এলডিসি উত্তরণে সময় বাড়ানো ব্যতিক্রমী ছাড়: দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

এলডিসি উত্তরণে সময় বাড়ানো ব্যতিক্রমী ছাড়: দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। ছবি: ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত একটি ব্যতিক্রমী ছাড় বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেছেন, এই বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে বাংলাদেশকে সংস্কার বাস্তবায়নে অসাধারণ সাফল্য দেখাতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে এটি অন্য কোনো দেশের জন্য নজির হিসেবে বিবেচিত হবে না।

রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গবেষণাপত্র উপস্থাপনকালে তিনি বলেন, ‘ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্তের জন্য অবশ্যই ব্যতিক্রমী সাফল্য দেখাতে হবে।’

গত সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সর্বসম্মতভাবে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তিন বছরের এই বাড়তি সময় দেওয়া হয়েছে বিশেষ ও ব্যতিক্রমী বিবেচনায়।

জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির সদস্য দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কমিটি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা আর কোনো সময়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব সমর্থন করবে না।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে বহিরাগত সংকটগুলোর প্রভাব আরও জটিল হয়েছে এবং এসব সংকট মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ পড়েছে বলে জাতিসংঘ স্বীকার করেছে।

দেবপ্রিয় বলেন, এলডিসি উত্তরণের বিদ্যমান কাঠামোয় কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনকে সময়সীমা বাড়ানোর কারণ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। ফলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নেওয়া সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত বিরল।

তার ভাষায়, ‘এখানে বিষয়টি রাজনৈতিক সদিচ্ছার নয়, সক্ষমতার। ২০২৪ সালেই বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের তিনটি শর্তই প্রয়োজনীয় সীমার চেয়ে অনেক বেশি ব্যবধানে পূরণ করেছে। ফলে এখন প্রশ্নটি আর যোগ্যতার নয়, বরং প্রস্তুতির।’

দেবপ্রিয় জানান, জাতিসংঘের প্রস্তাবে অর্থ মন্ত্রণালয়কে প্রতিবছর উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির কাছে অগ্রগতির প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ সংস্কারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জনের প্রত্যাশা জানানো হয়েছে।

ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী নির্ধারিত লক্ষ্য ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে সহায়তা করবেন বলেও জানান তিনি।

সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকারের প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিকে স্বাগত জানালেও সেটিকে অসম্পূর্ণ বলে মন্তব্য করেন এই অর্থনীতিবিদ।

তিনি বলেন, সরকারের বিজ্ঞপ্তিতে সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত যে ব্যতিক্রমী ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে, তা উল্লেখ করা হয়নি। একইভাবে উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির সংস্কারসংক্রান্ত প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরা হয়নি।

আরও পড়ুন

দেবপ্রিয় বলেন, ‘তিন বছরের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার, সেটি প্রকাশ করা হবে কি না কিংবা অন্য পরিকল্পনাগুলোর সঙ্গে এর সম্পর্ক কী, তাও বলা হয়নি।’

তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়কে নির্দিষ্ট লক্ষ্য, সময়সীমা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ উল্লেখ করে কর্মপরিকল্পনাটি প্রকাশের আহ্বান জানান।

সংস্কার কার্যক্রমের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে দেবপ্রিয় বলেন, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় কর রাজস্বের অনুপাত ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতের মোট বকেয়া ঋণের ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ ছিল খেলাপি।

একই অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানির ৮০ দশমিক ৬ শতাংশ এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। জিডিপির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগের হার ছিল ২১ দশমিক ৫ শতাংশ।

তিনি জানান, ১০ আগস্ট দেশে সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল তিন হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা সূচকে ১৩৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮তম।

দেবপ্রিয় বলেন, ‘বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতি ও পরিকল্পনা তৈরিতে যতটা দক্ষতা দেখিয়েছে, বাস্তবায়নে ততটা দেখাতে পারেনি।’

২০২১ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের সুপারিশ পাওয়ার চার বছর পর, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ মসৃণ উত্তরণ কৌশলের চূড়ান্ত দলিল প্রকাশ করেছে জানিয়ে চারটি ক্ষেত্রে সংস্কারের রূপরেখা তুলে ধরেন দেবপ্রিয়। এগুলো হলো- সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি, সামাজিক সুরক্ষা এবং পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা।

তিনি বলেন, এসব ক্ষেত্রে সংস্কার রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়ক হবে। এর মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা শক্তিশালী হবে।

মসৃণ উত্তরণ কৌশলের সমন্বয়ের দায়িত্ব অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্থানান্তরের সুপারিশ করেন দেবপ্রিয়। তার মতে, এই কৌশল বাস্তবায়নের সমন্বয় ইআরডির দায়িত্ব ও সক্ষমতার আওতার বাইরে।

একই সঙ্গে মসৃণ উত্তরণ কৌশল এবং ২০২৬ থেকে ২০২৯ সালের কর্মপরিকল্পনা জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের আহ্বান জানান তিনি। এলডিসি উত্তরণবিষয়ক একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের বিষয়টিও বিবেচনার প্রস্তাব দেন।

সংস্কারের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য সর্বসাধারণের ব্যবহারযোগ্য একটি তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণব্যবস্থা চালুরও সুপারিশ করেন দেবপ্রিয়। এতে মসৃণ উত্তরণ কৌশলের বিভিন্ন লক্ষ্য বাস্তবায়নের সর্বশেষ অবস্থা নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে।

এ ছাড়া শুধু স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য প্রযোজ্য সব ধরনের সুবিধা ও নীতিসহায়তা চিহ্নিত করার আহ্বান জানান তিনি। রপ্তানিতে নগদ প্রণোদনার মতো সুবিধাগুলো ২০২৯ সালের নভেম্বরের আগেই পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহারের জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সূচি নির্ধারণের পরামর্শ দেন।

বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে দেবপ্রিয় বলেন, অধিকাংশ আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আগামী তিন বছরের মধ্যে এসব আলোচনা শেষ করে চুক্তি সই ও অনুমোদনের কাজ সম্পন্ন করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্মত হওয়া বাণিজ্য আলোচনা, ফেব্রুয়ারিতে জাপানের সঙ্গে সই করা অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি এবং আঞ্চলিক ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে সেপ্টেম্বরে গঠিত কার্যদলের কথা উল্লেখ করেন। জাপানের সঙ্গে সই হওয়া চুক্তিটির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন এখনো বাকি রয়েছে।

দেবপ্রিয় আরও জানান, সিপিডির ‘বাংলাদেশ সংস্কার পর্যবেক্ষক’ উদ্যোগে এলডিসি উত্তরণের জন্য নতুন একটি বিভাগ যুক্ত করা হবে। সেখানে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও ব্যাংক খাতসহ মসৃণ উত্তরণ কৌশলের বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হবে।

২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রতিবছর এসব সংস্কারের বাস্তবায়ন পরিস্থিতি মূল্যায়ন করবে সিপিডি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad