রানা প্লাজা ধসের দীর্ঘ ১২ বছর পার হলেও এখনো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত সাভারের সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও তাদের পরিবার। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে আটতলা রানা প্লাজা ধসে পড়ে, নিহত হন ১,১৩৮ জন শ্রমিক, আহত হন আরও অন্তত ১,৭৬৯ জন। অথচ বিশ্ব বিবেককে নাড়া দেওয়া এত বড় মানবিক বিপর্যয়ের আজও হয়নি সুবিচার।
আদালত সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়ের করা মোট ১৫টি মামলার মধ্যে বেশিরভাগই এখনো বিচারাধীন। এর মধ্যে রয়েছে একটি হত্যা মামলা, একটি ইমারত নির্মাণ আইনে মামলা, রাজউকের করা ভবন নির্মাণে অনিয়মের মামলা, দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি এবং শ্রম আইনে করা ১১টি ফৌজদারি মামলা। সাক্ষ্য গ্রহণের ধীরগতি, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ এবং আসামিপক্ষের আইনি কৌশল মামলাগুলোর বিচারকাজকে দীর্ঘায়িত করেছে।
হত্যা মামলাটি বর্তমানে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন, যেখানে ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ৯৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। আগামী ১৯ মে পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে। ইমারত নির্মাণ আইনের মামলাটি এখনো উচ্চ আদালতের আদেশ দাখিলের অপেক্ষায়। এ মামলার পরবর্তী শুনানি ৩১ আগস্ট নির্ধারিত হয়েছে।
অন্যদিকে, শ্রম আদালতে চলমান ১১টি মামলার মধ্যে চারটিতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার পর্যায়ে পৌঁছেছে, চারটির নোটিশ এখনো পত্রিকায় প্রকাশ হয়নি এবং বাকি তিনটির কজলিস্ট এখনো হালনাগাদ হয়নি।
ভবন নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের মামলায় দুদক ২০১৪ সালে গার্মেন্ট ভবন মালিক সোহেল রানা ও আরও ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। এই মামলায় ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্য ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে।
রানা প্লাজার ঘটনায় অভিযুক্ত ১৮ জনের মধ্যে একমাত্র প্রধান আসামি সোহেল রানা ছাড়া সবাই জামিনে মুক্ত আছেন। রানার জামিন উচ্চ আদালত স্থগিত করায় তিনি এখনো কারাবন্দি।
এই দীর্ঘসূত্রতায় ভুক্তভোগী পরিবার ও শ্রমিকদের মধ্যে ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ নিয়ে বেসরকারি সংস্থা ‘বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিস ট্রাস্ট’ (ব্লাস্ট) এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘দশক পেরিয়ে গেলেও এই ট্র্যাজেডির দায় কেউ নেয়নি, ক্ষতিপূরণ হয়নি, পুনর্বাসনও হয়নি।’
ব্লাস্ট ১০ দফা সুপারিশ দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি, গণমাধ্যমে অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ, দায়ী কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং জুরাইনে নিহতদের নামসহ স্মৃতিফলক স্থাপন।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, রানা প্লাজা ট্রাজেডির সুবিচার করার অর্থ শুধু একটি দুর্ঘটনার বিচার করা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের শিল্প ও শ্রমিক নিরাপত্তার ভবিষ্যতকে নিশ্চিত করবে। এর অন্যথায়, এই বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত রানা প্লাজা কেবল স্মৃতিতে নয়, রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার এক অমোচনীয় অধ্যায় হয়েই থাকবে।


