‘এক রুট, এক বাস’ স্লোগানে ঢাকায় বাস পাল্টে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে যে কয়টি রুটে ফ্রাঞ্চাইজিভিত্তিক যেসব রুট চালু হয়েছে, সেখানে পরিবর্তন চোখে পড়া কঠিন।
মিনিবাস, ছোট দরজা, পুরোনো বাস, অনুমোদনের চেয়ে বেশি আসন, বাড়তি ভাড়া, যেখানে সেখানে যাত্রী উঠানামা-যেসব কারণে রাজধানীর যাত্রীরা নিত্যদিন ঠকে যান ও যাত্রাপথে ভোগেন, সেগুলোর অবসানের কোনো নমুনাই দেখা যায়নি এসব বাসে।
রোববার দুপুরে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রমের আওতায় এই বাস সেবার উদ্বোধন করেন পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস।
তবে ফার্মগেটে দাঁড়িয়ে থাকা গাজীপুরের টঙ্গীগামী যাত্রী ফরিদ ইসলামের প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘ভেবেছিলাম আরামদায়ক নতুন বাসে চড়ে যাব। কিন্তু পরে দেখি রং করে পুরনো বাসই নামানো হয়েছে। তার ওপর সড়কে বাস কমিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।’
ঘাটারচর থেকে বসিলা ও মিরপুর টেকনিক্যাল হয়ে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত চালু হওয়া পিপিবি সিটি সার্ভিস গঠিত হয়েছে আগে চলা প্রজাপতি, পরিস্থান ও বিকাশ পরিবহনের সমন্বয়ে।
চালক মো. আকাশ টাইমসকে বলেন, ‘নতুন বাস কেনার টাকা না থাকায় পুরোনো বাসই রং করে চালানো হচ্ছে।’
তিনি জানান, আগে এই তিন কোম্পানির মিলিয়ে প্রায় ৩০০টি বাস চলত, যা কমিয়ে ১৫০টি করা হয়েছে। যেসব বাসের নতুন রুট পারমিট মেলেনি, সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
যাত্রী তোলার জন্য কাউন্টার তৈরির কাজ এখনো শেষ হয়নি, তা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
মিরপুর চিড়িয়াখানা থেকে চুনকুটিয়া রুটে চালু করা হয়েছে ‘চিড়িয়াখানা সিটি পরিবহন’। তানজিল, মেট্রোলিংক ও দিশারী পরিবহনকে একীভূত করে এই রুটে ১৩৩টি বাস চালানো হচ্ছে।

চালক মো. আসলাম দাবি করেছিলেন গাড়িগুলো ‘সিটিং সার্ভিস’ হিসেবে চলবে। তবে কিছুক্ষণ পর ফার্মগেটে সেই বাসে দাঁড়িয়ে যাত্রী বহন করতে দেখা গেছে। বাসে কোনো ভাড়ার চার্ট ঝুলানো দেখা যায়নি।
চিড়িয়াখানাগামী আরেক যাত্রী ইউসরা খন্দকার বলেন, ‘ঢাকায় সরকারি যে ভাড়া, আদায় করা হয় তার থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি। এই বাসেও তো একই চিত্র। তাহলে কী পাল্টাল?’
তবে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম টাইমসকে বলেন, ‘নতুন কোনো ভাড়া হবে না, বিআরটিএর চার্ট অনুযায়ী নির্ধারিত ভাড়া চলবে।’
রুট রেশনালাইজেশন ব্যবস্থায় এই বাসগুলোর জন্য বেশকিছু নিয়মাবলী বেঁধে দিয়েছে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। শর্ত অনুযায়ী বাস পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, ভেতরে স্টপেজের তালিকা রাখতে হবে। চালক ও কর্মীদের পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা এবং যাত্রীদের সাথে সৌজন্যমূলক আচরণ করা বাধ্যতামূলক।
নির্ধারিত স্টপেজ ছাড়া যাত্রী তোলা-নামানো যাবে না, অতিরিক্ত যাত্রীর জন্য বেশি সময় অপেক্ষা করা যাবে না এবং সড়কে প্রতিযোগিতা বা নিয়মবহির্ভূত ওভারটেকিং নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
কিন্তু প্রথম দিনেই এসব শর্তের লঙ্ঘন চোখে পড়েছে।
নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে টাইমসকে বলেন, ‘উদ্যোগটি ভালো হলেও শুরুটাই হয়েছে অগোছালোভাবে। বাসে ভাড়ার চার্ট নেই, ফলে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে।’
নতুন বাস দিয়ে সেবা চালু নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘রং করলে বাসের বয়স কমে না, তাই বিআরটিএর মাধ্যমে এসব বাসের ফিটনেস পরীক্ষা করা উচিত।’
পরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, সরকার যদি এই ব্যবস্থার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না নেয়, তবে এই পুনরুজ্জীবিত ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল সফল হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
তিনি সরকারকে বিআরটিসিকে প্রধান অপারেটর বানিয়ে অন্তত দুই হাজার নতুন বাস দিয়ে শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।
আজিমপুর থেকে গাজীপুর রুটে নিয়মিত যাতায়াতকারী আলতাফ হোসেন বলেন, ‘এটা অনেক লম্বা রুট। কিন্তু বাসের অবস্থা খুবই নাজুক। ভেতরে বেশিরভাগ সিটই ভাঙা, কুশন উঠে গেছে। যানজটে দুই-তিন ঘণ্টা এ রকম সিটে বসে থাকলে কোমর ব্যথা হয়ে যায়।’
মিরপুর চিড়িয়াখানা থেকে মতিঝিল ও সদরঘাটমুখী বাসে নিয়মিত চলাচল করেন রোকেয়া বেগম। তিনি বলেন, ‘চিড়িয়াখানা সিটি সার্ভিসে সন্তানদের নিয়ে ওঠা খুব ঝামেলার। বাসের ভেতরের করিডোর সরু, আসনগুলোও গাদাগাদি করে বসানো। ব্যাগ নিয়ে হাঁটাই যায় না।’
ধানমন্ডি-মতিঝিল রুটের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলেন, ‘একেকটি বাসের জন্য ২০-৩০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। যে বাস আসে, সেটিও লোকাল বাসের মতো গাদাগাদি থাকে। ভোগান্তি পুরোপুরি কমেনি, শুধু ধরন বদলেছে।’
নতুন ব্যবস্থায় রুট বরাদ্দ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে কয়েকটি বাস কোম্পানিরও। ৩৬ বছর ধরে ফার্মগেট রুটে চলাচল করা রজনীগন্ধা পরিবহনের নাম পরিবর্তন করে থ্রি স্টার সিটি পরিবহন রাখা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠানটিকে কাঁচপুর রুট দেওয়া হয়েছে।
বাসের চালক মো. আমির বলেন, ‘রুট পরিবর্তনের কারণে আমাদের সমস্যা হচ্ছে। বিষয়টি সমাধানে বাসমালিক সমিতির মাধ্যমে আবেদন করা হয়েছে।’
তবে বাস সেবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, এটি ঢাকাবাসীর গণপরিবহনের ভোগান্তি কমাবে, শৃঙ্খলায় আসবে গোটা রাজধানী।
শিমুল বিশ্বাস বলেন, ‘ঢাকায় শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠলে দেশের জিডিপি ও প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক অবদান রাখবে।’
পাইলট প্রকল্পের ছয়টি রুট হলো গাজীপুরের শিববাড়ী থেকে আজিমপুর, টঙ্গী থেকে আজিমপুর, মিরপুর চিড়িয়াখানা থেকে কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া, মোহাম্মদপুরের ঘাটারচর থেকে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার, ঘাটারচর থেকে চিটাগাং রোড-কাঁচপুর, ঘাটারচর থেকে আব্দুল্লাহপুরের ধউর।
এসব রুটে নন-এসি বাস চলবে। আগে মোট ১৮টি কোম্পানি এই রুটগুলোতে যাত্রী পরিবহন করত। প্রতিটি রুটের বাসগুলো এখন একক কোম্পানির আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।
অন্যদিকে, মিরপুর-১ থেকে কাকলী-বনানী যে সার্কুলার রুট চালু হয়েছে, সেখানে চলবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস।
অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগর পুলিশ-ডিএমপির কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, নগরে ৯৮টি বাস বিভিন্ন ব্যানারে চলত। এসব বাসের মধ্যে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা, আগে যাওয়ার প্রবণতা, বিশৃঙ্খল চলাচল এবং দুর্ঘটনার কারণে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
এ কারণে রুট কমিয়ে ৩২টি করা হয়েছে এবং বিভিন্ন ব্যানারের বাসগুলোকে সেসব রুটের আওতায় একীভূত করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে চালক ও কন্ডাক্টররা চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থায় বেশি ট্রিপ দিয়ে বেশি আয় করার চেষ্টা করেন, যা মূল বিশৃঙ্খলার কারণ। এজন্য বাস মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের কাছে বেতনভিত্তিক চালক ও শ্রমিক নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
৩২টি রুটের পাশাপাশি আরও ২৫টি সার্কুলার বা চক্রাকার বাস রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব রুটে ২৭ আসনের এসি মিনিবাস চলবে। পাইলটিংয়ে পাঁচটি সার্কুলার রুট চালুর পরিকল্পনা থাকলেও মিনিবাস হাতে না আসায় একটি রুট চালু করা হয়েছে।
চালু হওয়া সার্কুলার রুটটিতে যাত্রী বহন করবে ‘ঢাকা চাকা’, যে কোম্পানির চেয়ারম্যান মন্টু মিয়া বলেন, ‘যাত্রীদের যেখানে-সেখানে নামার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। লোকাল বাসের মতো অবস্থা হলে চালকরা সুযোগ নেয়। তাই কাউন্টার ব্যবস্থা ঠিক থাকলে এটি সঠিকভাবে চলবে।’
ঢাকায় ফ্র্যাঞ্চাইজি-ভিত্তিক বাস নেটওয়ার্ক চালুর বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১৫ সালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ঘাটারচর-কাঁচপুর রুটে ঢাকা নগর পরিবহন চালুর মধ্য দিয়ে এর শুরু হয়। ২০২২ সালে আরও দুটি রুট চালু করে ৪০০টির বেশি এলোমেলো রুটকে ৪২টি রুটে আনার কলা বলা হয়েছিল। তবে আর্থিক ক্ষতির মুখে বেসরকারি অপারেটররা বাস তুলে নিলে সেবাটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।


