আড়াই বছর ধরে চোখে ঝাপসা দেখেন সত্তরোর্ধ্ব বেগমা খাতুন। দূরের কিছু দেখতে কষ্ট হয়, কাছের জিনিসও স্পষ্ট দেখেন না। শুক্রবার সকালে ফটিকছড়ির শাহনগর গ্রাম থেকে এসেছিলেন গোপালকাটা উচ্চবিদ্যালয়ে। সেখানে চিকিৎসকের কাছে নিজের সমস্যার কথা খুলে বলেন। চিকিৎসক তার কথা শোনেন, পরীক্ষা করেন এবং আশ্বস্ত করেন। এতে স্বস্তি পান বেগমা। দুই হাত তুলে চিকিৎসকের জন্য দোয়া করেন।
বেগমা খাতুনের মতো শুক্রবার বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিয়েছেন প্রায় ১ হাজার ২০০ নারী-পুরুষ। ফটিকছড়ির গোপালকাটা উচ্চবিদ্যালয়ে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে এ আয়োজন। স্থানীয় সমাজহিতৈষী হাজী মোমেনা-আনোয়ার মুহুরীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাদের ইছালে ছওয়াবের উদ্দেশ্যে মোমেনা-আনোয়ার ফাউন্ডেশন এ স্বাস্থ্যসেবার আয়োজন করে। এতে সহযোগিতা করে রোটারি ক্লাব অব চিটাগাং এরিস্টোক্রেট ও নানুপুর পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার।
আয়োজকেরা জানান, চক্ষু, যৌন ও চর্মরোগ, মেডিসিন, হৃদরোগ, গাইনি, শিশু, হাড়ভাঙা ও বাতব্যথাসহ বিভিন্ন সমস্যায় ১৬ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সেবা দেন। এতে সরাসরি চিকিৎসা নেন ১ হাজার ১৯০ জন। সবচেয়ে বেশি ছিলেন চোখের রোগী, ৩০৩ জন। এ ছাড়া সাধারণ রোগে ১৮৮ জন, নাক-কান-গলার সমস্যায় ৬৫, চর্ম ও অ্যালার্জিতে ৪৪, শিশু বিভাগে ৫৬ এবং প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগে ৩২ জন সেবা পান।
চোখের রোগীদের মধ্যে ৭৮ জনকে চশমা দেওয়া হয়। ছানি অস্ত্রোপচারের জন্য বাছাই করা হয় ২০ জনকে। শিগগিরই তাদের বিনা মূল্যে অস্ত্রোপচার করা হবে বলে আয়োজকেরা জানান। এ ছাড়া আরও দেড় শতাধিক মানুষ বিভিন্নভাবে সেবা নেন। দিন শেষে রোগীদের মধ্যে বিনা মূল্যে প্রায় তিন লাখ টাকার ওষুধ বিতরণ করা হয়।
আয়োজনটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ৪৫ জন স্বেচ্ছাসেবক কাজ করেন। সহযোগিতা করে বিদ্যালয়ের স্কাউট দলও। পরে আয়োজকের বাড়িতে প্রায় দুই হাজার মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।
আয়োজনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন ফটিকছড়ির নবজাতক ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জয়নাল আবেদীন মুহুরী। তিনি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন।
এ সময় তিনি বলেন, ‘মোমেনা-আনোয়ার ফাউন্ডেশন সব সময় ভালো কাজে পাশে থাকবে। প্রান্তিক এলাকায় সবার জন্য সেবা নিশ্চিত করতে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কাজে আমরা যুক্ত আছি এবং থাকব।’
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ছৈয়দুল আলম কোরাইশী বলেন, গরিব ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ফাউন্ডেশনটি প্রশংসনীয় কাজ করেছে। মানুষের পাশে থাকার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে তারা সারা বছরই নানা জনকল্যাণমূলক কাজে সক্রিয় থাকে।
সেবা নিতে আসা মো. আনোয়ার বলেন, ‘এই আয়োজন প্রমাণ করে মানবতা এখনো মুছে যায়নি। এখনো আছে প্রাণে প্রাণে। আজকের আয়োজন তার জ্বলন্ত প্রমাণ। সেবা মানুষের কাছে নীরবে পৌঁছে যাক, এটাই আমরা সবার কাছে চাই।’
অনুষ্ঠানে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম শাকিল, প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ফারুক, রোটারি ক্লাবের সদস্য এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সেবা নিয়ে ফেরার পথে কথা হয় মো. আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এই সেবায় মানুষ উপকৃত হলো, আবার মানবিকতা আর উদারতার উদাহরণ হয়ে থাকল।’


