মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাঠ্যপুস্তকে শেখ মুজিবুর রহমান আর ‘বঙ্গবন্ধু’ থাকছেন না। আগামী শিক্ষাবর্ষে তিনি হয়ে যাচ্ছেন শুধুই শেখ মুজিবুর রহমান। পাঠ্যবই থেকে বাদ পড়ছে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ।
এর আগে, চলতি শিক্ষাবর্ষের নতুন বই ছাপানোর সময় শেখ মুজিবুর রহমানের নামের আগে ‘জাতির পিতা’ উপাধি বাদ দেওয়া হয়।
পিতার নামের আগের উপাধি ছেঁটে ফেললেও কন্যা শেখ হাসিনার নামের আগে যোগ হচ্ছে ‘ফ্যাসিস্ট’ বিশেষণ। এ ছাড়া নতুন করে পাঠ্যবইয়ে যোগ হচ্ছে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান।
আগামী ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে ষষ্ঠ থেকে একাদশ শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে এ ধরণের সংযোজন-বিয়োজনসহ আগের তথ্যগত ভুলত্রুটি সংশোধন করা হচ্ছে। সহজ করা হচ্ছে বিজ্ঞানবিষয়ক ব্যাখ্যা ও অনুবাদ।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সূত্র বলছে, ভুল-ত্রুটি সংশোধন করা ছাড়া মাধ্যমিকের নতুন পাঠ্যপুস্তকে খুব বেশি পরিবর্তন থাকছে না। তবে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত চারটি শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও আজকের বিশ্ব’ বইগুলোতে কিছু পরিমার্জন আনা হয়েছে। ছাপাখানাগুলোতে এখন পুরোদমে বইগুলো প্রকাশনার কাজ চলছে।
সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণি
চলতি শিক্ষাবর্ষে সপ্তম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়’ বইয়ের প্রথম অধ্যায়ের নাম ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম’। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য নতুন পাঠ্যবইতে অধ্যায়টির নামকরণ করা হয়েছে ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও গণআন্দোলন’।
বর্তমান বইতে এই অধ্যায়ের একটি অংশের শিরোনাম আছে ‘ঐতিহাসিক আগরতলা মামলা (রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্য)’, নতুন বইতে শিরোনাম থেকে বন্ধনীর অংশটুকু ফেলে দেওয়া হয়েছে।
১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলের স্থানে বর্তমান বইতে লেখা আছে ‘পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদ নির্বাচনে ৩০৯টি আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২৩৬টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে’। তবে নতুন বইতে এই তথ্য সংশোধন করে লেখা হয়েছে ‘যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে’।
অষ্টম শ্রেণির ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’ নামক অধ্যায়ের নতুন নামকরণ হয়েছে ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম’। এই অধ্যায়ে স্থান পেয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানে রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত আইকনিক ছবিটি।
এই অধ্যায়ের সব স্থানে শেখ মুজিবুর রহমান নামের সামনে থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিটি বাদ দেওয়া হয়েছে। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কিত পাঠে ব্যবহার করা ছবিতে বর্তমান বইতে ক্যাপশন আছে ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের দৃশ্য’, নতুন বইতে এই ক্যাপশন লেখা হয়েছে ‘শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের দৃশ্য’।
বর্তমান বইতে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) কার্যক্রম’ নামে একটি পাঠ থাকলেও, নতুন বইতে এই পাঠকে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের (অস্থায়ী) কার্যক্রম’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
এ ছাড়াও অষ্টম শ্রেণির নতুন বাংলা বইয়েও আর থাকছে না বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ।
মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রশাসন বিষয়ে তথ্য পরিমার্জন
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় ‘যুদ্ধকালীন প্রশাসক’ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ভূমিকায় সম্পর্কে নতুন একটি অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়েছে। যার শুরুটা হচ্ছে ‘মুক্তিযুদ্ধকালীন জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে তাজউদ্দীন আহমদ দেশকে ১১টি প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত করেন।’ এরপর প্রশাসনিক অঞ্চলের কাজ ও বর্ণনা। মুক্তিযুদ্ধকালে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে আট সদস্য বিশিষ্ট উপদেষ্টা কমিটি গঠনের কথাও উঠে এসেছে এই অনুচ্ছেদে।
এ ছাড়াও রণাঙ্গণের ১১টি সেক্টরের বিস্তারিত বর্ণনা এবং সেক্টর কমান্ডারদের নাম যুক্ত হয়েছে নতুন বইতে। তবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া বিভিন্ন গেরিলা বাহিনীর তালিকা থেকে বাদ গেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে গঠিত ‘মুজিব বাহিনী’র নাম। এমনকি কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলা বাহিনীর প্রসঙ্গটিও আর থাকছে না নতুন পাঠপুস্তকে।
নামের আগে নতুন বিশেষণ
অষ্টম শ্রেণির বইতে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামের আগে ‘ফ্যাসিস্ট’ এবং নব্বইয়ের আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের নামের আগে ‘স্বৈরশাসক’ বিশেষণ যুক্ত করা হয়েছে।
নবম-দশম শ্রেণির বইতে শেখ মুজিবুর রহমানের নামের সামনে থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি বাদ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও শেখ মুজিবের বাকশাল প্রতিষ্ঠা, জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় গণতন্ত্র, খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক সরকার, শেখ হাসিনার ফ্যাসিজম, আওয়ামী লীগের ‘তিনটি বিতর্কিত’ নির্বাচন বিষয়ে কনটেন্ট যুক্ত করা হয়েছে। বর্তমান বইতে এসব বিষয় না থাকলেও নতুন বইতে এসব বিষয় পড়বেন ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা।
উচ্চমাধ্যমিকের বাংলা ও ইংরেজি বইয়ে পরিবর্তন
একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির বাংলা বই থেকে বাদ পড়েছে বহুল আলোচিত গীতিসাহিত্য ‘মহুয়া’। এর পরিবর্তে নতুন বইতে স্থান পেয়েছে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অসমাপ্ত আত্মজীবনীমূলক গদ্য ‘আত্মচরিত’। এ ছাড়াও নতুন করে যুক্ত হয়েছে ‘জুলাই অভ্যুত্থানের গ্রাফিতিতে সাহিত্য, গান ও স্লোগান’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ।
ইংরেজি বইয়ের ‘থ্রি স্পিচেস’ নামক অধ্যায়টিতে বর্তমান বইতে নেলসন ম্যান্ডেলা, আব্রাহাম লিঙ্কন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ আছে। তবে নতুন বই থেকে ৭ মার্চের ভাষণটি বাদ দিয়ে অধ্যায়টির নতুন নাম দেওয়া হয়েছে ‘ট্রান্সফরমেটিভ স্পিচেস’। সেখানে যুক্ত হয়েছে ‘জুলাই আপরাইজিং: অ্যা ট্রান্সফরমেটিভ মুভমেন্ট’ শিরোনামে একটি নতুন একটি গদ্য।
‘কথা বলো কম কম’ নীতিতে কর্মকর্তারা
পাঠ্যপুস্তকে ব্যবহৃত কোনো ব্যক্তির নামের আগে বিশেষণ ব্যবহারের একাডেমিক মানদণ্ডের ব্যাপারে এনসিটিবির কোনো কর্মকর্তা মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তারা বলছেন, পাঠ্যপুস্তকের ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরে এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে রাখা হয়েছিল। ইতিহাসে যার যা ভূমিকা, এখন সেটা রক্ষা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এসব কারও একক সিদ্ধান্ত না। দেশের শীর্ষ পর্যায়ের শিক্ষাবিদদের নিয়ে গঠিত জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে।
ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ বাদ দেওয়া প্রসঙ্গে তারা বলেন, এই ভাষণ প্রসঙ্গে পাঠ রয়েছে। নামের আগে উপাধি বাদ বা বিশেষণ যোগ করার মতো বিষয়গুলো সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে বলেও ব্যাখ্যা দেন এনসিসিসি’র কর্মকর্তারা।
প্রতিক্রিয়া
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক প্রণেতাদের একজন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শোয়াইব জিবরান। পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ অত্যন্ত প্রবল। যারা যখন ক্ষমতায় থাকেন তারা তখন তাদের রুচি ও চাহিদামত বিশেষণ প্রত্যাশা করেন। শিক্ষাব্যবস্থায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো উচিত। শিক্ষা থেকে রাজনীতি যতো কমানো যায়, শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ততো ভালো। শিক্ষার সঙ্গে রাজনীতির সম্পৃক্ততা থাকা উচিত না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ বলেন, দলীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শিক্ষাকে বিচ্ছিন্ন রাখা উচিত। ইতিহাসে যার যা অবদান সেটার নির্মোহ প্রতিফলন থাকা উচিত। দলীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কিছু করলে দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
তিনি আরও বলেন, ‘পাঠ্যপুস্তকে সবকিছু হওয়া উচিত নির্মোহ পয়েন্ট থেকে। পলিটিক্যাল গ্লোরিফিকেশন বা পলিটিক্যাল স্টিগমা-দুটো থেকেই দূরে থাকা দরকার। কারণ শিক্ষার মাধ্যমে আমরা এক ধরনের ভ্যালু ক্রিয়েট করতে চাই, যা শিক্ষার্থীদের মানস গঠনে সহায়ক হয়।’


