একই দিনে গণভোট ও সংসদ নির্বাচন আয়োজনে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একই সঙ্গে দুই ভোট আয়োজনের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে ধারণা পেতে চলতি সপ্তাহেই মহড়া বা মক ভোট আয়োজন করতে যাচ্ছে ইসি।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে কখনো গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন একদিনে হয়নি। ফলে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কোনো কর্মকর্তার এনিয়ে অভিজ্ঞতা নেই। এছাড়া এএমএম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন কমিশনেরও জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচন আয়োজনের অতীত অভিজ্ঞতা নেই। ফলে একই সঙ্গে দুই ভোট ইসিকে চাপে ফেলেছে।
ইসি মনে করছে, একই সঙ্গে দুই ব্যালটে ভোট দিতে প্রায় দ্বিগুণ সময় লাগতে পারে। এতে ভোটকেন্দ্রে ভিড় বাড়বে এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। এসব সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করতে এবং সেগুলোর সমাধান খুঁজতে মক ভোট আয়োজন করা হচ্ছে। মক ভোটের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই নির্বাচন আয়োজনের নকশা চূড়ান্ত করবে কমিশন।
ইসি সূত্র জানায়, ভোটদানে বাড়তি সময় ও ভোটকেন্দ্রের ভিড় সামাল দিতে ভোটকক্ষ বাড়ানো হবে নাকি ভোটগ্রহণের সময় বাড়ানো হবে-এই দুটি বিকল্পই পর্যালোচনা করছে কমিশন। তবে শীতকালে সময় বাড়ালে ভোটদান পর্ব রাত পর্যন্ত গড়াতে পারে, যা ইসির কাছে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হচ্ছে।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একজন ভোটার তিনটি পদে তিনটি ব্যালটে ভোট দেন বলে ৩০০ থেকে ৪০০ ভোটারের জন্য একটি ভোটকক্ষ রাখা হয়। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিকক্ষে ৫০০-৬০০ ভোটার ধরা হয়েছে। এবার দুই ধরনের ভোট একসঙ্গে নেওয়া হবে বলে প্রতিকক্ষে ভোটার সংখ্যা কমিয়ে ৪০০-৫০০ করার চিন্তা চলছে। আর ভোটকক্ষের সংখ্যা আরও ৪২ হাজার বাড়তে পারে।
এছাড়া গণভোট আয়োজনের অভিজ্ঞতা না থাকায় ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হবে। এদিকে ভোটদান ও গণনা সহজ করতে গণভোটের জন্য আলাদা রঙের ব্যালট ব্যবহারের ব্যবস্থা রেখে গণভোটের অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে উপদেষ্টা পরিষদ। গণভোটের ব্যালট সবুজ বা গোলাপি হতে পারে। এছাড়া পোস্টাল ব্যালটেও গণভোট দেওয়া যাবে।
অতিরিক্ত ব্যালট বাক্স প্রসঙ্গে ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে কমিশনের হাতে প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার ব্যালট বাক্স রয়েছে। সাধারণত সংসদ নির্বাচনে ২ লাখ ৮৮ হাজারের মতো বাক্স লাগে। সে হিসেবে ৫০ হাজারের বেশি বাক্স অতিরিক্ত আছে। বুথ ৪০ থেকে ৪২ হাজার বাড়ালেও ব্যালট বাক্সের ঘাটতি হবে না।
এদিকে আগামী ২৯ নভেম্বর রাজধানী ঢাকায় মক ভোট আয়োজন করার প্রস্তুতি নিয়েছে নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট(ইটিআই)। আগারগাঁওয়ের শেরে বাংলা নগর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় অথবা ইসির নিকটবর্তী কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই পরীক্ষামূলক ভোট অনুষ্ঠিত হবে। এখানে বয়স্ক, গর্ভবতী নারী ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ভোটকক্ষে কী ধরনের ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হয়, সেটাও পরীক্ষা করা হবে। এছাড়া কিভাবে ভোট নেওয়া হয়, কত সময় লাগে, যাবতীয় কার্যক্রম দেখবে কমিশন।
ইসির অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, একইসঙ্গে দুটি ভোট আয়োজন করায় ইসির কর্মযজ্ঞ বেড়েছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো-নির্ধারিত সময়ে ভোট শেষ করা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখা। এজন্যই পরীক্ষামূলক ভোটের আয়োজন করা হচ্ছে। এর ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। সময় বেশি লাগলে বুথ বাড়ানোর সিদ্ধান্তও আসতে পারে। এছাড়া, নতুন করে ব্যালট বাক্স ও পেপার কেনার প্রয়োজন হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, ভোট আয়োজনের জন্য ইসির হাতে যথেষ্ট ব্যালট বাক্স মজুত রয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে আয়োজন না করে কেন ঢাকায় পরীক্ষামূলক ভোট করা হচ্ছে, যেখানে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অশিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বেশি-এমন প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত সচিব বলেন, ঢাকায় সব ধরণের মানুষই বসবাস করে। শহরের বস্তিতে বসবাসরত মানুষ, শিক্ষার্থীসহ সকল শ্রেণী-পেশার মানুষকে মক টেস্টে ভোট দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হবে।
একইদিনে দুই ভোট চ্যালেঞ্জিং জানিয়েছেন খোদ সিইসি। তিনি বলেন, একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট করার এমন মুখোমুখি পরিস্থিতিতে পূর্ববর্তী নির্বাচন কমিশন কখনো হয়নি। আগের নির্বাচন কমিশনকে এতটা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়নি, যা বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. মো. আব্দুল আলীম বলেন, আগামী নির্বাচন খুবই চ্যালেঞ্জিং হবে। প্রথম চ্যালেঞ্জ লজিস্টিক্যাল। দুই ধরণের নির্বাচনের জন্য দুইটা ব্যালট বাক্স দিতে হবে, দুই সেট ব্যালট পেপার প্রিন্ট করতে হবে, এটাও চ্যালেঞ্জিং কাজ। কমিশন যেভাবে ভোটকেন্দ্র এবং ভোট কক্ষের তালিকা করেছে, সেটিও রিভাইস করতে হবে। সময় মতো ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করা চ্যালেঞ্জ।
এছাড়া, রাজনৈতিক দলগুলো প্রত্যেক গণভোটে একটা রোল প্লে করে। এখন তারা সংসদ নির্বাচন নাকি গণভোট-কোনটাকে অগ্রাধিকার দেবে সেটাও একটা চ্যালেঞ্জ। পাইলটিং না করে প্রবাসীদের ভোট নেওয়াও চ্যালেঞ্জ মনে করছেন তিনি।


