সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কৃষকের বিশ্রাম নেই। ঝড়-বৃষ্টি-রোদ মাথায় নিয়ে প্রতিদিনের মতোই ফসলের মাঠে কাজ করছিলেন কৃষক শিমুল বিশ্বাস, হুরমত শেখ ও আব্দুল আজিজ। এদের মধ্যে শিমুল বিশ্বাস আর হুরমত শেখ একই জেলার আলাদা এলাকার মাঠে ফসল কাটছিলেন। আর আব্দুল আজিজ ছিলেন ভিন্ন জেলায়। কাজ করার সময় হঠাৎ আকাশ কালো করে এল মেঘ। দুজন বাড়ি ফেরার পথে, আরেকজন মাঠে কাজ করার সময় হলো বজ্রপাত। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হলো তাদের।
যে ফসলের মাঠ ছিল তাদের নিত্য সহচর, সেখান থেকেই আর ফেরা হলো না ঘরে।
শুধু এই তিনজন নয়, রোববার দেশের বিভিন্ন জেলায় বজ্রপাতে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির একাধিক ঘটনা ঘটেছে। টাইমস অব বাংলাদেশের জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর অনুযায়ী–বজ্রপাতে ঝিনাইদহে দুজন, গাইবান্ধায় একজন ও নওগাঁয় একজন কৃষক, কুমিল্লায় তিনজন, নারায়ণগঞ্জে এক স্কুলশিক্ষার্থী, কুড়িগ্রামে দুজন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী, বগুড়ায় এক গৃহবধূসহ অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন।
প্রতিবছরই দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এটি বাংলাদেশের জাতীয় দুর্যোগ। ২০১৬ সালের ১৭ মে বজ্রপাতকে সরকারি তালিকাভুক্ত দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা দেয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
ঝিনাইদহে দুই কৃষকের মৃত্যু
ঝিনাইদহে বজ্রপাতে দুই কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। সকালে সদর উপজেলার আড়মুখি ও শৈলকুপা উপজেলার শেখরা গ্রামে সকালে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, আড়মুখি গ্রামের কৃষক শিমুল বিশ্বাস নিজ জমিতে কাজ করছিলেন। হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে বাড়ি ফিরছিলেন, সে সময় বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই মারা যান। অপরদিকে শৈলকুপার হুরমত শেখও বৃষ্টির মধ্যে বাড়ি ফিরছিলেন। বজ্রাপাতে গুরুতর আহত হয়ে বাড়িতে নেওয়ার পর তিনি মারা যান।
ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইমরান জাকারিয়া বলেন, ‘বৈরী আবহাওয়ার সময় যেন কেউ খোলা আকাশের নিচে না থাকেন, বজ্রপাতের ঝুঁকি তখন সবচেয়ে বেশি।’
গাইবান্ধায় এক কৃষকের মৃত্যু
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় বজ্রপাতে আব্দুল আজিজ নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। দুপুরে উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের দীঘলকান্দী গ্রামে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, আব্দুল আজিজ নিজের বাড়ির পাশের ধানের জমিতে কাজ করছিলেন। আকাশে মেঘ জমে প্রবল বৃষ্টি শুরু হলে তিনি জমিতেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ বজ্রপাতের আঘাতে ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসেন।
সাঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাদশা আলম বলেন, ‘এটি একটি প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা, থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে।’
কুমিল্লায় তিনজনের মৃত্যু
কুমিল্লার হোমনা উপজেলার ঘাগুটিয়া ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামে বজ্রপাতে দুই সহোদর বোনসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। বেলা ৩টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন–মমতাজ বেগম (৩৭), জাকিয়া (২৩) এবং রাশেদ মিয়া (২২)। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, তারা ভবানীপুর ঘাটে খেয়া পারাপারের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। বিকট শব্দে বজ্রপাত হলে তিনজনই ঘটনাস্থলে মারা যান।
হোমনা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম জানান, দুপুর থেকে ভারি বৃষ্টি শুরু হলে ভবানীপুর ঘাটে উজানচর-ঘাগুটিয়া খেয়া পারাপারের জন্য কয়েকজন যাত্রী অপেক্ষা করছিলেন। এ সময় বজ্রপাতে তাদের মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে বিকেল সোয়া ৩টার দিকে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
নারায়ণগঞ্জে এক স্কুলশিক্ষার্থীর মৃত্যু
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার উলুকান্দি গ্রামে বজ্রপাতে ওয়াসিম (১৩) নামে এক স্কুলশিক্ষার্থী মারা গেছে। বিকালে নিজের বাড়িতে গরুকে ঘাস দিতে গিয়ে বজ্রাপাতে আহত হয় সে।
আহত অবস্থায় সোনারগাঁ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ফজলুল হক জানান, শিশুটি হাসপাতালে আসার আগেই মারা গিয়েছিল। ওয়াসিম স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ছিল।
কুড়িগ্রামে দুজনের মৃত্যু
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলায় পৃথক দুটি ঘটনায় বজ্রাঘাতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। রোববার দুপুরে নুনখাওয়া ইউনিয়নের কালিকাপুর এলাকায় মাদরাসা থেকে ফেরার পথে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ বাবলু মিয়া বজ্রাঘাতে মারা যায়। সে ওই এলাকার নূর হোসেনের ছেলে।
অন্যদিকে বামনডাঙা ইউনিয়নের চর লুচনি গ্রামে গরুর ঘাস কাটতে গিয়ে বজ্রাঘাতে মারা যায় সহিবর নামে একজন কৃষক।
নাগেশ্বরী থানার ওসি রেজাউল করিম দুটির মৃত্যুর তথ্যই নিশ্চিত করেছেন।
বগুড়ায় এক গৃহবধূর মৃত্যু
বগুড়ার গাবতলী উপজেলায় বজ্রপাতে শেফালি বেগম নামে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। দুপুরে উপজেলার নারুয়ামালা ইউনিয়নের মধ্যমারছেও গ্রামে তিনি বাড়ির পাশে নদীর তীরে গরুর জন্য ঘাস কাটছিলেন। এ সময় বজ্রপাতের আঘাতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী শফিক ইসলাম বলেন, ‘বজ্রপাতের শব্দের সঙ্গে চিৎকার শুনে নদী পার হয়ে গিয়ে দেখি মাঠে তিনি মৃত অবস্থায় পড়ে আছেন।’
গাবতলী থানার ওসি সেরাজুল হক জানান, আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
নওগাঁয় কৃষকের মৃত্যু
নওগাঁর রাণীনগরে মাঠে গরু চরানোর সময় বজ্রপাতে তাহের আলী (৫০) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। সকালে উপজেলার ছোট যমুনা নদীর তীরে কৃষ্ণপুর মাঠ এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। কৃষক তাহের কৃষ্ণপুর সরদারপাড়া গ্রামের মৃত আশরাফ হাজী মন্ডলের ছেলে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সকালে খাস খাওয়ানোর জন্য গরু নিয়ে ছোট যমুনা নদীর তীরে কৃষ্ণপুর মাঠে যান কৃষক তাহের। মাঠে তিনি গরু চরাচ্ছিলেন। সকাল পৌনে ১০টার দিকে হঠাৎ বৃষ্টি ও বজ্রপাত শুরু হয়। এ সময় তিনি মাঠে গরু রেখে একটি বটগাছের নিচে আশ্রয় নেন। সেখানে বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি।
রাণীনগর থানার ওসি আব্দুল হাফিজ মো. রায়হান বলেন, ‘খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়েছি। আইনি প্রক্রিয়া শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সারা দেশে বৃষ্টিপাতের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকবে। সবশেষ আবহাওয়ার পূর্বাভাসে অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের প্রায় সব বিভাগেই হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। তবে এর মধ্যে রংপুর, রাজশাহী এবং ময়মনসিংহ বিভাগে বৃষ্টির মাত্রা বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে, রংপুর, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ী দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ তিন বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিও হতে পারে।


