রাজধানীসহ ঢাকার ২০টি সংসদীয় আসনে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ৪০ হাজার ভোটার স্থানান্তর নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ভোটার স্থানান্তর নিয়ে বিএনপি অভিযোগ করলেও একে স্বাভাবিক বলছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঢাকা জেলার ভোটার তালিকায় প্রায় তিন লাখ নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মিরপুর ও ডেমরা এলাকায় সবচেয়ে বেশি ভোটার স্থানান্তরের রেকর্ড করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটারদের এই ঠিকানা পরিবর্তন নিয়ে বির্তকের সূত্রপাত। জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে বিএনপির অভিযোগ, এই দল নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পরিকল্পিতভাবে ভোটারদের ঢাকার বিভিন্ন আসনে স্থানান্তর করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে গত রোববার বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে তিনি ঢাকার আসনগুলোতে স্থানান্তরিত হওয়া ভোটারদের বিস্তারিত তথ্য জরুরি ভিত্তিতে প্রকাশের দাবি জানান। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। তবে নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, ভোটার স্থানান্তর একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। এতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি।
নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ এস এম হুমায়ুন কবীর টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, ভোটার স্থানান্তরের এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে। এই বিষয় নিয়ে কেন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে তা বুঝতে পারছেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইসি’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ঢাকার কোনো একটি নির্দিষ্ট আসনে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজারের বেশি ভোটার স্থানান্তরিত হয়নি। সাধারণত কর্মসংস্থান, শিক্ষা, পারিবারিক প্রয়োজন বা আবাসন বদলের কারণে ভোটাররা নিয়মিতভাবে নির্বাচনী এলাকা পরিবর্তন করেন। তবে নির্বাচনের আগে এই আবেদনের সংখ্যা কিছুটা বেড়ে যায়। গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ নভেম্বরের মধ্যে সারা দেশে ৭ লাখের বেশি ভোটার এলাকা পরিবর্তনের আবেদন জমা পড়েছিল, যার মধ্যে সাড়ে ৬ লাখের বেশি আবেদন অনুমোদন করা হয়।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, ভোটার এলাকা পরিবর্তনের পদ্ধতিটি অত্যন্ত কঠোর। আবেদনকারীকে নতুন এলাকায় বসবাসের প্রমাণ হিসেবে বিদ্যুৎ বিল বা ভাড়ার চুক্তিনামা জমা দিতে হয়। একই সঙ্গে নাগরিকত্ব সনদ বা জাতীয় পরিচয়পত্র এবং এসব নথিপত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধির স্বাক্ষর ও সিলমোহরের প্রয়োজন পড়ে। এত সব শর্ত পূরণ করে হঠাৎ করে বিপুল সংখ্যক ভোটার স্থানান্তর করা সহজ নয় বলে কর্মকর্তারা যুক্তি দেন।
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের সিস্টেম ম্যানেজার মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানান, এবার ঢাকা জেলায় প্রায় তিন লাখ ভোটার বৃদ্ধি পেয়েছে, যাদের প্রায় সবাই বিভিন্ন বয়সসীমার নতুন ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন। এ ছাড়া গত এক বছরে ঢাকা এবং অন্যান্য জেলা থেকে ঢাকার সংসদীয় আসনগুলোতে স্থানান্তরিত হয়েছেন প্রায় ৪০ হাজার ভোটার।
ইসি কর্মকর্তাদের মতে, ভোটার সংখ্যার এই হ্রাস-বৃদ্ধি মূলত সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের কারণে ঘটেছে, যা ঢাকার ছয়টি আসনের ওপর প্রভাব ফেলেছে। ঢাকা-২, ৪, ৫, ৭, ১০ এবং ১৪ আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করায় এই আসনগুলোতে ভোটার সংখ্যায় বড় পরিবর্তন এসেছে। এর পাশাপাশি নতুন ভোটারদের অন্তর্ভুক্তিও আসনভিত্তিক ভোটার সংখ্যায় তারতম্য ঘটিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ১০ নভেম্বরের মধ্যে ঢাকার ৫৩টি থানার মধ্যে মিরপুর, ডেমরা ও পল্লবীতে সবচেয়ে বেশি ভোটার স্থানান্তরের ঘটনা ঘটেছে। এই সময়ে মিরপুরে এক হাজার ৬২৭ জন, ডেমরায় এক হাজার ৪৪৪ জন এবং পল্লবীতে এক হাজার ২৩৫ জন ভোটার স্থানান্তরিত হয়েছেন। এর পরেই কেরানীগঞ্জে এক হাজার ২০৭ জন, বাড্ডায় ৮৫১ জন, কাফরুলে ৮১১ জন, সাভারে ৭৭১ জন, খিলগাঁওয়ে ৭৪২ জন, যাত্রাবাড়ীতে ৭১৭ জন এবং পল্টনে ৬৩৮ জন ভোটার স্থানান্তরিত হয়েছেন।
এ ছাড়া ধামরাই, কদমতলী, গুলশান, রমনা, ধানমন্ডি, বনানী, ভাটারা, শাহজাহানপুর, তুরাগ, নবাবগঞ্জ ও মোহাম্মদপুর এলাকায় ভোটার স্থানান্তর লক্ষ্য করা গেছে। তবে আদাবর, শাহবাগ, উত্তরা পশ্চিম ও উত্তরখান এলাকায় স্থানান্তরের হার ছিল তুলনামূলক কম। সবচেয়ে কম স্থানান্তর হয়েছে ভাসানটেক, খিলক্ষেত, কোতোয়ালি ও কামরাঙ্গীরচর এলাকায়।
১২তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় ১৩তম নির্বাচনে ঢাকার ২০টি আসনে নিট ভোটার সংখ্যা বেড়েছে দুই লাখ ৯৫ হাজার ৪৬৬ জন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর মোট ভোটার ৮১ লাখ ৭০ হাজার ৫১৯ জন থেকে বেড়ে ৮৪ লাখ ৬৫ হাজার ৯৮৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এই পরিবর্তন মূলত নতুন ভোটার যুক্ত হওয়া এবং সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের মিলিত ফলাফল।
আসনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকার ১৭টি আসনে ভোটার সংখ্যা বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ঢাকা-৭ আসনে, যেখানে এক লাখ ৩৬ হাজার ২৮৭ জন ভোটার যুক্ত হয়েছেন। এ ছাড়া ঢাকা-৪ আসনে এক লাখ সাত হাজার ৯২৯ জন, ঢাকা-১০ আসনে ৬৩ হাজার ৭২৭ জন এবং ঢাকা-১৪ আসনে ৩৭ হাজার ৮৩২ জন ভোটার বেড়েছে।
অন্যান্য আসনের মধ্যে ঢাকা-১ আসনে ৩১ হাজার ৫৩১ জন, ঢাকা-১৮ আসনে ২৫ হাজার ৩৩৪ জন, ঢাকা-২০ আসনে ২০ হাজার ৬৫৭ জন, ঢাকা-৩ আসনে ১৯ হাজার ৬১৭ জন, ঢাকা-৯ আসনে ১৯ হাজার ৪০৮ জন, ঢাকা-১৩ আসনে ১৩ হাজার ৩৫৫ জন, ঢাকা-১১ আসনে ১২ হাজার ৫৪১ জন এবং ঢাকা-১৬ আসনে ১২ হাজার ২৫৮ জন ভোটার বেড়েছে।
পাশাপাশি ঢাকা-৬ আসনে ১০ হাজার ৮৫১ জন, ঢাকা-১৭ আসনে নয় হাজার ৮৪৫ জন, ঢাকা-১৫ আসনে সাত হাজার ১২১ জন, ঢাকা-৮ আসনে চার হাজার ৮২১ জন এবং ঢাকা-১২ আসনে মাত্র ২০৯ জন ভোটার বেড়েছে।
অন্যদিকে, তিনটি আসনে ভোটার সংখ্যা কমেছে। সীমানা পুনর্নির্ধারণের ফলে ঢাকা-২ আসনে সবচেয়ে বেশি ভোটার কমেছে, যার সংখ্যা এক লাখ ৩৯ হাজার ৭৪৩ জন। এ ছাড়া ঢাকা-৫ আসনে ৭০ হাজার ৭৬৮ জন এবং ঢাকা-১৯ আসনে নয় হাজার ৩৪৬ জন ভোটার হ্রাস পেয়েছে।


