ধূসর পিচঢালা পথ আর সিমেন্টের বিবর্ণ ডিভাইডার—মহাসড়ক বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক যান্ত্রিক ছবি। কিন্তু কুষ্টিয়া শহরের চিত্রটি এখন একদমই আলাদা। শহরের বুক চিরে চলে যাওয়া মহাসড়কের প্রায় ৮ কিলোমিটার এলাকা এখন আর কেবল ধুলোবালি ও যান্ত্রিকতার পথ নয়, বরং এটি রূপ নিয়েছে চোখজুড়ানো এক পুষ্পকাননে। লাল, নীল, হলুদ আর বেগুনি ফুলের বর্ণিল সমারোহে বদলে গেছে কুষ্টিয়ার চিরচেনা প্রবেশপথ।
শহরের প্রাণকেন্দ্র মজমপুর গেট থেকে ঝিনাইদহ ও ঈশ্বরদীমুখী সড়কের দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার—বটতৈল মোড় ও ত্রিমোহনী পর্যন্ত বিস্তৃত এই পথ এখন সবুজের চাদরে ঢাকা। ‘ক্লিন কুষ্টিয়া-গ্রিন কুষ্টিয়া’ (জিকে-কেকে) নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হাত ধরে এই নীরব বিপ্লব ঘটেছে। মহাসড়কের আইল্যান্ডে দেশি-বিদেশি নান্দনিক সব গাছ আর তাতে ফুটে থাকা হাজারো ফুল যেমন শহরের মানুষের মনে প্রশান্তি জোগাচ্ছে, তেমনি পর্যটকদের কাছেও হয়ে উঠেছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। বাসের জানালা দিয়ে আসা-যাওয়ার পথে যাত্রীরা এখন মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করছেন এই নান্দনিক দৃশ্য। আইল্যান্ডের সবুজ ঘাসও ফেলনা যাচ্ছে না; স্থানীয় গৃহপালিত পশুর মালিকরা সেই ঘাস কেটে নিয়ে যাচ্ছেন।
এই মহতী উদ্যোগের নেপথ্য কারিগর প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার, যিনি কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও জিকে-কেকে’র উদ্যোক্তা। তিনি জানালেন, এই কাজটির স্বপ্ন তার অনেক পুরনো। সেই স্বপ্ন থেকেই ২০২৪ সালের নভেম্বরে কাজ শুরু হয়। গত মার্চ মাসে সড়কের ৮ কিলোমিটার জুড়ে রোপণ করা হয় কয়েক হাজার চারা। তবে এই গাছ লাগানো কেবল শখের বশে নয়, বরং শতভাগ প্রকৌশল বিদ্যা ও আধুনিক নকশা মেনেই করা হয়েছে। জাকির হোসেন বলেন, “গাছগুলো আমরা নিজেদের ইচ্ছেমতো বা যেনতেন করে লাগাইনি। আমাদের পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছে ‘গার্ডেন ইঞ্জিনিয়ারিং বাংলাদেশ’। তাদের পরিকল্পনা মতো কোন গাছ কত বছরে কত উচ্চতা পাবে, তা মাথায় রেখেই রোপণ করা হয়েছে। ফলে সড়কের দৃষ্টিসীমায় কোনো ঝুঁকি বা বাধার সৃষ্টি হবে না।”
রোপণ প্রক্রিয়ার বৈচিত্র্য তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, “এখানে ধারাবাহিকভাবে আটটি বেডের মাধ্যমে গাছ লাগানো হয়েছে। পরপর সাতটি বেডে সাজানো হয়েছে বাহারি ফুলের গাছ এবং একটি বেডে রাখা হয়েছে ফলজ গাছ, যেন পাখিরা সেসব গাছ থেকে খাবার পায়।” বর্তমানে এই সংগঠনে প্রায় ৯০০ স্বেচ্ছাসেবী নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।
ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন পরিবেশবিদরাও। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. রেজওয়ানুল ইসলাম বলেন, “ক্যাম্পাসে যাওয়ার পথে দেখি উনারা মোড়ে মোড়ে পরিত্যক্ত পলিথিন পরিষ্কার ও বৃক্ষের পরিচর্যা করছেন। পরিবেশ নিয়ে যে যেভাবেই কাজ করুক, তা অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। কারণ আমরা তো পরিবেশের ব্যাপারে খুব একটা সচেতন নই। এতদিন ডিভাইডার থাকলেও এভাবে তো রাস্তার সৌন্দর্য বাড়ানো হয়নি। এটি খুব ভালো উদ্যোগ হয়েছে, তবে আরও বৈজ্ঞানিকভাবে করলে মানুষ এর স্থায়ী সুফল ভোগ করবে।”
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নিজস্ব অর্থায়ন ও তত্ত্বাবধানে এই বাগান সাজানো হলেও এর রক্ষণাবেক্ষণে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে কুষ্টিয়া পৌরসভা। নিয়মিতভাবে পৌরসভার পানির গাড়ি দিয়ে এসব গাছের গোড়ায় পানি দেওয়া হয়। পৌরসভার প্রশাসক আহমেদ মাহবুব-উল-ইসলাম বলেন, “গাছগুলো যে বা যারাই লাগাক, এটা এখন আমাদের সবার সম্পদ। তাই এগুলো রক্ষায় আমরা তৎপর। আমাদের পানির গাড়ি দিয়ে নিয়মিত পানি দেওয়া হয় এবং সার্বিক নজরদারি রাখা হয়।”
সরেজমিনে দেখা যায়, শুধু গাছ লাগানোই নয়, প্রতি সকালে নিয়ম করে স্বেচ্ছাসেবীরা গাছের পরিচর্যায় নামেন। সপ্তাহের ছুটির দিনে তারা সড়কের পাশে ছড়িয়ে থাকা পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য পরিষ্কার করেন। তাদের এই কর্মকাণ্ডের ছাপ ইতোমধ্যেই স্থানীয় দোকানদার ও বাসিন্দাদের মনে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে; তারাও এখন পলিথিন ও আবর্জনা ফেলায় সতর্কতা অবলম্বন করছেন। সব মিলিয়ে কুষ্টিয়ার এই ৮ কিলোমিটার মহাসড়ক এখন নাগরিক সচেতনতা, পরিবেশ রক্ষা ও সুন্দরের এক অনন্য মিশেলে পরিণত হয়েছে।


