আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে পড়েছে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি। দলের উচ্চপর্যায়ের বারবার সতর্কবার্তা, আলোচনা এবং বহিষ্কার সত্ত্বেও অন্তত ৭৬ জন বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচনের মাঠে রয়ে গেছেন।
দলীয় সূত্র জানায়, এই প্রার্থীরা বিএনপির হাইকমান্ডের সরাসরি নির্দেশ অমান্য করে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে অস্বীকার করেছেন। তারা ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বেশ কিছু আসনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী লড়াই করছেন।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনার পর কিছু প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছেন। তবে দলের নেতারা স্বীকার করেন, প্রত্যাহারের এই সংখ্যা খুবই কম। দলের ভেতর থেকে অভিযোগ উঠেছে, মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় ত্রুটি এবং তৃণমূল পর্যায়ের জরিপ সঠিকভাবে মূল্যায়ন না করার কারণে এত বেশি বিদ্রোহী প্রার্থীর সৃষ্টি হয়েছে।
এই পরিস্থিতি দলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তবে বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা বলেছেন, প্রার্থীদের একবার বহিষ্কার করার পর তাদের সম্পর্কে দলের আর কিছু বলার থাকে না।
আরেকজন সিনিয়র নেতা সতর্ক করে বলেন, একই আসনে একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলে দলের জয়ের সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তিনি বলেন, এই বিদ্রোহীরা ধানের শীষের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ঠিক সেভাবেই প্রচারণা চালাবেন যেভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রার্থীরা করেন।
তিনি বলেন, যদি প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রার্থী এবং বিএনপির বিদ্রোহীরা একযোগে লড়াই করে, তবে ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন হবে। কারণ, বিএনপির ভোট ভাগ হয়ে চূড়ান্ত ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে জয়ের সম্ভাবনা থাকা প্রার্থীও সামান্য ব্যবধানে হেরে যেতে পারেন।
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, এই সংকট মোকাবিলায় দলের ভেতরে আলোচনা চলছে। তবে শেষ সময়ে বাস্তবিকভাবে কী করা সম্ভব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
বিদ্রোহী প্রার্থীদের নির্বাচন মিত্রদের সঙ্গে বিএনপির আসন ভাগাভাগির বিষয়টিকেও জটিল করে তুলেছে। আসন্ন সংসদ নির্বাচনের জন্য দলটি তার জোট সহযোগীদের ১৭টি আসন দিয়েছে। নির্বাচনী আইন (আরপিও) অনুযায়ী, নিবন্ধিত মিত্ররা তাদের নিজস্ব দলীয় প্রতীকে এবং অনিবন্ধিত মিত্ররা বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন।
নির্বাচনী কৌশলের অংশ হিসেবে বিএনপি মিত্র দলের বেশ কয়েকজন নেতাকে নিজেদের দলে এনে ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন দিয়েছে। সমঝোতা অনুযায়ী, জোটের আটজন শীর্ষ নেতা ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন। অন্যদিকে, ৬টি নিবন্ধিত মিত্র দলের নয়জন নেতা লড়ছেন তাদের নিজস্ব দলীয় প্রতীকে।
জোটের যে ১২টি দলকে আসন দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ছাড়া বাকি দলগুলো গত ১৭ বছর ধরে বিএনপির আন্দোলনের সঙ্গী ছিল। মিত্রদের ছেড়ে দেওয়া আসনগুলোতেও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা সরে দাঁড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
এরই মধ্যে চূড়ান্ত প্রার্থীদেরকে প্রতীক বরাদ্দ করা হয়েছে। ফলে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমার পর কেউ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেও ব্যালট পেপারে তার নাম ও প্রতীক রয়ে যাবে। বিএনপির কয়েকজন নেতা জানান, ভোটের দিন এটি অনেক ভোটারকে বিভ্রান্ত করতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে বিএনপির হাইকমান্ডের প্রতি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বেশ কয়েকজন দলীয় ও জোটের মিত্র দলের প্রার্থী। তাদের মতে, আগে থেকে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলে তাদের সংখ্যা কমে যেত।
এদিকে বিএনপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করার পরেও কিছু প্রার্থী নির্বাচনের মাঠে আছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির ঢাকা উত্তর মহানগর ইউনিটের সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব, যিনি ঢাকা-১২ আসনে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন। এ ছাড়া ঢাকা-১৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন দারুস সালাম থানা বিএনপির আহ্বায়ক এস এ সিদ্দিক সাজু।
বিএনপি ঢাকা-১২ আসনটি বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হককে দিয়েছে। অন্যদিকে, ঢাকা-১৪ আসনে ‘মায়ের ডাক’ নামের সংগঠনের সানজিদা ইসলাম তুলিকে ধানের শীষের প্রার্থী করা হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের নেতা জোনায়েদ সাকির বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন সাবেক এমপি আব্দুল খালেক। পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপি গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূরকে আসনটি ছেড়েছে। তবে ধানের শীষ না পেয়ে সেখানে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়াই করছেন হাসান মামুন।
রাশেদ খান, যিনি গণ অধিকার পরিষদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন, তিনি ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। এই আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ।
মানিকগঞ্জ-৩ (সাটুরিয়া-মানিকগঞ্জ সদর) আসনে বিএনপি মনোনীত আফরোজা খানম রিতার বিরুদ্ধে নিবৃাচন করছেন জেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি আতাউর রহমান আতা।
বিএনপি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনটি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সহসভাপতি জুনায়েদ আল হাবিবকে ছেড়ে দিয়েছে। তবে বিএনপির সাবেক সহকারী আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক রুমিন ফারহানা সেখানে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন।
এসব বিদ্রোহী প্রার্থীসহ সারা দেশে স্বতন্ত্র নির্বাচন করা অর্ধশতাধিক বিদ্রোহীকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি।
আসন সমঝোতার আওতায় নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাকে প্রথমে বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে ছাড় দেয় বিএনপি। সেখানেও বিএনপির একজন প্রার্থী রয়েছেন। এই আসনে মান্না ঋণখেলাপির অভিযোগে আইনি বাধার মুখে পড়েছিলেন, তবে পরে ছাড়পত্র পান। তিনি ঢাকা-১৮ আসনেও মনোনয়নপত্র জমা দেন, সেখানেও বিএনপির একজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
মাহমুদুর রহমান মান্না ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, ‘আমার আসনে বিএনপির প্রার্থী রয়ে গেছেন। এখন আর সমাধানের কোনো সুযোগ নেই। দলটি আমাকে উপেক্ষা করে তাদের প্রার্থীকে মনোনীত করেছে।’
এদিকে, বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মীর শাহে আলম বলেন, ‘দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। আসনটি কেন জোটকে দেওয়া হয়নি, তা কেবল দলই ব্যাখ্যা করতে পারবে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন বিদ্রোহী প্রার্থী ‘টাইমস’কে বলেন, তৃণমূলের জরিপ হয় ভুল ছিল অথবা তা উপেক্ষা করা হয়েছে। তাদের দাবি, হাইকমান্ড মনোনয়ন দেওয়ার আগে প্রার্থীদের সঠিকভাবে যাচাই করতে ব্যর্থ হয়েছে।
তবে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়ে অনড় বিএনপির হাইকমান্ড। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ‘টাইমস’কে বলেন, যারা বিদ্রোহী হিসেবে লড়ছেন তাদের বারবার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘দলের নির্দেশ মেনে অনেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বা সমঝোতায় পৌঁছেছেন। যারা তা করেননি, তাদের বহিষ্কারসহ কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছে।’
ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি এখন এই অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের রাজনৈতিক নেতিবাচক প্রভাব সামাল দেওয়ার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এই বিদ্রোহ আসন্ন সংসদ নির্বাচনে দলের জয়ের সম্ভাবনায় কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।


