পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় নদী পারাপারের কষ্ট দূর হলেও ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত দুই লেনের রাস্তাটি এখন যাত্রীদের জন্য বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সরু সড়কের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার মানুষকে দীর্ঘ যানজট ও মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হতে হচ্ছে।
এই দুর্ভোগের প্রতিবাদে এবং একটি নিরাপদ ও ছয় লেনের মহাসড়কের দাবিতে বুধবার পটুয়াখালীর প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এক বিশাল মানববন্ধন করেন।
এই মহাসড়কের মাদারীপুর অংশের ৪৭ কিলোমিটার এলাকা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। ফরিদপুর ও বরিশাল অংশের রাস্তা যেখানে ৩২ ফুট চওড়া, সেখানে মাদারীপুর অংশে এসে এটি মাত্র ২৪ ফুটে নেমে এসেছে।
পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর থেকে এই সড়কে দ্রুতগতির দূরপাল্লার বাস এবং ভারী ট্রাক চলাচল অনেক বেড়েছে। কিন্তু বিকল্প কোনো রাস্তা না থাকায় ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার, মাহিন্দ্রা ও নছিমনের মতো ধীরগতির স্থানীয় যানবাহনগুলোকেও এই সরু পথেই চলতে হয়। এর ফলে প্রায়ই এসব যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটছে। বরিশালের গৌরনদী হাইওয়ে থানার তথ্য অনুযায়ী, এই সড়কে দুর্ঘটনায় প্রতি বছর মারা যায় একশোরও বেশি মানুষ।
ধীরগতির ছোট যানবাহনের জন্য দুটি আলাদা সার্ভিস লেনসহ ২১১ কিলোমিটার দীর্ঘ ফরিদপুর-বরিশাল এবং বরিশাল-পায়রা-কুয়াকাটা মহাসড়কটি ছয় লেনে উন্নত করার পরিকল্পনা এক দশকেরও বেশি পুরোনো।
একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষার পর প্রায় ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের জন্য ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। ২০২১ সালের জুনের মধ্যে এই জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। ২০২৩ সালের মধ্যে মাদারীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমি কেনার জন্য ২৫৮ কোটি টাকা পাঠানো হলেও এলাকার জমির দাম বেড়ে যাওয়ায় কাজের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
২০২৫ সালের ১০ মে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নৌপরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন বরিশালে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘ভাঙ্গা থেকে পটুয়াখালী পর্যন্ত ছয় লেনের মহাসড়ক অনুমোদিত হয়েছে। আমি আশা করি কাজ দ্রুত শুরু হবে। পর্যায়ক্রমে কুয়াকাটা পর্যন্ত ছয় লেনের মহাসড়ক করা হবে।’
তবে সেই সরকারের মেয়াদে প্রকল্পটির কাজ পুরোপুরি থমকে যায়। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, কোনো দাতা সংস্থা নির্মাণকাজে অর্থায়নের জন্য এগিয়ে না আসায় এই সম্প্রসারণ কাজ আটকে আছে।
মাদারীপুর সওজ-এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মুন্সী মাসুদুর রহমান টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল জেলা প্রশাসনে হস্তান্তর করা হয়েছে। টেকেরহাট থেকে ৬ কিলোমিটার রাস্তা বড় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বাকি অংশ ধাপে ধাপে করা হবে। তবে কাজ শুরুর সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ তিনি দিতে পারেননি।
অন্যদিকে, মাদারীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানব সম্পদ) জুয়েল আহমেদ বলেন, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যান চলাচল বৃদ্ধি, প্রাণহানি
পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে দৈনিক গাড়ি চলাচল ২০১৯ সালের গড় ১৯ হাজার থেকে বেড়ে বর্তমানে ৩০ হাজার থেকে ৩২ হাজার-এ দাঁড়িয়েছে। যানবাহনের এই বিশাল চাপের কারণে এখানে গাড়ি চালানো অত্যন্ত কঠিন ও বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। গত পাঁচ মাসেই মাদারীপুরের ৪৭ কিলোমিটার অংশের ৩০টি জায়গায় দুর্ঘটনায় অন্তত ৩৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন ৫০ জন।
সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটে চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি, যখন মাদারীপুর সদর উপজেলার ঘটকচরে একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি ইজি বাইককে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই সাতজন নিহত হন। এর মাত্র পাঁচ দিন আগে, ১৩ জানুয়ারি তাঁতিবাড়িতে কাভার্ড ভ্যানের সংঘর্ষে একটি ভ্যানের তিন যাত্রী মারা যান।
এই রাস্তায় নিয়মিত যাতায়াতকারী এনামুল হক সন্তু টাইমসকে বলেন, মহাসড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করার দাবি দীর্ঘদিনের। এই প্রত্যাশা পূরণ হলে দুর্ঘটনার হার অনেকটাই কমে আসবে। আরেক যাত্রী আমিনুর রহমান রিগান বলেন, বরিশাল ও ফরিদপুরের তুলনায় মাদারীপুরের রাস্তা খুবই সংকীর্ণ।
তা ছাড়া অনেক জায়গায় রাস্তার পাশে কোনো মাটি নেই। দ্রুতগতির যানবাহনের ক্ষেত্রে অন্য গাড়িকে সাইড দিতেও সমস্যা হয়। ট্রাকচালক হায়দার আলী বলেন, ধীরগতির থ্রি-হুইলারের কারণে এই সড়কে গাড়ি চালানো খুবই কঠিন।
মুস্তফাপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুন আল রশিদ টাইমসকে বলেন, ‘মহাসড়কে নিয়মিত টহল বাড়ানো হয়েছে। অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। চেকপোস্ট বসানো হচ্ছে, জরিমানাও করা হচ্ছে।’
পটুয়াখালীতে ৩০ কিলোমিটার মানববন্ধন
বুধবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা থেকে কলাপাড়ার প্রবেশদ্বার পর্যন্ত বিস্তৃত ৩০ কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে মানববন্ধনে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ অংশ নেন। সুশীল সমাজের ব্যানারে এই মানববন্ধন ছিল দক্ষিণাঞ্চলের অবহেলিত জনগণের অধিকার ও বেঁচে থাকার লড়াইয়ের এক শক্তিশালী প্রতিবাদ।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, সংসদে ঘোষিত জাতীয় বাজেটে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য কাঙ্ক্ষিত বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
এই বিক্ষোভ থেকে ৯টি দাবি জানানো হয়, যার মধ্যে প্রধান দাবি ভাঙ্গা-কুয়াকাটা মহাসড়ক দ্রুত ছয় লেনে উন্নীত করা। অন্যান্য দাবির মধ্যে আছে পায়রা বন্দরকে পুরোপুরি সচল করা এবং বরিশাল-ভোলা সেতু নির্মাণ করা। এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করারও দাবি জানান বিক্ষোভকারীরা।


