ভোরের আলো ফুটতেই হাতে পলো, হুসা আর জাল নিয়ে দাদুড়িয়া বিলে নেমেছেন শত শত মানুষ। পানিতে পলো চেপে মাছ ধরার চেনা দৃশ্য, বিলপাড়ে দর্শনার্থীদের ভিড় আর গ্রামীণ মানুষের উচ্ছ্বাস, সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে উৎসবের আবহ। এটি ঐতিহ্যবাহী ‘পলো বাওয়া’ উৎসব।
তবে উৎসবের আনন্দে কিছুটা হলেও ছায়া ফেলেছে মাছের আকাল। সকাল থেকে বিলে নেমেও অনেকের ঝুলিতে উঠেছে সামান্য মাছ, কেউ ফিরেছেন প্রায় খালি হাতে।
সোমবার সকাল ৬টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার চতুল ও শেখর ইউনিয়নের দাদুড়িয়া বিলে অনুষ্ঠিত হয় এই উৎসব। আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের মানুষ এতে অংশ নেন। কারও হাতে পলো, কারও হাতে হুসা, আবার কেউ মাছ ধরতে নেমেছিলেন জাল নিয়ে। পুরোনো দিনের এই আয়োজন ঘিরে মানুষের আগ্রহ থাকলেও বিলে মাছের স্বল্পতা নিয়ে ছিল হতাশা।
একসময় দেশীয় মাছের প্রাচুর্যের জন্য পরিচিত ছিল দাদুড়িয়া বিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, এখন সেখানে মাছ পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। তাদের ধারণা, নিষিদ্ধ বা ক্ষতিকর সূক্ষ্ম ফাঁসের চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার, বিলের মধ্যে অপরিকল্পিতভাবে পুকুর তৈরি এবং কৃষিকাজে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার মাছ কমে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
গুনবহা গ্রামের মিকাইল এসেছেন বাবা-দাদার সময়ের ঐতিহ্য ধরে রাখতে। তবে বিলে নেমে আশানুরূপ মাছ পাননি তিনি। মাছের এই সংকট চলতে থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পলো বাওয়া কেবল অতীতের গল্প হয়েই থাকবে, বলেন তিনি।
আলফাডাঙ্গা থেকে প্রায় ১৫ বছর পর পলো বাওয়া উৎসবে অংশ নিতে এসেছিলেন আজিজুল ফকির। অনেক আশা নিয়ে বিলে নামলেও মাছ পেয়েছেন সামান্যই।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন মাছ শিকারি শাহাবুল। তার ভাষ্য, পলো দিয়ে মাছ পাওয়া যাচ্ছে বললেই চলে না। বিশেষ ধরনের হুসা দিয়ে ছোট মাছ ধরার চেষ্টা করেও অনেকে খুব বেশি মাছ পাচ্ছেন না।
তবু মাছের আশায় বিলে নামা মানুষের উৎসাহে ঘাটতি ছিল না। কারণ, পলো বাওয়া কেবল মাছ ধরার আয়োজন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ মানুষের শৈশবের স্মৃতি, পারস্পরিক যোগাযোগ আর লোকজ সংস্কৃতি। বহু মানুষের কাছে এই উৎসব পুরোনো দিনের অভিজ্ঞতা নতুন করে ফিরে পাওয়ার উপলক্ষ।
কুশাডাঙ্গা গ্রামের আয়োজক ইমরান শেখ বলেন, পুরোনো দিনের স্মৃতি ধরে রাখা এবং নতুন প্রজন্মকে পলো বাওয়ার সঙ্গে পরিচিত করতেই এ আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকার মানুষ এতে অংশ নিয়েছেন। কেউ মাছ পেয়েছেন, আবার কেউ হতাশ হয়ে ফিরেছেন।
এ ধরনের আয়োজন তরুণদের গ্রামবাংলার প্রকৃতি, দেশীয় মাছ ও লোকজ সংস্কৃতির কাছাকাছি নিয়ে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তবে শুধু উৎসব আয়োজন করলেই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়; এর সঙ্গে বিলের পরিবেশ ও মাছের প্রাপ্যতা রক্ষার বিষয়টিও জড়িত।
দাদুড়িয়া বিলে মাছ কমে যাওয়ার অভিযোগ থাকলেও এর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে প্রয়োজন তথ্য ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান। স্থানীয়দের ধারণা, অপরিকল্পিতভাবে মাছ ধরার পদ্ধতি, পোনা নিধন এবং কৃষিজমি থেকে রাসায়নিক পদার্থ পানিতে মিশে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো মাছের প্রজনন ও বেঁচে থাকার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বোয়ালমারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা পবিত্র কুমার দাস বলেন, দেশীয় মাছের বিলুপ্তি বা সংকট নিয়ে তাদের কাছে নির্দিষ্ট কোনো জরিপ নেই। তবে মাছের প্রজনন ও পোনা রক্ষায় সূক্ষ্ম ফাঁসের জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এসব জালে ছোট মাছ ও পোনা আটকা পড়লে মাছের বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তিনি জানান, লোকবল সংকটসহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। গোপনে চায়না দুয়ারি জাল বিক্রির অভিযোগ থাকলেও বিক্রেতাদের শনাক্ত করা এবং নজরদারি বাড়ানোর ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, দাদুড়িয়া বিলের পলো বাওয়া উৎসব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা গ্রামীণ সংস্কৃতির একটি পরিচিত অনুষঙ্গ। একসঙ্গে মাছ ধরতে নামা, পুরোনো পরিচিতদের সঙ্গে দেখা হওয়া এবং উৎসব ঘিরে মানুষের মিলনমেলা, সব মিলিয়ে এটি গ্রামীণ জীবনের সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে। তবে ঐতিহ্যকে শুধু স্মৃতিতে নয়, বাস্তবেও বাঁচিয়ে রাখতে হলে পলো বাওয়ার আয়োজনের পাশাপাশি রক্ষা করতে হবে দাদুড়িয়া বিল, দেশীয় মাছ এবং তাদের প্রজননক্ষেত্র।


