নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবদুল হামিদ গৃহস্থালী বর্জ্য নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। গত ১৩ দিন ধরে তার বাসায় ময়লা নিতে কেউ আসে না। আশপাশের বাসাবাড়ির ফেলা ময়লায় এলাকার বিভিন্ন স্থান এখন অনেকটা ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘সবাই বাসার আশেপাশে খাল বিলে ময়লা ফেলছে।’
এই অবস্থা কেন হলো? তিনি বললেন, ‘আগে একজন ময়লা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন। শুনেছি এখন তার চেয়ে বড় নেতা এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করবেন। এমন করতে গিয়ে এই ভোগান্তিতে পড়েছি আমরা।’
রাজধানী ঢাকাতেও প্রায়ই বিভিন্ন এলাকায় কখনো সাত দিন, কখনো ১০ দিন বা তার চেয়ে বেশি সময় ধরে গৃহস্থালী বর্জ্য নিতে না আসার ঘটনা ঘটছে। নগরবাসীকে চাপ দিতে এই কাজগুলো করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। বাড্ডার বাসিন্দা ইমরান হোসেন মিলন যাকে ‘ময়লা সন্ত্রাস’ আখ্যা দিয়েছেন।
২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের আগে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সে সময়ের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। পট পরিবর্তনের পর ধীরে ধীরে তা চলে গেছে বিএনপি ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের হাতে।
নগরবাসীর অভিযোগ, নতুন নিয়ন্ত্রকরা সিটি করপোরেশনের বেঁধে দেওয়ার মূল্যসীমা মানতে চাইছেন না। যে নেতা যে এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন, সেখানে তার ইচ্ছা অনিচ্ছার ওপর নগরবাসীকে নির্ভর করতে হয়। দাবি করা টাকা না দিলেই এভাবে ময়লা নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, একটি ফ্ল্যাট থেকে বাসাবাড়ির প্রাথমিক বর্জ্য সংগ্রহ বাবদ মাসে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা নেওয়া যাবে। বেসরকারি প্রাথমিক বর্জ্য সংগ্রহকারী সেবা প্রতিষ্ঠানের (পিসিএসপি) সঙ্গে হওয়া চুক্তিতেও এই সীমা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।
কিন্তু মাঠের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। ফ্ল্যাটপ্রতি ১২০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। অভিজাত এলাকায় একেকটি বহুতল বাড়িতে আড়াই থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা দাবি করা হচ্ছে। টাকা না দিলে ময়লা নেওয়া হচ্ছে না।
ছোট দোকান থেকে নেওয়া হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, আর বড় রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রে আদায় করা হচ্ছে দুই হাজার টাকারও বেশি। অনেক ক্ষেত্রে কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এই ফি।
মহাখালীর স্কয়ার এলাকার বাসিন্দা সৌরভ হোসেন জানান, দুই মাস আগে হঠাৎ করেই তাকে জানানো হয়, এখন থেকে ময়লা সংগ্রহ বাবদ ২০০ টাকা দিতে হবে। এরপর তার হাতে একটি রশিদ ধরিয়ে দেওয়া হয়।
‘কিন্তু সেই রশিদে সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কোনো ঠিকানা বা যোগাযোগের তথ্য ছিল না। কেন টাকা বাড়ানো হলো, সে বিষয়ে জানারও কোনো সুযোগ নেই,’ বলেন তিনি।
তেজগাঁও বেগুনবাড়ি এলাকার বর্জ্য সংগ্রাহক আসলামের বক্তব্যে উঠে আসে আদায়ের এই খেয়ালিপনার তথ্য। তিনি বলেন, ‘আমরা বাসা থেকে ২০০ টাকা করে নিই। তবে যার কাছ থেকে যেভাবে আদায় করা যায়, সেভাবেই নিই। কম দিলে আমি ময়লাই নেব না।’
টাকা না দিলে অনেক ভ্যানই আসে না বাসাবাড়ির সামনে—এমন অভিযোগও করেছেন একাধিক বাসিন্দা।
এই বাড়তি অর্থের সবচেয়ে বড় অংশ কোথায় যাচ্ছে, তার কোনো স্বচ্ছ হিসাব পাওয়া যায়নি সিটি করপোরেশনের কাছে।
কল্যাণপুর এলাকার বর্জ্য সংগ্রাহক সবুজ মিয়া জানান, ১১ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্য পাইকপাড়া ও দারুস সালাম রোডের একাংশে প্রতিদিন প্রায় ৮০টি বাড়ির প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ ফ্ল্যাট থেকে তিনি এবং তার সহকারী ময়লা সংগ্রহ করেন। প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে মাসে আদায় করা হয় ১৫০ টাকা করে।
সেই হিসাবে শুধু তার সংগ্রহ করা এলাকা থেকেই মাসিক আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় দেড় লাখ টাকার উপরে। অথচ তার নিজের বেতন মাত্র ১২ হাজার টাকা। আর সহকারী পান ৮ হাজার টাকা।
আসলাম বলেন, ‘আমরা শুধু কাজ করি, বেতন পাই। সংসার চালাই। পেটের দায়ে কাজ করি।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ডে প্রাথমিক বর্জ্য সংগ্রহের দায়িত্ব টেন্ডারের মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া হয়েছে ২০২৪ সালের পর। এই কাজ পেতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১৫ থেকে ১৭ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানত জমা দিতে হয়।
শুধু অতিরিক্ত টাকা আদায় নয়, নির্ধারিত অর্থ দেওয়ার পরও নিয়মিত সেবা না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন এলাকায়।
কামরাঙ্গীরচরের ঘিঞ্জি গলিতে বাড়ির সামনে জমে থাকা ময়লার স্তূপ পেরিয়ে ঢুকতে হয় মাঝি বেল্লাল মোল্লার বাসায়। প্রতি মাসে নিয়ম করে ১০০ টাকা বিল দেন তিনি—সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত হারেই। কিন্তু বিনিময়ে যে সেবা পাওয়ার কথা, সেটাই মেলে না নিয়মিত।
‘বাড়িতে তিন-চারদিন পর পর ময়লার গাড়ি এসে ময়লা নিয়ে যায়। অন্য সময় বাড়ির সামনে ময়লা রাখার স্থানে গন্ধে নাক বন্ধ হওয়ার উপক্রম, আর যদি এর মধ্যেই বৃষ্টি হয়, তাহলে ময়লা পানির সঙ্গে বাড়ির ভেতরেও চলে আসে,’ বলেন তিনি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। সেখানে একাধিক এলাকায় বৈধ টেন্ডার ছাড়াই প্রভাবশালী একটি চক্র এলাকা ভাগ করে বর্জ্য সংগ্রহ করছে বলে অভিযোগ করেছেন বাসিন্দারা।
উত্তর সিটির প্রশাসকের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নতুন কোনো টেন্ডার কার্যক্রম চালু নেই এবং আগের ব্যবস্থাগুলো তার দায়িত্ব নেওয়ার আগে থেকেই চালু ছিল। জনস্বার্থে পুরো ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
তবে এসব হুঁশিয়ারি ও প্রতিশ্রুতির পরও মাঠপর্যায়ের চিত্র বদলায়নি বলেই জানাচ্ছেন ভুক্তভোগী বাসিন্দারা।
বর্জ্য সংগ্রহ নিয়ে বিরোধের খেসারত দিতে হয়েছে শাহজাদপুরের ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের। জুলাইয়ের শেষ দিকে টানা ১০ দিন এলাকায় বর্জ্য সংগ্রহ না হওয়ায় রাস্তায় জমে যায় ময়লা, ছড়িয়ে পড়ে দুর্গন্ধ এবং বাড়ে মাছির উপদ্রব।
স্থানীয় বাসিন্দা ইমরান হোসেন মিলন বলেন, ‘শুনেছি দুপক্ষের বিরোধের কারণে কর্মীরা ময়লা নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন।’
বর্জ্য সংগ্রহের নিয়ন্ত্রণ ঘিরে বিরোধ যে শুধু নাগরিক সেবায় ভোগান্তি তৈরি করছে, তা নয়—কোথাও তা গড়িয়েছে খুন পর্যন্ত। গত মাসে মিরপুরে যুবদল কর্মী মো. ইউসুফ হত্যার ঘটনায় এমন তথ্যই উঠে এসেছে পুলিশের তদন্তে।
ডিবির দাবি, কাফরুল থানা যুবদলের সদস্যসচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার জন্য ২৫ লাখ টাকার চুক্তিতে চার পেশাদার খুনি ভাড়া করা হয়েছিল। তবে হামলা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে নিহত হন ইউসুফ।
তদন্তে হাফিজুল ইসলাম বাবু ও হাফিজুর রহমান হাফিজের বিরোধের পেছনে স্থানীয় ময়লার টেন্ডারের বিষয়টিও উঠে এসেছে।
নগর ভবনে প্রাথমিক বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম স্পষ্ট করে বলেন, বাসাবাড়ি থেকে নির্ধারিত ১০০ টাকার বেশি আদায় করলে কিংবা নিয়মিত বর্জ্য অপসারণে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট পিসিএসপির লাইসেন্স বাতিল করা হবে।
ডিএসসিসির সচিব জয়নুল আবেদীন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশেও একই নির্দেশনা পুনর্ব্যক্ত করে বিষয়টি নিয়মিত তদারকির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নির্ধারিত ফির বাইরে টাকা আদায়, নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহে ব্যর্থতা এবং সংগ্রহ করা অর্থের স্বচ্ছ হিসাব না থাকার অভিযোগ সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, এই ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ আসলে কার হাতে?
নগর ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ আব্দুর রাকিব খানের মতে, বর্তমান এই ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাষ্ট্র ও সাধারণ নাগরিক উভয়েই। তার পর্যবেক্ষণ, সিটি করপোরেশন চাইলে নিজস্ব জনবল দিয়েই বর্জ্য সংগ্রহের কাজ পরিচালনা করতে পারে। তাতে একদিকে যেমন নাগরিকদের কাছ থেকে নির্ধারিত সীমার বাইরে অর্থ আদায় বন্ধ হবে, তেমনি আদায় হওয়া পুরো অর্থ সরাসরি সরকারি রাজস্ব হিসেবে জমা হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।


