জনাকীর্ণ উন্নয়নকেন্দ্র ব্যর্থ হচ্ছে কিশোর অপরাধী পুনর্বাসনে

জনাকীর্ণ উন্নয়নকেন্দ্র ব্যর্থ হচ্ছে কিশোর অপরাধী পুনর্বাসনে
গাজীপুরের কিশোর উন্নয়নকেন্দ্র। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

`শিশুরা দেশ, সমাজ ও পৃথিবীর ভবিষ্যৎ’– এটি শুধু স্লোগান নয়, অমোঘ সত্য। একটি জাতির উন্নয়ন নির্ভর করে তাদের শিশুদের সুস্থ, সুন্দর ও নিরাপদভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিতের ওপর। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত সুরক্ষা ও ভালোবাসায় যথাযথভাবে গড়ে ওঠে শিশুর ভবিষ্যৎ।

কিন্তু পৃথিবীর সব শিশুই এই সৌভাগ্য পায় না। দারিদ্র্য, পরিবারে ভাঙন, মাদক ও সামাজিক নানা বৈষম্য অনেক শিশুকে ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন ধরনের অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। এই শিশুদের ঠিক অপরাধী বলা যায় না। বরং পরিস্থিতির শিকার বললে, তাদের অবস্থানটা বোঝা যায়।

পরিস্থিতির শিকার এই শিশুদের জন্যই যাত্রা শুরু করেছিল ‘বাংলাদেশে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র’। শাস্তির পরিবর্তে সংশোধন ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে শিশুকে নতুন জীবনে ফিরিয়েই ছিল এর লক্ষ্য।

তবে এখন এই কেন্দ্রের যে অবস্থা, তাতে সেখানে থাকা শিশুদের জন্য এটি অনেকটা কারাগারের মতোই।

১৯৭৪ সালের শিশু আইন ও ১৯৭৬ সালের শিশু বিধিমালা শিশু আদালত ও সংশোধনাগারের পথ প্রশস্ত করে।

দেশে প্রথম শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র গড়ে ওঠে ১৯৭৮ সালে গাজীপুরের টঙ্গীতে। পরে ১৯৯৫ সালে যশোর ও কোনাবাড়িতে বালক শাখা এবং ২০০৩ সালে গাজীপুরে এর বালিকা শাখা গড়ে তোলা হয়।

২০১৩ সালের নতুন শিশু আইনেও কিশোর অপরাধ মোকাবিলায় শাস্তির চেয়ে পুনর্বাসনের ওপর জোর দেওয়া হয়।

টঙ্গীতে ছেলে শিশু বা বালকদের জন্য শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রটিতে অনুমোদিত আসন সংখ্যা ৩০০। তবে এখন সেখানে রয়েছে ৬৬৬ জন।

এই উন্নয়ন কেন্দ্রের সমাজসেবা কর্মকর্তা নাসরিন জাহান বলেন, ‘ওদের আবাসনের সমস্যা, শৌচাগারের সমস্যা রয়েছে। গাদাগাদি করে থাকতে হয় বলে শিশুরা নানা ধরনের চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আবার সবার জন্য খেলাধুলা বা বিনোদনের ব্যবস্থা করাও সম্ভব হচ্ছে না।’

আবার কেবল যে শিশুদের সংখ্যাই বেশি তা নয়। এই শিশুদের দেখভালসহ অন্যান্য কাজ সামাল দেওয়ার জন্য কর্মীর সংখ্যাও কম। ৩০০ শিশুর জন্য ৬৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা, কিন্তু বিপরীতে ছয় শতাধিক শিশুর জন্য রয়েছেন মাত্র ২৫ জন।

নাসরিন বলেন, ‘লোকজন কম থাকায় সবদিকে দৃষ্টি দেওয়া যায় না, আনসার সদস্যরা থাকেন, আমরা থাকি, তারপরও মাঝে মাঝে দেখা যায় কোনো কোনো শিশু পালানোর চেষ্টা করছে।’

একই অবস্থা যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রেও। সেখানে অনুমোদিত আসনসংখ্যা ১৫০ হলেও বর্তমানে থাকছে ৩০৪ টি শিশু।

আরও পড়ুন

কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক মঞ্জুরুল হাছান বলেন, ‘অবস্থা কঠিন হলেও আমরা চেষ্টা করি যেন নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক কাউন্সেলিং দেওয়া যায়। তবে জনবল মাত্র ১৮ হওয়ায় প্রতিদিন এত শিশু সামলানো খুবই চ্যালেঞ্জিং।’

তবে উল্টো দৃশ্যের দেখা মিলবে কোনাবাড়ি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের বালিকা শাখায়। যেখানে অনুমোদিত আসনসংখ্যা ১৫০ হলেও বর্তমানে থাকছে ৬৮ জন।

শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে আশ্রয় পাওয়া শিশুদের প্রায় সবাই চুরি, ডাকাতি, মাদক সংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত। আবার অপহরণ বা নির্যাতনের শিকার হয়েও অনেকের ঠাঁই হয় এসব কেন্দ্রে। অনেকের কেন্দ্রে যাওয়ার পেছনে রয়েছে পারিবারিক ভাঙন, খারাপ সঙ্গে পড়া কিংবা সামাজিক অবহেলাও।

নাসরিন জাহান বলেন, ‘বেশিরভাগ শিশু আসে ব্রোকেন ফ্যামিলি থেকে। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ, মাদক বা খারাপ বন্ধুবান্ধবের কারণে শিশুরা অপরাধে জড়ায়। তাই কেবল শিশুদের নয় তাদের অভিভাবকদেরও কাউন্সেলিং জরুরি।’

টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে অভিভাবকদের কাউন্সেলিং করানো হয়। যেন তারা উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে ফেরা শিশুদের আবার স্কুলে ভর্তি করে দেন বা তাদের জন্য কোনো ব্যবসা বা কাজের ব্যবস্থা করে দেন। কারণ বেশিরভাগ শিশুই অনিচ্ছাকৃতভাবে অপরাধে জড়ায়, তাই তাদের নতুন সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

এসব কেন্দ্রে কিছু প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু আছে। যার মধ্যে রয়েছে: কম্পিউটার, ইলেকট্রিক্যাল কাজ, দর্জি, অটোমোবাইল সার্ভিসিং এবং কাঠের কাজ। এসব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিশুদের কর্মক্ষম করে তোলার চেষ্টা করা হয়। তবে শিশুদের জন্য আলাদা কোনো পুনর্বাসন বাজেট নেই। করোনাকালীন সময় ইউনিসেফ সহায়তা দিলেও বর্তমানে তা বন্ধ। ফলে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা প্রায়ই আবার পুরোনো জীবনে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।

টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের সহকারি পরিচালক ইমরান খান বলেন, ‘অবকাঠামো উন্নয়ন দরকার। কারণ একটা শিশুকে যদি আপনি থাকতে দেন, অন্তত ৫০ বর্গফুট জায়গা লাগবে। অথচ এখানে ২০ বর্গফুটও নেই। তাই ঘুমের জায়গা, প্রশিক্ষণের জায়গা, শিক্ষার জায়গা সবকিছুরই অভাব রয়েছে আমাদের।’

সবচেয়ে বড় কথা হলো, কেন্দ্রগুলোর বাজেট সীমিত। একজন শিশুর জন্য প্রতি মাসে বরাদ্দ মাত্র পাঁচ হাজার টাকা। যা তার শিক্ষা, চিকিৎসা এবং খাবারের জন্য যথেষ্ট নয়।

এ বিষয়ে নাসরিন বললেন, ‘যদি টাকাটা সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে শিশুরা খারাপ থাকে না। তবে বাজেট বাড়ানো গেলে খাবার ও প্রশিক্ষণের মান আরও ভালো হতে পারে।’

এসবের পাশাপাশি দেশের আইনি কাঠামোতেও বড় ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশে শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী শিশুদের রিমান্ডে নেওয়ার কোনো বিধান নেই। আইনের ৪৬ ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, শিশুর জবানবন্দি কেবল অভিভাবক, সমাজকর্মী বা প্রবেশন অফিসারের উপস্থিতিতে নেওয়া যাবে। কিন্তু দেখা যায়, প্রায়ই আদালত থেকে শিশুদের রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ আসছে।

শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রতি সপ্তাহেই আমরা এরকম ঘটনার মুখে পড়ি। অথচ শিশু আইনে রিমান্ড বলে কিছু নেই। কিন্তু বিচারকরা হাইকোর্টের একটি পর্যবেক্ষণ ব্যবহার করে রিমান্ড দিচ্ছেন। এটা সরাসরি শিশু অধিকারের লঙ্ঘন।’

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘২০১৩ সালে আইন হয়েছে, কিন্তু এখনো পর্যন্ত বিধিমালা হয়নি। এর ফলে বিচারকরা নানা অসামঞ্জস্য তৈরি করছেন। শিশুর বয়স উল্লেখ না করে পরোয়ানা পাঠানো, জামিন প্রক্রিয়ায় ভুল করা এসব আদালতের অসাবধানতা প্রতিনিয়ত ভোগাচ্ছে উন্নয়ন কেন্দ্রে থাকা শিশুদের।’

মুক্তির পর পর্যবেক্ষণের অভাবকেও বড় সমস্যা বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রবেশন অফিসার শাকিল মাহমুদ বলেন, ‘একটি শিশু জামিনে বাড়ি চলে গেলে তার আর কোনো খোঁজখবর রাখা হয় না। ফলে জানা যায় না সে ভালো পথে যাচ্ছে নাকি আবার অপরাধে জড়াচ্ছে।’

নামে উন্নয়ন কেন্দ্র হলেও বাস্তবতা হলো এর পরিবেশ অনেকটাই কারাগারের মতো। অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ, শিক্ষা এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই।

ইমরান বলেন, ‘এটি উন্নয়ন কেন্দ্র বলা হলেও বাস্তবে অভ্যন্তরীণ পরিবেশ, প্রশিক্ষণ, শিক্ষা, চিকিৎসা সব দিক থেকেই উন্নয়ন করা সম্ভব হয়নি। নাম উন্নয়ন দিলাম, কিন্তু ভেতরে জেলখানার পরিবেশই রয়ে গেছে।’

‘এটি এক ধরনের দ্বিচারিতা। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় শিশুদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সীমিত, মনোসামাজিক কাউন্সিলর বা শিশু সুরক্ষা সমাজকর্মীর অভাবও পুনর্বাসন কার্যক্রমকে প্রভাবিত করছে।’

শিশুদের পুনর্বাসন ও সমাজের সঙ্গে মিশে যাওয়ার জন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। সেইসঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সমন্বিত উদ্যোগও অপরিহার্য। পর্যাপ্ত বাজেট, বিশেষজ্ঞ জনবল, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করলে শিশুদের পুনর্বাসন কার্যকর করা সম্ভব।

শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র কেবল শাস্তির স্থান নয় বরং এটি হওয়া উচিত নতুন জীবনের সূচনাকেন্দ্র। এই বাস্তবতা অনুধাবন না করলে শুধু শিশুর অধিকার নয়, সমাজের ভবিষ্যৎও বিপন্ন হবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad