বাংলাদেশ পুলিশে আবারও ব্যাপক রদবদলের ঢেউ শুরু হয়েছে। প্রশাসনের রুটিন কাজের কথা বলা হলেও এর পেছনে ফুটে ওঠেছে রাজনৈতিক সংকেত, আনুগত্যের পরীক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অনিশ্চয়তা।
দীর্ঘসময় ধরে পুলিশ বাহিনীর ভেতরে একটি সংক্ষিপ্ত শব্দ আতঙ্ক সৃষ্টি করে রেখেছে, আর তা হলো ওএসডি বা বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। ওএসডি কর্মকর্তাদের বেতনভুক্ত রাখা হলেও তাদের কোনো সক্রিয় দায়িত্ব দেওয়া হয় না। বাস্তবে এটি পেশাগত নির্বাসন হিসেবেই পরিচিত। কর্মকর্তাদের কমান্ড কেড়ে নিয়ে অর্থহীন পদে বসিয়ে রাখা হয়, তাদের ভাগ্য নির্ধারিত হয় পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের ওপর।
গত ৩ মে ১৬ জন ডিআইজি এবং একজন অতিরিক্ত ডিআইজিসহ মোট ১৭ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনাটি এই চর্চাকে আবারও আলোচনায় এনেছে। মঙ্গলবার বেশ কয়েকজন ডিআইজি ও পুলিশ সুপারসহ ৩৯ জন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে।
এর ফলে এক সময়ের শক্তিশালী এই বাহিনী ভেতর থেকে অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ছে। বাহিনীটি এখন মনোবলহীন ও বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যখন পুলিশ সংবিধানের পরিবর্তে সরকারের সেবায় নিয়োজিত হয়, তখন সাধারণ মানুষকেই এর চরম মূল্য দিতে হয়।
পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় প্রভাব এবং পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ছিল, যা এখনো এই বাহিনীকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। একই সঙ্গে বর্তমানে ছাত্রদল সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়ার গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তরের ভেতরে পছন্দের পোস্টিং পাওয়ার জন্য জোর লবিং চলছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নিজেদের ‘আসল বিএনপি সমর্থক’ হিসেবে জাহির করে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন বাহিনীর কিছু সদস্য।
২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। এরপর ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরও এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চাকরিচ্যুত বা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো মোট ৩৩৫ জন কর্মকর্তাকে পুনরায় চাকরিতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন পদে মোট ৫৫৭ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
পুনরায় বহাল হওয়া অনেক কর্মকর্তা দীর্ঘ ১৫ বছর চাকরির বাইরে ছিলেন। তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরিয়ে আনা সাধারণ পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। ২০২৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার ৭৬ জন এবং বর্তমান বিএনপি সরকার ৩০ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই ১৫তম, ১৭তম ও ১৮তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তা এবং দীর্ঘদিন ওএসডি ছিলেন। বর্তমানে কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে বিশেষ করে ২০তম ব্যাচের সদস্যরা যারা ২৫ বছরের চাকরির সীমার কাছাকাছি আছেন, তাদের মধ্যে নতুন অবসর তালিকা নিয়ে আতঙ্ক বাড়ছে।
সমালোচকরা মনে করেন এটি কোনো নতুন ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের চলে আসা একটি ধারার ধারাবাহিকতা মাত্র। একের পর এক সরকার পুলিশকে স্বাধীন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বদলে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। অনুগত কর্মকর্তাদের দ্রুত পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিং দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছে, অন্যদিকে নিরপেক্ষ বা ভিন্নমতের কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে পেশাদারিত্বের চেয়ে আনুগত্যের ভিত্তিতেই বাহিনীটি গড়ে উঠছে।
পেশাদারিত্বের এই অভাবের প্রভাব এখন দৃশ্যমান হচ্ছে। পুলিশে ব্যাপক পদোন্নতি চললেও রাজধানীসহ সারাদেশে হত্যা, চাঁদাবাজি ও ডাকাতির ঘটনা বেড়েছে। মাঠ পর্যায়ে পুলিশি কার্যক্রম এখনও পূর্ণ গতি ফিরে পায়নি, যা বাহিনীর মনোবল ও শৃঙ্খলার ওপর চাপেরই প্রতিফলন।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে এই রদবদলের কোনো সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি বা বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ প্রশাসনের নিয়মিত কাজের অংশ। এর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই এবং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।
পদ খালি করার জন্য কর্মকর্তাদের সরানো হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নে তিনি জানান, প্রয়োজনে অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে নতুন পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে। সাম্প্রতিক অবসর নিয়ে তিনি বলেন এটি একান্তই অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং যথাযথ যাচাই-বাছাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে কারও প্রতি কোনো অন্যায় করা হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন।
সাবেক কর্মকর্তারা অবশ্য এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদোন্নতি ও বদলি পেশাদারিত্বকে নষ্ট করে দেয়। তার মতে, মেধাকেই সবার আগে প্রাধান্য দিতে হবে। নতুবা পুলিশ একটি নির্ভরযোগ্য বাহিনী হিসেবে দাঁড়াতে পারবে না।
সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা এই উদ্বেগের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, বড় আকারের অবসর একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর জন্য নেতিবাচক সংকেত দেয়। এতে কর্মকর্তাদের মনে এই ধারণা জন্মে যে, তাদের ভবিষ্যৎ এখন রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল। এটি একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্তরা আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী যাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ছাত্র আন্দোলনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বা ওএসডি থাকা অবস্থায় সরকার বিরোধী কর্মকাণ্ড ও তথ্য পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
পুলিশের এই রদবদল বিভিন্ন স্তরে ঘটছে। মঙ্গলবার দুই পৃথক প্রজ্ঞাপনে ৩৯ জন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে, ১২টি জেলায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে নতুন পুলিশ সুপার। এর আগে গত বছরের ২৭ আগস্ট জনস্বার্থে অবসরে পাঠানো পাঁচজন কর্মকর্তাকে পুনরায় চাকরিতে ফেরানো হয়। তাদের মধ্যে মো. আলী হোসেন ফকির পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আর সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি শেখ মো. সাজ্জাত আলীকে ডিএমপি কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ২০০৬ সাল থেকে নিয়োগ আটকে থাকা ৩৩০ জন সার্জেন্ট ও সাব-ইন্সপেক্টরকেও ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
অন্যদিকে, বাধ্যতামূলক অবসরের তালিকাও দীর্ঘ হচ্ছে। সাবেক সিআইডি প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়া, সাবেক এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম এবং সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এই তালিকায় রয়েছেন। সর্বশেষ ৩ মে ১৭ জন এবং তার আগে ২২ এপ্রিল ১৩ জন ও ৯ মার্চ ৫ জন অতিরিক্ত আইজিপি ও ডিআইজিকে অবসরে পাঠানো হয়েছে।
পদোন্নতির দিক থেকেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট ৭৩ জন এবং ২৫ নভেম্বর আরও ৩৩ জন কর্মকর্তাকে ডিআইজি পদে উন্নীত করা হয়েছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত এসপি থেকে এসপি পদে ৪৯ জন এবং এএসপি থেকে অতিরিক্ত এসপি পদে ১৬৩ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। সাব-ইন্সপেক্টর ও সার্জেন্ট পদ থেকে ২৭৩ জন ইন্সপেক্টর হয়েছেন। শীর্ষ পর্যায়ে ১২ জন ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত আইজিপিকে তাদের পদে স্থায়ী করা হয়েছে। অনেক কর্মকর্তা সুপারনিউমারারি পদোন্নতিও পেয়েছেন যা তাদের বর্তমান পদে থেকেই উচ্চতর পদের সুবিধা পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
৫ আগস্টের পর ছাত্র-জনতার ক্ষোভের মুখে অনেক পুলিশ সদস্য কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীকালে নতুন আইজিপির আহ্বানে ৮ আগস্টের মধ্যে অধিকাংশ সদস্য কাজে ফেরেন। তবে ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৮৭ জন সদস্য কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন, যা বাহিনীর ভেতরের অস্থিরতাকে তুলে ধরে।
সামগ্রিকভাবে এই ঘটনাপ্রবাহ পুলিশ বাহিনীকে একটি রূপান্তরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, সেই সঙ্গে তৈরি করছে চরম উত্তেজনা। বারবার রদবদল, গণ অবসর এবং দ্রুত পদোন্নতি হয়তো বাহিনীর কাঠামো পরিবর্তন করবে। তবে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে: পুলিশ কি আসলে একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে পারবে নাকি রাজনৈতিক হাওয়ার সঙ্গেই তাদের তাল মিলিয়ে চলতে হবে। আপাতত এর উত্তর নির্ভর করছে পরবর্তী নিয়োগ এবং পদোন্নতিগুলো কীভাবে সম্পন্ন হয় তার ওপর।


