প্রকৃতিতে এখন বসন্তের মাতাল হাওয়া, আর সেই হাওয়ায় দোল খাচ্ছে টাঙ্গাইলের যমুনার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের সূর্যমুখী ফুলের মাঠ। সকালের উদিত সূর্যের দিকে মুখ করে থাকা এই ফুলগুলো বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের গতিপথ অনুসরণ করে ঘোরে, যা এক অপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা করে। সবুজের বুক চিরে চোখজুড়ানো হলুদের এই ঝলকানি এখন কেবল প্রকৃতির শোভা নয়, বরং টাঙ্গাইল সদরসহ বিভিন্ন উপজেলার কৃষকদের ভাগ্য বদলের নতুন হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
উর্বর মাটি ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় চলতি মৌসুমে টাঙ্গাইল সদর উপজেলায় সূর্যমুখীর বাম্পার ফলন হয়েছে। ভোজ্য তেলের বাজারে ব্যাপক চাহিদা ও ভালো দামের আশায় কৃষকদের মুখে এখন তৃপ্তির হাসি। সদর উপজেলা ছাড়িয়ে জেলার ভূঞাপুর, গোপালপুর, নাগরপুর ও কালিহাতী উপজেলার চরাঞ্চলেও এই তেলের ফসলের আবাদ ছড়িয়ে পড়েছে।
সরেজমিনে সদর উপজেলার কাকুয়া ইউনিয়নসহ যমুনার তীরবর্তী এলাকাগুলো ঘুরে দেখা যায়, সবুজ আর হলুদের মিতালীতে মাঠগুলো ভরে উঠেছে। শেষ বিকেলের রোদে সূর্যমুখী ফুলের ওপর মৌমাছি ও পাখির আনাগোনা এক মুগ্ধতা ছড়ানো পরিবেশ তৈরি করেছে, যা স্থানীয়দের পাশাপাশি বিনোদনপ্রেমীদেরও আকৃষ্ট করছে।
সরকারি প্রণোদনা এবং কৃষকদের ঐকান্তিক আগ্রহে এবার টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কাকুয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ গয়লাসহ দুর্গম চরাঞ্চলের প্রায় ৪৫ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড টিএসএফ ২৭৫ জাতের সূর্যমুখী চাষ করা হয়েছে। বর্তমানে বাজারে ভোজ্য তেলের চড়া দামের কারণে এই চাষ স্থানীয় তেলের চাহিদা পূরণে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। স্বল্প খরচ ও পরিশ্রমে বেশি লাভ হওয়ায় কৃষকরা এখন ধান বা পাটের বিকল্প হিসেবে সূর্যমুখীর দিকে ঝুঁকছেন।
প্রান্তিক কৃষক আব্দুল মজিদ নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, আগে তিনি মনে করতেন সূর্যমুখী কেবল একটি শৌখিন ফুল। কিন্তু কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে এবার তিনি এক বিঘা জমিতে এই ফুলের চাষ করেছেন। মাঠের বর্তমান ফলন দেখে তিনি আশাবাদী, পরিবারের তেলের চাহিদা মিটিয়েও ভালো অর্থ উপার্জন করা সম্ভব হবে।
আরেক কৃষক আনোয়ার হোসেন জানান, গত বছর সূর্যমুখী চাষ করে অন্যান্য ফসলের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি লাভ পাওয়ায় এবার তিনি বাণিজ্যিকভাবে সাত বিঘা জমিতে এর আবাদ করেছেন। লাভ আরও বাড়বে বলেই তার আশা।
অন্যদিকে কৃষক হাতেম আলী জানান, ধান বা পাট চাষে প্রচুর পানি ও সারের প্রয়োজন হয়, যা অনেক সময় ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। কিন্তু সূর্যমুখী চাষে পানি ও সার যেমন কম লাগে, তেমনি পোকার উপদ্রবও কম। বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকায় আগামীতে আরও বড় পরিসরে সূর্যমুখী চাষের পরিকল্পনা করছেন তিনি।
এদিকে এই মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরাও ভিড় করছেন। ঘুরতে আসা দর্শনার্থী কানিস ফাতেমা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দেখে তিনি যমুনার পাড়ে এসেছেন। চারদিকের হলদে আভায় তার চোখ জুড়িয়ে গেছে, যমুনার তীরের এই প্রাকৃতিক পরিবেশ তাকে দারুণ মানসিক প্রশান্তি দিচ্ছে।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুমানা আক্তার এই নতুন সম্ভাবনা সম্পর্কে জানান, সরিষার বিকল্প এবং স্বাস্থ্যসম্মত ভোজ্য তেলের চাহিদা মেটাতে সূর্যমুখী একটি অত্যন্ত লাভজনক ফসল। দিন দিন জেলার চরাঞ্চলগুলোতে এর চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, কৃষি বিভাগ চাষিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, উন্নত মানের বীজ ও সার দিয়ে সব ধরনের সহযোগিতা করে আসছে। সূর্যমুখী চাষ একদিকে যেমন ভোজ্য তেলের ঘাটতি মেটাচ্ছে, অন্যদিকে কৃষি পর্যটনের এক বিশাল সুযোগও তৈরি করেছে।
আধুনিক পদ্ধতিতে সূর্যমুখীর চাষাবাদ অব্যাহত থাকলে এটি টাঙ্গাইল জেলার অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন কৃষি কর্মকর্তা রুমানা আক্তার।


