মাগুরার মাঠজুড়ে এখন বৈপরীত্যের ছবি। আমের মুকুলে যে স্বপ্ন বুনেছিলেন চাষিরা, তীব্র দাবদাহে তা ফিকে হয়ে গেছে। তবে আমের এই বিষণ্নতার বিপরীতে আশার আলো ছড়াচ্ছে জেলার গর্ব ও জিআই পণ্য হাজরাপুরি লিচু।
মাগুরায় মৌসুমের শুরুতে আমের ব্যাপক মুকুল দেখে কৃষকরা আশান্বিত হয়েছিলেন। কিন্তু প্রকৃতির হঠাৎ রুদ্ররূপে আম বাগানে এখন শুধুই হাহাকার।
অন্যদিকে লিচু বাগানগুলো এখন থোকায় থোকায় ফলে ভরে উঠেছে, যা জেলার অর্থনীতিতে নিয়ে এসেছে এক নতুন প্রাণচাঞ্চল্য। নিবিড় পরিচর্যা আর অনুকূল আবহাওয়ায় লিচুর ফলন হয়েছে চোখে পড়ার মতো, যা গত কয়েক বছরের রেকর্ড ভাঙার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী জেলায় মোট ৬৬৯ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে শুধু সদর উপজেলার ৫৩১ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে জিআই পণ্য হাজরাপুরি জাতের লিচু। এ ছাড়া শালিখায় ৪৩ হেক্টর, শ্রীপুরে ৩৭ হেক্টর এবং মহম্মদপুর উপজেলায় ৫৮ হেক্টর জমিতে লিচু বাগান রয়েছে।
কৃষকরা চলতি বছর ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টন আগাম জাতের হাজরাপুরি লিচু আহরণের আশা করছেন। এই পরিমাণ লিচু থেকে প্রায় ৫০ কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলায় মোট এক হাজার ২৫৪ হেক্টর জমিতে আম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। তবে কৃষকদের মতে, প্রতিটি বসতবাড়িতে আম গাছ থাকায় প্রকৃত চাষের এলাকা আরও অনেক বেশি। অধিকাংশ বাগানে মুকুল ঝরে যাওয়ায় প্রত্যাশিত ফলন অনেক কমে গেছে।
সদর উপজেলার হাজরাপুর গ্রামের কৃষক মতিয়ার রহমান জানান, এ বছর লিচুর ফলন খুব ভালো দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তার বাগানে আমের দেখা নেই বললেই চলে। মতিয়ারের ১০ বিঘা জমিতে লিচু এবং ৩ বিঘা জমিতে আমের বাগান রয়েছে। কোনো বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে তিনি লিচু থেকে অন্তত পাঁচ লাখ টাকা আয়ের আশা করছেন। তবে আম বাগান থেকে তার এবার সম্পূর্ণ লোকসান হবে।
নারহাটি গ্রামের আরেক কৃষক আক্কাস আলী জানান, শুরুতে প্রচুর মুকুল আসায় তারা আমের ভালো ফলন আশা করেছিলেন। কিন্তু আকস্মিক গরমে মুকুলগুলো পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন নিজেরা খাওয়ার মতো আমও গাছে থাকবে কি না তা নিয়ে তিনি সন্দিহান।
অনেক কৃষক অভিযোগ করেছেন যে মুকুল আসার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তারা কৃষি বিভাগ থেকে সঠিক দিকনির্দেশনা পাননি।
মাগুরা হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. শাহীনুজ্জামান জানান, তাপমাত্রার আকস্মিক বৃদ্ধি এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবেই আমের এই করুণ দশা হয়েছে। তিনি চাষিদের পরামর্শ দিয়ে বলেন, মুকুল আসার শুরুতেই সঠিক ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হয়। এ ছাড়া ফল যখন মটরদানা বা মার্বেলের মতো হয় তখন সঠিক কীটনাশক প্রয়োগ করা জরুরি।
তিনি আরও জানান, এই জেলার লিচু চাষিরা বাগান ব্যবস্থাপনায় অনেক বেশি সচেতন। এই সচেতনতাই লিচুর বাম্পার ফলনের মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে।


