টাঙ্গাইলের জিআই পণ্য মধুপুরের আনারসের অতুলনীয় স্বাদ ও সুঘ্রাণ ফেরাতে কৃষকেরা এখন অর্গানিক পদ্ধতিতে বিষমুক্ত নিরাপদ আনারস চাষে ঝুঁকছেন। ভালো দাম পাওয়ায় পাহাড়ি অঞ্চলের চাষীদের মাঝে পরিবেশবান্ধব এই চাষ পদ্ধতি দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে।
বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে অসাধু চাষীরা অধিক লাভের আশায় মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করায় ঐতিহ্যবাহী এই ফলের সুনাম নষ্ট হতে বসেছিল। বাণিজ্যিক চাহিদাকে পুঁজি করে আনারসের আকার বড় করতে এবং অসময়ে বাজারজাত করতে নানা ধরনের ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করে আসছিলেন কিছু চাষী। বিশেষ করে রমজানকে লক্ষ্য করে ছোট-বড় গাছে একসঙ্গে ফুল আনার জন্য ‘সিজার’ নামক এক ধরনের বিশেষ রাসায়নিক মিশ্রণ স্প্রে করা হয়। এরপর ফল দ্রুত পাকানোর জন্য হরমোন প্রয়োগের মাত্র ১০-১২ দিনের মধ্যেই এই আনারস সম্পূর্ণ হলুদ বর্ণ ধারণ করে বিক্রির উপযোগী হয়ে ওঠে। বাহ্যিক দিক থেকে দেখতে আকর্ষণীয় হলেও এই হরমোনযুক্ত ফল মূলত বিষাক্ত উপাদানে পরিণত হয় এবং এর আসল স্বাদ পুরোপুরি নষ্ট হয়।
মধুপুরের ফুলবাগ চালা ইউনিয়নের হাগুড়া কুড়ী গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নিরাপদ আনারস প্রকল্পের সফল উদ্যোক্তা সোহেল রানা ক্ষেত থেকে ফল সংগ্রহ করছেন। গত বছর একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে চার বিঘা জমিতে হানিকুইন জাতের চারা রোপণ করেন তিনি।
সম্পূর্ণ অর্গানিক উপায়ে আঠারো মাস ধরে চলা এই প্রকল্পে ৫০ জন শ্রমিকের বেতনসহ তার মোট ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। ইতোমধ্যে তিনি ৫ লাখ ২৮ হাজার টাকার আনারস বিক্রি করেছেন সোহেল রানা। ক্ষেতের বাকি ফল থেকে আরও ৭০ হাজার টাকা আয়ের আশা করছেন তিনি। কেমিক্যালযুক্ত প্রতি পিস বড় আনারস যেখানে পাইকারিতে ২৫-৩০ টাকায় বিক্রি হয়, সেখানে সোহেল রানার অর্গানিক আনারস বিক্রি হচ্ছে ৪০-৪৫ টাকা দরে।
ভালো দাম পাওয়ায় সোহেল রানাকে দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্থানীয় চাষী মিজানুর রহমান সবুজ, রনি মিয়া ও কল্যাণ ম্যাথিউসহ শতাধিক কৃষক নিরাপদ চাষ শুরু করেছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকারেরা সরাসরি ক্ষেত থেকে এই ফল সংগ্রহ করেন। ‘এস আর ব্লগ বিডি’ ফেসবুক পেজের মাধ্যমে অনলাইনেও অর্ডার মিলছে।
প্রাকৃতিক ও কেমিক্যালযুক্ত আনারস চেনার উপায় জানিয়ে জুয়েল রানা বলেন, প্রাকৃতিকভাবে পাকা আনারসের গোড়া হলুদ ও ওপরের অংশ সবুজ থাকবে এবং কাটলে সুঘ্রাণ বের হবে। কিন্তু হরমোনযুক্ত ফল পুরো হলুদ হলেও তাতে কোনো আদি সুঘ্রাণ বা মিষ্টি স্বাদ থাকবে না।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘এসএসএস’-এর ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক সন্তোষ চন্দ্র পাল জানান, তারা পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের উন্নয়নে ‘স্মার্ট’ প্রকল্পের মাধ্যমে ১ হাজার ৮০০ জন সদস্যকে সহায়তা দিচ্ছেন। এই প্রকল্পের আওতায় কৃষকেরা এখন নিরাপদ আনারস চাষের মাধ্যমে নিজেদের আত্ম-কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে অত্যন্ত সফলভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন।
টাঙ্গাইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আশেক পারভেজ জানান, মধুপুর গড়ে জায়ান্ট কিউ, হানিকুইন ও আমদানিকৃত এমডি-২ জাতের আনারস চাষ হচ্ছে। চাষীদের মাত্রাতিরিক্ত হরমোন ব্যবহারের কারণে মানুষের লিভার ও কিডনি নষ্টসহ ক্যান্সারের মতো জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী রোগ হতে পারে। তাই এই ঐতিহ্যবাহী ফলের সুনাম ধরে রাখতে কৃষি বিভাগ কৃষকদের সবসময় কেমিক্যালমুক্ত চাষাবাদের উদ্বুদ্ধকরণ ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
তিনি জানান, বিশ্ববাজারে থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনের মতো বাংলাদেশও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বমানের আনারসজাত খাদ্যপণ্য উৎপাদন করে রপ্তানি বাড়াতে পারে। দেশের বেভারেজ কোম্পানিগুলো বিদেশে জুস রপ্তানি করছে। এই খাতের উন্নয়নে সরকারের কাছে নতুন প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলেও জানান আশেক পারভেজ।


