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল তাদের মুখ।
বাংলাদেশের শিশু আইনের ৮১ ধারা অনুযায়ী, কোনো শিশুর ক্ষতি হতে পারে বা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে তার পরিচয় প্রকাশ পায়–এমন কোনো প্রতিবেদন, ছবি বা তথ্য প্রকাশ করা আইনিভাবে নিষিদ্ধ। এই আইন ভাঙলে সর্বোচ্চ এক বছরের জেল, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
সংবিধানের ৩১ ও ৩৫ অনুচ্ছেদে আইন অনুযায়ী বিচার পাওয়ার অধিকার এবং জোরপূর্বক নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া ও অপমানজনক শাস্তি থেকে সুরক্ষার কথা স্পষ্ট বলা আছে। এ ছাড়া জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার সনদের ১১ ও ১২ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ আছে–অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগে সবাইকে নির্দোষ ধরে নিতে হবে এবং কারও ব্যক্তিগত জীবন, সম্মান ও সুখ্যাতিতে অন্যায় হস্তক্ষেপ করা যাবে না।
এ বিষয়ে বারবার কড়া নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশের হাইকোর্ট। ২০১২ সালে আদালত নির্দেশ দেয়, কোনো গ্রেপ্তার বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে মিডিয়ার সামনে হাজির করা যাবে না।
২০১৫ সালে হাইকোর্ট আবারও বলে, আদালতে তোলার আগে আসামিদের গণমাধ্যমের সামনে আনা অনুচিত। একই সঙ্গে পুলিশ প্রধানকে (আইজিপি) এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা জারি করতে বলা হয়।
২০১৯ সালে আদালত মন্তব্য করে, তদন্ত চলার সময় মিডিয়া ব্রিফিং করা সুষ্ঠু তদন্তের পরিপন্থী। আদালত এ বিষয়ে একটি নীতিমালা তৈরির তাগিদ দিলেও আজও তা তৈরি করা হয়নি।
‘শিকারি সাংবাদিকতা’
বাংলাদেশ জার্নালিস্টস ইন ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়ার আহ্বায়ক স্যাম জাহান এই কাজকে ‘মধ্যযুগীয়, বর্বর ও পৈশাচিক আনন্দ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘কারও বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে আইনের মাধ্যমে বিচার হবে। কিন্তু তার ব্যক্তিগত জীবন টেনে এনে এভাবে অপমান করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।’
সাংবাদিকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘পুলিশ যা সামনে এনে দেবে, না ভেবেচিন্তে তা প্রচার করা সাংবাদিকতা নয়। পুলিশ ভুল করলে সাংবাদিকদের সেই ভুলের অংশ হওয়া উচিত নয়।’
সাংবাদিকতার শিক্ষক সাইফুল আলম চৌধুরী একে ‘প্রিডেটরি জার্নালিজম’ বা ‘ওত পেতে থাকা শিকারি সাংবাদিকতা’ বলছেন।
তিনি বলেন, ‘খবর যাচাই-বাছাই ও সাংবাদিকতার নৈতিকতা মেনে চলার ব্যবস্থা শিথিল হয়ে গেছে। সেই কারণেই গণমাধ্যমগুলো মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার দিকে নজর দিচ্ছে না।’
সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার ও সাংবাদিকতার অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক গোলাম রহমান বলেন, ‘লাইভ সম্প্রচার আর মোবাইল সাংবাদিকতার কারণে বিচারে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই মানুষকে জনসমক্ষে অপমান করার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে।’
মানবাধিকার কর্মী ও গবেষক রেজাউর রহমান লেনিন বলেন, কারও ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করে দিলে বিচার শেষের আগেই মানুষ তাকে অপরাধী ভেবে নেয়। এতে যে ক্ষতি হয়, তা পরে আর কোনোভাবেই ফিরিয়ে আনা যায় না।
তিনি বলেন, ‘তদন্তের প্রয়োজনে ভিডিও করা আর তা সংবাদমাধ্যমে দেওয়া, নেট দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া বা বাহিনীর প্রচারে ব্যবহার করা এক জিনিস নয়। কাউকে জোর করে মুখ দেখাতে বাধ্য করাও তদন্তের নিয়ম হতে পারে না।’
পুলিশের খবরে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের দৌড়ঝাঁপ
পুলিশ প্রায়ই এসব অভিযানের ভিডিও সাংবাদিক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের হাতে তুলে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের ‘বিশ্বস্ত সাংবাদিকদের’ আগেই খবর দিয়ে দেওয়া হয়, যাতে তারা সময়মতো গিয়ে হাজির হতে পারেন।
পুলিশের অভিযান নিয়ে ভিডিও বানানো কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের একটা দলই তৈরি হয়ে গেছে। হোটেল, বাসা-বাড়ি কিংবা তল্লাশি চৌকিতে পুলিশের পাশাপাশি এদেরকেও প্রতিনিয়ত ভিডিও করতে দেখা যায়।
একটি জাতীয় দৈনিকের অনলাইন বিভাগের এক সাংবাদিক নিয়মিত এসব অভিযানে যান এবং ভিডিও করেন। এ বিষয়ে নিজের কোনো ভুল দেখতে পান না তিনি।
টাইমসের প্রশ্নের জবাবে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, ‘কীসের অপরাধ? পুলিশ নিজেরাই তো আমাদের ডেকে নিয়ে যায় আর ভিডিও করতে বলে। আপনারা আমাদের আইন শেখাতে আসছেন কেন?’
তবে আসিফ বিন আলী স্পষ্ট বলেন, ‘পুলিশের কাজ অপরাধের তদন্ত করা, মানুষকে জনসমক্ষে অপমান করা নয়।’
তিনি মনে করেন, জোর করে ক্যামেরার সামনে আনা এবং সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া একজন মানুষের প্রাইভেসি ও আত্মসম্মানে আঘাত হানে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে অপমানের সুযোগ তৈরি হয়, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
তবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের ডেকে নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘মিডিয়া কোথায় যাবে না যাবে তা তো আমরা ঠিক করে দিই না। আমরা কোথাও অভিযানে যাচ্ছি, সেখানে মিডিয়াও উপস্থিত থাকতে পারে।’


