মহাপরিকল্পনার জটে আটকে আছে সিলেটের পর্যটন উন্নয়ন

মহাপরিকল্পনার জটে আটকে আছে সিলেটের পর্যটন উন্নয়ন
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের এক অনন্য লীলাভূমি সিলেট। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

একের পর এক উচ্চাভিলাষী মহাপরিকল্পনা আর সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে সিলেটের পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন। একদিকে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের পাঁচ বছর আগের মহাপরিকল্পনা এখনো ফাইলবন্দি হয়ে আছে, অন্যদিকে জেলা প্রশাসন নতুন করে আরও একটি মাস্টারপ্ল্যান হাতে নিয়েছে। এই দুই কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনার মধ্যে কোনো সমন্বয় না থাকায় মাঠ পর্যায়ে কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগছে না।

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের এক অনন্য লীলাভূমি সিলেট। পাহাড়ের গায়ে মেঘেদের লুকোচুরি, পিয়াইন ও ধলাই নদের স্বচ্ছ জলরাশি আর বিছানাকান্দি ও সাদাপাথরের আদিম পাথুরে সৌন্দর্য পর্যটকদের বিমোহিত করে। জাফলংয়ের ঝরণাধারা, লালাখালের নীল জল আর রাতারগুলের সোয়াম্প ফরেস্ট বা জলাবন এই অঞ্চলকে অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করেছে। চা-বাগানের সবুজ গালিচা আর দিগন্তজোড়া হাওরের জলজ সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন হাজারো ভ্রমণপিপাসু ছুটে আসেন দেশের এই প্রান্তে।

তবে এই অনিন্দ্য সুন্দর স্থানগুলোকে ঘিরে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে না ওঠায় পর্যটন কেন্দ্রগুলো দিন দিন তার জৌলুস হারাচ্ছে। পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এই জনপদে পর্যটন খাতের অপার সম্ভাবনা থাকলেও দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগ দুর্ভোগের কারণে বর্তমানে পর্যটকের সংখ্যা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে।

পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড প্রায় পাঁচ বছর আগে সিলেট, হবিগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল ও সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর—এই চারটি ক্লাস্টারে ভাগ করে ৭৮টি নতুন পর্যটন স্পট অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছিল। ট্যুরিজম বোর্ডের উপ-পরিচালক মো. মাজহারুল ইসলাম জানান, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই মহাপরিকল্পনাটি আবারও পর্যালোচনা করা হয়েছে। এখন এটি জাতীয় পর্যটন পরিষদের সভায় উপস্থাপন করে অনুমোদন ও বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সভা ডাকা সম্ভব হচ্ছে না। নতুন সরকার গঠন হলে এই সভা আয়োজন করা হবে।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ট্যুরিজম বোর্ড যখন কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার অপেক্ষায় আছে, তখন বিছানাকান্দি, সাদাপাথর, জাফলং, উৎমাছড়া, লালাখাল ও রাতারগুল নিয়ে পৃথক মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেছে সিলেট জেলা প্রশাসন। তাদের এই নতুন পরিকল্পনায় আধুনিক সড়ক যোগাযোগ, আবাসন, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সেবার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা রয়েছে।

আরও পড়ুন

জেলা প্রশাসনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গত সেপ্টেম্বরে অতিরিক্ত সচিব ড. আ. ন. ম বজলুর রশিদের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল সরেজমিনে পর্যটন কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করেন। এই দলে পরিবেশ বিজ্ঞান, স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনাবিদগণ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন যারা মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করেছেন।

জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাঈদা পারভীন জানান, পর্যটনকেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করে কাজ কিছুটা এগিয়েছে, কিন্তু কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পরিবর্তনের কারণে এখন পর্যন্ত কাজের সঠিক অগ্রগতি বলা সম্ভব হচ্ছে না।

তবে ট্যুরিজম বোর্ডের উপ-পরিচালক মাজহারুল ইসলাম জানান, জেলা প্রশাসনের  এই নতুন পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছুই জানে না ট্যুরিজম বোর্ড।

সরকারের দুই দপ্তরের এই সমন্বয়হীনতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় পর্যটন সংশ্লিষ্টরা। ট্যুরিজম ডেভেলপার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি মোহাম্মদ খতিবুর রহমান বলেন, পর্যটকরা ঘুরতে এসে হতাশ হয়ে ফিরলে পুরো শিল্পের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শুধু মাস্টারপ্ল্যান করলেই হবে না, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে পর্যটকদের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে।

সিলেট হোটেল অ্যান্ড গেস্ট হাউস ওনার্স গ্রুপের সাবেক সভাপতি সুমাত নূরী চৌধুরী জুয়েল বলেন, এর আগে সাদাপাথর নিয়ে করা একটি মাস্টারপ্ল্যানের কাজের উদ্বোধন হলেও পরে কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। তিনি বলেন, ‘মাস্টার প্ল্যান করার আগে আমাদের মতামত নেওয়া হয়। কিন্তু পরে আর কী হয় তা জানিনা।’ বারবার বড় মহাপরিকল্পনা না করে একটি পাইলট প্রকল্প ধরে দ্রুত কাজ শুরু করার তাগিদ দিয়ে সুমাত নূরী চৌধুরী বলেন, এতে অন্তত কোথায় ঘাটতি আছে তা বোঝা যাবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সমন্বিত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ছাড়া সিলেটের পর্যটনকে নতুন উচ্চতায় নেওয়া সম্ভব নয়। খাতা-কলমে অনেক বড় পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে সিলেটের পর্যটন এখনো তিমিরেই রয়ে গেছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad