আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পুলিশ প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে প্রথমবারের মতো ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারদের লটারির মাধ্যমে বদলি করা হয়েছে। সোমবার বিকালে একযোগে বদলি করা হয়েছে দেশের ৫২৭ থানার অফিসার ইনচার্জকে, যারা পুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তা। তাদের অধিকাংশের বদলি হয়েছে রেঞ্জের ভেতরে অন্য জেলায়।
তবে থানায় ওসির দায়িত্ব না পাওয়াদের ভাগ্য খুলেনি এবারও। লটারির মাধ্যমে ওসি বদলির কথা বলা হলেও বদলি করা হয়েছে রেঞ্জের এক জেলা থেকে আরেক জেলায়। দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন এমন বদলির ঘটনায় খোদ পুলিশের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। এভাবে ভাগ্যের ওপর নির্বাচনী নিরাপত্তা ছেড়ে দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা।
স্বরাস্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সোমবার বিকালে স্বরাস্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মো. খোদা বখস চৌধুরী, ইন্সপেক্টর জেনারলে অব পুলিশ (আইজপি) বাহারুল আলম, সিনিয়র সচিব নাসিমুল গণি, অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) আওলাদ হোসেনসহ কয়েকজন কর্মকর্তার উপস্থিতিতে ৫২৭ থানার ওসি বদলি কার্যক্রম শুরু হয়। এতে রেঞ্জের এক জেলায় কর্মরত ওসিদের ওই রেঞ্জের অন্য জেলায় পদায়ন করা হয়। সেক্ষেত্রে জেলায় পদায়নের পর লটারি করে থানার জন্য নির্বাচিত করার সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন করা হয়। মঙ্গলবার তালিকার খসড়া প্রকাশ হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসেন টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, ওসি নিয়োগে সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার উপস্থিতিতে লটারি করা হয়। আগামি জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
শাহাদাত হোসেন বলেন, পুলিশ সদর দপ্তর ‘সৎ ও নিরপেক্ষ’ পরিদর্শকদের খোঁজ করে ফিটলিস্ট তালিকা তৈরি করা হয়। তালিকায় থাকা কর্মরত ওসিদের মধ্য থেকে রদবদল করে নতুন করে দায়িত্ব বন্টন করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মোজাম্মেল হক বলেছেন, এই মাধ্যমে পরিদর্শকদের জেলা বদল হয়েছে মাত্র। এতদিন যারা পোস্টিং না পেয়ে বঞ্চিত ছিলেন তাদের ভাগ্য খোলেনি।
এর আগে, গত ২৪ নভেম্বর রাতে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় লটারি করে এসপি নির্বাচন করা হয়। লটারির সময় ভারপ্রাপ্ত আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা ও প্রধান উপদেষ্টা কার্যালয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। পরে ২৬ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. মাহবুবুর রহমান সই করা এক প্রজ্ঞাপনে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারকে (এসপি) লটারির মাধ্যমে রদবদল করা হয়েছে।
পুলিশে এসবি, পিবিআই, ট্যুরিস্ট, নৌপুলিশসহ বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত একাধিক পরিদর্শক জানিয়েছেন, ৮টি মেট্রোপলিটনের থানা বাদে সব রেঞ্জের থানার ওসিদের একযোগে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র এক মাস আগে পোস্টিং পেয়ে কর্মস্থলে যোগ দেওয়া পরিদর্শকরাও রয়েছেন। এমন বদলির ঘটনায় তারা নাখোশ হয়েছেন। এতদিন ধরে বঞ্চিতরা তালিকায় নাম না দেখে ক্ষুদ্ধ হয়েছেন। তারা ওসি ফিটলিস্ট তালিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। দেশে মোট থানার সংখ্যা ৬৩৯টি। এর মধ্যে ৫২৭টি বিভিন্ন জেলায় এবং ১১০টি ৮ মহানগর এলাকায়।
বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) পরিদর্শক কামরুল হাসান তালুকদার বলেছেন, রেঞ্জ কেন্দ্রিক জেলায় বদলি করা হয়েছে। বড় জেলা হলে কয়েকজনকে ভিন্ন রেঞ্জেও বদলি করা হয়েছে। এ সময় পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না।
জেলা থেকে জেলা বদল
একাধিক পুলিশ পরিদর্শক জানিয়েছেন, এবারের বদলি মূলত রেঞ্জের মধ্যে জেলা থেকে জেলায় হয়েছে। অদলবদল প্রক্রিয়ায় প্রায় সব জেলা ধরে অন্য জেলায় পোস্টিং হয়েছে। এর মধ্যে শরীয়তপুর জেলায় কর্মরতরা চাঁদপুর, চাঁদপুর জেলার পরিদর্শকরা শরীয়তপুরে, মুন্সিগঞ্জে কর্মরতরা ঢাকা জেলায়, ঢাকা জেলা থেকে মুন্সিগঞ্জে, নারায়ণগঞ্জ থেকে গাজীপুরে এবং গাজীপুর থেকে নারায়ণগঞ্জে জেলা, ফরিদপুর জেলা থেকে খুলনায়, খুলনা থেকে ফরিদপুর, টাঙ্গাইল থেকে কিশোরগঞ্জ, চট্রগ্রাম থেকে কক্সবাজার ও কয়েকজনকে কুমিল্লা জেলায় পোস্টিং করা হয়েছে। এমনিভাবে সব থানার ওসিদের বদলি আদেশ হয়েছে। কাল-পরশুর মধ্যে তাদেরকে পদায়ন করা হবে বলে জানা গেছে।


