ট্রাম্পের ‘পাগলামি’ এড়াতে সমুদ্রযাত্রার স্বপ্নভঙ্গ

ট্রাম্পের ‘পাগলামি’ এড়াতে সমুদ্রযাত্রার স্বপ্নভঙ্গ
এমভি ওডিসি। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান
Advertisement
Advertisement

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অস্থির গোলমেলে রাজনীতি থেকে তারা পালাতে চেয়েছিলেন। ঠিক করেছিলেন ট্রাম্পের মেয়াদকালে আর ডাঙ্গায় থাকবেন না, ঘুরে বেড়াবেন সাগর-মহাসাগরে। কিন্তু ট্রাম্প তাদের পিছু ছাড়ছেন না। ঠিক যেন সেই বাংলা প্রবাদের মতো: আমি কাঁথা ছাড়তে চাইলেও কাঁথা আমাকে ছাড়ে না।

ঘরের চাবি বাইরে থেকে তালাবন্ধ করে, জীবনের সব বাঁধাধরা হিসাব-নিকাশ পেছনে ফেলে যারা সমুদ্রের বুকে ঘর বেঁধেছিলেন—তারা কি কখনো ভেবেছিলেন এই রূপকথার সমাপ্তিটা এমন এক অপ্রত্যাশিত ও অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে হবে?

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের কোলাহল আর চিরচেনা ডাঙার নানা চাপ এড়িয়ে জীবনের একটি দীর্ঘ সময় মহাসমুদ্রের নীল জলরাশিতে কাটিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন দুই শতাধিক মানুষ। কিন্তু ট্রাম্পের রাজনৈতিক হট্টগোল থেকে বাঁচতে সমুদ্র ভ্রমণে নেমে খোদ সেই ট্রাম্পের শুরু করা যুদ্ধের কবলেই পড়ে তাদের এই বিলাসবহুল প্রমোদতরী ‘এমভি ওডিসি’ এখন কম্বোডিয়ার সিহানুকভিল বন্দরে এসে অপ্রত্যাশিতভাবে থমকে দাঁড়িয়েছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট শুরু হয়েছিল এক অদ্ভুত রাজনৈতিক ও মানসিক তাড়না থেকে। তখন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় আসা প্রায় নিশ্চিত। তবে সেই পটপরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে ট্রাম্পের রাজনৈতিক কাণ্ডকীর্তিতে চরমভাবে হাপিয়ে ওঠেছিলেন একদল বিত্তশালী মানুষ।

ঠিক ওই সময়ে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্ট থেকে যাত্রা করে ‘এমভি ওডিসি’ নামের এক বিলাসবহুল জাহাজ। এর মালিক যুক্তরাষ্ট্রেরই ফ্লোরিডাভিত্তিক কোম্পানি ‘ভিলা ভিয়ে রেসিডেন্সেস’। ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে হাপিয়ে ওঠা বিত্তশালীদের টার্গেট করে তারা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চার বছর মেয়াদের পুরোটা সময় বিলাসবহুল ক্রুজ শিপ ‘এমভি ওডিসি’তে সমুদ্রে ঘুরে বেড়ানোর অফার নিয়ে হাজির হয় এই কোম্পানি।

বিত্তশালীদের জন্য ‘সস্তায়’ চার বছর ধরে এক বন্দর থেকে আরেক বন্দরে নোঙর করে নতুন নতুন জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন দেখার পাশাপাশি প্রায় পুরো বিশ্ব ভ্রমণ। এ যেন ডাঙ্গার রাজনৈতিক কোলাহল আর ট্রাম্পের পাগলামি থেকে বাঁচার এক বিকল্প জীবনধারা।

এমভি ওডিসিতে যাত্রী। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

চার বছরের এই সমুদ্রযাত্রায় ‘এমভি ওডিসি’র দুজনের জন্য প্রতিটি কেবিনের বুকিং মূল্য ধরা হয় ৩ লাখ ১৯ হাজার ৯৯৮ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় অঙ্কটি প্রায় চার কোটি টাকা। এর সাথে যোগ হবে প্রতি মাসের আনুসঙ্গিক আরও কিছু ভাড়া, যার বিনিময়ে মিলবে সমুদ্রে ভাসমান ফাইভ-স্টার হোটেলের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা।

আরও পড়ুন

এই প্রমোদতরীর যাত্রীদের সিংহভাগই ছিলেন আমেরিকান নাগরিক। তাদের একটি বড় অংশ  কর্মজীবন থেকে অবসর নেওয়া মানুষ। আরও একদল আছেন ‘ডিজিটাল যাযাবর’, যারা বিশ্ব ঘুরে বেড়ানোর সময় ল্যাপটপে ধুর থেকে অফিস বা ব্যবসায়ের কাজ করেন।

আবার এই যাত্রীদের মাঝে এমন মানুষও ছিলেন যারা সবকিছু ছেড়ে পাকাপাকিভাবে সমুদ্রে থিতু হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তেমনি একজন হলি হেনেসি নামের এক নারী, যিনি তার আদরের পোষা বিড়াল ‘ক্যাপ্টেন’কে সঙ্গে নিয়ে জাহাজ ছাড়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে এই ভাসমান ঠিকানাতেই আনন্দের সাথে বসবাস করছিলেন।

এছাড়া জাহাজের কেবিনটি নিজেদের পছন্দমতো কার্পেট বিছিয়ে এবং দেওয়ালে ছবি টাঙিয়ে আস্ত এক বাড়ি বানিয়ে নিয়েছিলেন কেইট কাসিংহাম ও তার স্বামী র‍্যান্ডি’র মতো কয়েকজন যাত্রী। জাহাজের ভেতরে যাত্রীদের জন্য ছিল বিশাল সুইমিং পুল, রোমাঞ্চকর পিকলবল কোর্ট, জিম, ঝকঝকে থিয়েটার, একাধিক অভিজাত বার এবং নামী-দামী রেস্তোরাঁ।

তবে যেই ‘পাগল’ ট্রাম্পের ‘পাগলামি’ থেকে মুক্তি পেতে এই সমুদ্রযাত্রা, শেষ পর্যন্ত সেই ট্রাম্পের কারণেই ওলটপালট হয়ে গেছে সব হিসাব-নিকাশ। ট্রাম্প প্রশাসনের শুরু করা যুদ্ধেরই সরাসরি কবলে পড়লেন তারা। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের ইরানে হামলা এবং সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের বাজারে তৈরি হয় চরম অস্থিরতা। জাহাজে ব্যবহার করা মেরিন ফুয়েল অয়েলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে। কোম্পানির হিসাব অনুযায়ী, এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে যে কেবিনের মাসিক জ্বালানি খরচ একসময় ছিল মাত্র ১,৮০০ ডলার, তা হঠাৎ করেই আকাশচুম্বী হয়ে পৌঁছায় ৮,০০০ ডলারে।

জাহাজ কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ জানায়, এই জ্বালানি শক বা মূল্যবৃদ্ধির ফলে তারা সম্পূর্ণ ‘অস্থির আর্থিক চাপের’ মুখে পড়েছে। প্রথমে খরচ সামলাতে জাহাজের গতি কমিয়ে দেওয়া হয়, বন্ধ করে দেওয়া হয় নতুন নতুন বন্দরে যাত্রা। এক বন্দরেই লম্বা সময় কাটিয়ে দেয় ‘এমভি ওডিসি’। তবে এতেও শেষ রক্ষা হয়নি। কোম্পানির মূল তহবিল সম্পূর্ণ ফুরিয়ে যাওয়ায় হঠাৎ করেই সমুদ্রযাত্রা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিতের ঘোষণা আসে।

শেষ পর্যন্ত জাহাজটি কম্বোডিয়ার সিহানুকভিল বন্দরে এসে পৌঁছায়। গত সপ্তাহের মঙ্গলবার ভিলা ভিয়ে রেসিডেন্সেসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা পুনরায় তহবিল সংগ্রহের নানা বিকল্প নিয়ে কাজ করছে। আগামী আগামী ৬০ দিনের মধ্যে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হবে।

এমভি ওডিসির যাত্রী শেরি কর্নেট। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

তবে এরই মধ্যে হঠাৎ করে যাত্রীদের জাহাজ থেকে নেমে যাওয়ার নোটিশ দেওয়া হয়। শেরি কর্নেট নামের এক যাত্রী ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, তাদের কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া মাঝপথে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। জাহাজ কোম্পানি কোনো আর্থিক সহায়তা বা হোটেলের তালিকা পর্যন্ত সরবরাহ করেনি।

কেইট কাসিংহামের মতে, যাত্রীরা সম্পূর্ণ স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ ও কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। তবে জাহাজ  কোম্পানি জানিয়েছে, তারা যাত্রী ও ক্রুদের সাময়িক আবাসন ব্যবস্থা এবং পরবর্তীতে নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য লজিস্টিক সমন্বয়ের কাজ করছে। যাত্রীদের যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নিতে বিমান চার্টার করার কথাও জানায় তারা।

কম্বোডিয়ার সমুদ্র সৈকতে দাঁড়িয়ে থাকা এই হতভাগ্য মানুষগুলোর চোখ আজ দিগন্তের দিকে—যেখান থেকে হয়তো আর কোনো জাহাজ তাদের ফেরার ডাক দিতে আসবে না। উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্ট বন্দর থেকে যে স্বপ্নের ডানা মেলেছিল, ট্রাম্পের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও তার সূচনা করা যুদ্ধের আঁচ থেকে বাঁচতে চাওয়া সেই মানুষগুলোর প্রমোদতরী যাত্রা বিশ্ববাসীর সামনে এক অদ্ভুত সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে। রূপকথার মতো শুরু হওয়া সমুদ্রের সেই বিলাসবহুল জীবনযাত্রা শেষ পর্যন্ত বিশ্বরাজনীতির নিষ্ঠুর কষাঘাতে পরিণত হলো দুঃস্বপ্নে।

(দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে)

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad