যে প্রজন্মের হাতে স্মার্টফোন, আঙুলের ডগায় পৃথিবীর সব তথ্য, ইউটিউব-ইনস্টা-ফেসবুক-টিকটকে অবাধ বিচরণ, সেই প্রজন্মের প্রায় অর্ধেকই এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য! তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতির যুগে এমন ফলাফল আপাতদৃষ্টিতে বিস্ময়কর মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও শিক্ষাগত বাস্তবতা। প্রশ্ন হচ্ছে, যে প্রজন্ম প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডিজিটাল পর্দায় নিমগ্ন থাকতে পারে, তারা কেন পাঠ্যবইয়ের সামনে মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না? স্মার্টফোন কি তাদের জ্ঞানের জানালা খুলেছে, নাকি অ্যালগরিদমের গোলকধাঁধায় আটকে দিয়ে কেড়ে নিয়েছে শেখার ধৈর্য, গভীর চিন্তা ও মনোযোগের সক্ষমতা? নাকি ব্যর্থতা আসলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার, যে ব্যবস্থা নতুন প্রজন্মকে বুঝতেই পারেনি?
বাংলাদেশের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার এবারের ফলাফল কেবল একটি পরীক্ষার ফল নয়; এটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, সামাজিক পরিবর্তন এবং নতুন প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক পরীক্ষার্থীই অকৃতকার্য। গত ২২ বছরের মধ্যে এত কম পাসের হার আর দেখা যায়নি। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৮৪-তে। ইংরেজিতে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জনের অকৃতকার্য হওয়া পরিস্থিতির গভীরতা আরও স্পষ্ট করেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, একটি প্রজন্মের শিক্ষাগত সক্ষমতা কি হঠাৎ করেই এতটা কমে গেল? নাকি শিক্ষার্থীরা যে সমাজে বড় হচ্ছে, তাদের অভ্যাস, চিন্তা, মনোযোগ ও তথ্য গ্রহণের ধরন বদলে গেলেও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি? যোগাযোগবিদ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এবারের ফলাফলকে একটি বৃহত্তর সামাজিক ও যোগাযোগগত সংকটের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
আজকের এই শিক্ষার্থীদের বোধবুদ্ধিপ্রাপ্তি ঘটেছিলো করোনা মহামারির সময়। তখন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে, তার পূর্ণাঙ্গ প্রতিকার আদৌ হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০২০ সালের মার্চ থেকে দীর্ঘ ১৮ মাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। বিকল্প হিসেবে টেলিভিশন ও অনলাইনভিত্তিক পাঠদানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটি সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি। বিশ্বব্যাংক ও ইউনিসেফের গবেষণায় উঠে এসেছে, ডিজিটাল সুবিধার অভাব এবং ঘরে বসে শেখার সীমাবদ্ধতার কারণে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী নিয়মিত পাঠদান থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল।
শিক্ষা কেবল বইয়ের বিষয়বস্তু মুখস্থ করার প্রক্রিয়া নয়। শ্রেণিকক্ষের পারস্পরিক যোগাযোগ, শিক্ষকের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, সহপাঠীদের সঙ্গে আলোচনা, প্রশ্ন করার অভ্যাস এবং নির্দিষ্ট সময়সূচির মধ্যে শেখার যে সংস্কৃতি, সেটিই প্রকৃত শিক্ষার ভিত্তি। মহামারি এই যোগাযোগব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললেও হারিয়ে যাওয়া শিখন-অভ্যাস পুনর্গঠনে কার্যকর উদ্যোগ কতটা নেওয়া হয়েছে, সেটি বড় প্রশ্ন।
উপরন্তু, মহামারির সময় সংক্ষিপ্ত সিলেবাস, পরিবর্তিত পরীক্ষা পদ্ধতি এবং বিভিন্ন ধরনের মূল্যায়ন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে একটি প্রজন্ম উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা দেওয়ার বাস্তবতার সঙ্গে অনেকেই মানিয়ে নিতে পারেনি। অথচ শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখন-ঘাটতি চিহ্নিত করে সেই অনুযায়ী পাঠদান ও মূল্যায়ন পুনর্গঠনের দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের।
বর্তমান কৈশোর প্রজন্ম বেড়ে উঠছে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি যোগাযোগপরিবেশে। তাদের কাছে তথ্যের উৎস আর কেবল পাঠ্যবই, সংবাদপত্র কিংবা শ্রেণিকক্ষ নয়। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম এবং অ্যালগরিদমনির্ভর ডিজিটাল কনটেন্ট তাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
যোগাযোগবিদ্যার ভাষায়, এটি মনোযোগ-অর্থনীতি বা এটেনশন ইকনমির বিস্তার। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখতে ব্যক্তিগত পছন্দ ও আচরণ অনুযায়ী ক্রমাগত নতুন কনটেন্ট হাজির করে। একটি ভিডিও শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী ভিডিও, একটি পোস্টের পর আরেকটি পোস্ট। অল্প সময়ে নতুন তথ্য, বিনোদন ও উত্তেজনা পাওয়ার এই অভ্যাস মস্তিষ্ককে দ্রুত উদ্দীপনার প্রতি অভ্যস্ত করে তুলতে পারে।
অন্যদিকে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা দাবি করে দীর্ঘ সময় ধরে একটি বই পড়া, জটিল বিষয় বোঝা, বিশ্লেষণ করা এবং একই বিষয়ে মনোযোগ ধরে রাখা। এই দুই অভ্যাসের মধ্যে স্পষ্ট সংঘাত রয়েছে। যে শিক্ষার্থী কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও, সংক্ষিপ্ত পোস্ট ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার জগতে অভ্যস্ত, তার কাছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাঠ্যবই নিয়ে বসে থাকা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এখানে জেনজি প্রজন্মের তথাকথিত ‘ইনস্ট্যান্ট’ সংস্কৃতির কথাও বিবেচনায় নিতে হবে। দ্রুত ফলাফল, তাৎক্ষণিক বিনোদন, সহজ সমাধান এবং অল্প পরিশ্রমে সাফল্য পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাদের একটি অংশের মধ্যে পড়াশোনার দীর্ঘমেয়াদি শৃঙ্খলাকে দুর্বল করছে। তবে প্রযুক্তি নিজে শিক্ষার শত্রু নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিক্ষার সহায়কও হতে পারে। সমস্যা তৈরি হয় যখন শিক্ষার্থী প্রযুক্তির ব্যবহারকারী না থেকে প্রযুক্তির মনোযোগ-নির্ধারণকারী অ্যালগরিদমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না; শিক্ষার্থীদের আত্মপরিচয়, অধিকারবোধ, কর্তৃত্ব সম্পর্কে ধারণা এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক তৈরি করেছে।
যোগাযোগবিদ্যার দৃষ্টিতে, এ আন্দোলন ছিল ডিজিটাল যোগাযোগ ও প্রত্যক্ষ সামাজিক সংহতির একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আন্দোলনের তথ্য, ছবি, ভিডিও, মতামত ও আবেগ ছড়িয়ে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। প্রচলিত গণমাধ্যমের বাইরে তরুণেরা নিজেদের বক্তব্য প্রকাশের নতুন পরিসর খুঁজে পেয়েছিল। ফলে তাদের মনোযোগ ও আগ্রহের কেন্দ্রেও পরিবর্তন এসেছে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক জেসমিন তাসলিমা বানু গণমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, পরীক্ষা নিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জুলাইয়ের সেই হিরোইজমের প্রভাব এখনো দেখা গেছে। এই পর্যবেক্ষণটি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে আত্মবিশ্বাস, প্রতিবাদী মানসিকতা ও সামাজিক সক্রিয়তা তৈরি হয়েছে, তা শিক্ষার্থীদের মনোজগতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এই পরিবর্তনকে সরাসরি পড়াশোনায় অনাগ্রহের সমার্থক মনে করা ঠিক হবে না। বরং প্রশ্ন হলো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি নতুন প্রজন্মের পরিবর্তিত সামাজিক অভিজ্ঞতা ও মনস্তত্ত্বকে ধারণ করতে পেরেছে? রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের পর শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক একাডেমিক জীবনে ফিরিয়ে আনা, মানসিক সহায়তা দেওয়া এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহ পুনর্গঠনের কোনো সুসংহত উদ্যোগ কি নেওয়া হয়েছিল? শিক্ষার্থীদের নতুন চিন্তাজগৎকে বুঝতে না পেরে পুরোনো নিয়মে তাদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে শিক্ষার সঙ্গে দূরত্ব আরও বাড়বে।
এবারের ফলাফলে সরকার ও শিক্ষার্থীদের দায় আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একদিকে ইংরেজি ও আইসিটিতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার পেছনে দক্ষ শিক্ষকের অভাব, ল্যাব ও ডিভাইসের সংকট, শ্রেণিকক্ষবিমুখতা এবং আর্থসামাজিক বৈষম্য রয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের একটি অংশের মধ্যে পড়াশোনার ধারাবাহিকতা, সময় ব্যবস্থাপনা, মনোযোগ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের ঘাটতিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আইসিটিতে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। যে প্রজন্ম প্রতিদিন স্মার্টফোন ব্যবহার করছে, তারা যদি আইসিটির প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় ব্যর্থ হয়, তাহলে বুঝতে হবে প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিতি এবং প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান এক বিষয় নয়। প্রযুক্তি ব্যবহার করা আর প্রযুক্তিকে বোঝা, বিশ্লেষণ করা কিংবা সৃজনশীলভাবে কাজে লাগানোর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
সরকারের দায়িত্ব কেবল পরীক্ষার আয়োজন ও ফল প্রকাশ নয়; শিক্ষার্থীদের উপযোগী শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করাও। আর শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব হলো স্বাধীনতা ও প্রযুক্তির সুযোগকে আত্মউন্নয়নের কাজে লাগানো। কোনো একটি পক্ষকে এককভাবে দায়ী করলে এই সংকটের প্রকৃত সমাধান পাওয়া যাবে না। এইচএসসির ফলাফল আমাদের সামনে এই মৌলিক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। সমাজ বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, যোগাযোগের মাধ্যম বদলেছে, তথ্য গ্রহণের অভ্যাস বদলেছে; কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থার বড় অংশ এখনো পুরোনো কাঠামোর মধ্যেই আটকে রয়েছে। শ্রেণিকক্ষে একমুখী বক্তৃতা, মুখস্থনির্ভর পাঠদান, পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন এবং প্রযুক্তিকে পাঠদানের অংশ না করে আলাদা একটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা দিয়ে নতুন প্রজন্মকে কার্যকর শিক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়।
এবারের ফলাফলকে তাই একটি প্রজন্মের ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করা সহজ, কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং এটি এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি, যে ব্যবস্থা নতুন ডিজিটাল সমাজ, নতুন প্রজন্ম, নতুন অভ্যাস ও নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে; কিন্তু তাদের শেখানোর পদ্ধতি বদলায়নি। এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা দূর করতে না পারলে আগামী দিনের পরীক্ষাগুলোতেও ফলাফলের এই সংকট ফিরে আসতে পারে।
গ্রিক পুরাণের ইকারুসের গল্প নতুন প্রজন্মের জন্য একটি সতর্কবার্তা। মোমের ডানায় ভর করে আকাশে ওড়ার আনন্দে ইকারুস ভুলে গিয়েছিল সীমার কথা; সূর্যের খুব কাছে গিয়ে তার পতন হয়েছিল। প্রযুক্তির ডানায় ভর করে তোমরাও এগিয়ে চলো, কিন্তু মনে রেখো—স্মার্টফোন যেন তোমাদের চালক না হয়ে ওঠে। অ্যালগরিদমের মোহে জ্ঞান, মনোযোগ ও চিন্তার স্বাধীনতা হারিয়ে ফেললে প্রযুক্তির জয় হবে, তোমাদের নয়।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


